বউমার উড়ুউড় ভাবটা ব্যস্ততার মধ্যেও একদিন লক্ষ করেন কৃষ্ণকান্ত। ডেকে বলেন, দামড়াটা ব্যাঙ্গালোর না কোথায় গেছে যেন!
হ্যাঁ।
তোমাকে চিঠিপত্র দিয়েছে?
না।
ফোন-টোনও করে না?
না।
চমৎকার। হিরের টুকরো আর কাকে বলে! কোন হোটেলে আছে তাও বোধহয় জানো না?
রেমি মাথা নেড়ে বলে, না। বলে যায়নি।
দিন সাতেক হল বোধহয়।
তা হয়েছে।
কৃষ্ণকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, এবার থেকে যখন বাইরে যাবে তখন ওর হোটলের নামটা অন্তত জেনে নিয়ো। তোমার মুখ দেখেই মনে হচ্ছে, দামড়াটার জন্য দুশ্চিন্তা করছ। কিন্তু তাতে লাভ নেই। কাল বোধহয় লতু দক্ষিণেশ্বর যাবে। সঙ্গে জগা থাকবে। গাড়ি যাচ্ছে। ওই সঙ্গে তুমিও ঘুরে এসো গে যাও। লতুটা তোমার সঙ্গে মেশে-টেশে, না কি নিজের বন্ধু-টন্ধু নিয়েই মত্ত থাকে?
প্রশ্নটা খুবই প্রাসঙ্গিক। রেমির ননদ লতু বউদিকে প্রচণ্ড ভালবাসে বটে, কিন্তু তার কলেজ এবং বাইরের জগৎটা বড্ড বেশি বড়। তা ছাড়া এই বয়সেই সে নানারকম সোশ্যাল ওয়ার্ক করে বেড়ায়। ফলে বউদির জন্য তার দেওয়ার মতো সময় থাকে না। একজন ভাসুর ও একটি দেওর আছে রেমির। তারা প্রায় না থাকার মধ্যেই। ভাসুর দেরাদুন মিলিটারি স্কুল থেকে পাশ করে এখন সামরিক বাহিনীর উঁচু পোস্টে বসে আছে পুনায়। বিয়ের পর তাকে এক-আধবার দেখেছে রেমি। অবাঙালির মতো চেহারা। লম্বা চওড়া। একজন ডিভোর্সি মারাঠি ভদ্রমহিলাকে বিয়ে করার পর থেকেই এ বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক একরকম চুকে গেছে। তার নামও কেউ উচ্চারণ করে না। দেওর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে রুরকিতে। বড় একটা আসে না। এলেও বউদির সঙ্গে খুব একটা কথাটথা বলে না। লজ্জা পায় বোধহয়। সুতরাং এ বাড়িতে রেমি একরকম একা।
একা যেমন, তেমনি আবার একচ্ছত্র আধিপত্যও তার। কৃষ্ণকান্ত ইদানীং তার হাতেই সংসার খরচের টাকা পয়সা দিচ্ছেন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করছেন তাকে। স্বামীর কাছ থেকে যা সে পায় না। তার সেই শূন্যতাকে পূরণ করার এ এক অক্ষম চেষ্টা।
রেমি পরদিন দক্ষিণেশ্বর গেল না। কেন যাবে? তার তত বেড়াতে ইচ্ছে করে না একা একা। একা ছাড়া কী? লতু, জগাদা এরা থাকলেও তার একাকিত্ব ঘোচে না কিছুতেই।
পেটের বাচ্চাটা যদি থাকত তা হলে হয়তো এত একা লাগত না। শরীরের মধ্যে আর একটা শরীর। তার প্রাণস্পন্দন টের পেত রেমি। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখত। ধ্রুবর অভাব তাতেই পূরণ হয়ে যেত অনেকটা।
কেন মারল ধ্রুব? কেন? ধ্রুবর কাছ থেকে সত্যিকারের জবাবটা আজও পায়নি রেমি। কেন বাচ্চা হবে শুনে সাদা হয়ে গিয়েছিল ওর মুখ? কোথায় বাধা ছিল?
দশদিন বাদে ধ্রুব ফিরল। হা-ক্লান্ত চিমসে চেহারা হয়ে গেছে। ট্যাকসি থেকে নেমেই রেমিকে বলল, শিগগির ভাত খাওয়াও। দশদিন প্রায় আধপেটা খেয়ে ছিলাম।
তখন অবেলা। বিকেলের ফ্লাইটে ধ্রুব ফিরেছে। তবু প্রশ্ন না করে আগে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল রেমি। পুরুষমানুষ বড় একটা খিদে সহ্য করতে পারে না।
খাওয়ার টেবিলে মুখোমুখি বসে রেমি জিজ্ঞেস করল, রোগা হয়ে গেছ কেন?
ধ্রুব ফিচেল হেসে বলল, বিরহে।
বিরহ কেমন তা তুমি জানো?
আহা তোমার বিরহে নয়।
তবে কার বিরহে?
বিরহ ফর ফুড। দক্ষিণ ভারতের খাবার সহ্য হচ্ছিল না।
রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তাই বলো।
ধ্রুব চোখের কোনা দিয়ে তাকে একবার দেখে নিয়ে বলল, তোমার শরীরটা তো তেমন কৃশ দেখছি না।
দেখবে কেন? কৃশ তো হইনি।
অথচ হওয়ার কথা।
কেন? হওয়ার কথা কেন?
রওনা হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল তুমি খুব বিরহ ফিল করছ।
মোটেই নয়।
একদম করোনি?
না। বিরহটা একতরফা তো হয় না।
দূর মাইরি! তুমি একদম উলটপুরাণ। বিরহ চিরকালই একতরফা।
তাই নাকি?
কেষ্টর জন্য রাধা যত কেঁদেছিল, তার টুয়েন্টিফাইভ পারসেন্টও কেষ্ট কাঁদেনি।
তোমার সেই টুয়েন্টিফাইভ পারসেন্টও বোধহয় নেই।
না। তবে তোমার জন্য আমি ফিল করি।
সেটা কীরকম?
একটা বাজে লোকের জন্য তোমাকে অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হচ্ছে।
তা হচ্ছে।
আমি সেটা ফিল করি।
শুধু ফিল করলেই হবে? তোমার কিছু করার নেই?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, আমার নেই। কিন্তু তোমার আছে।
কী করব?
ওই যে বলেছিলাম, এ বাড়ির ভিত নাড়িয়ে দাও। ভাঙো, আগুন জ্বালো।
এ বাড়ির ওপর তোমার এত রাগ কেন?
রাগ তোমারও হওয়ার কথা ম্যাডাম।
কেন তা আগে বলো।
এরা ভণ্ড, অহংকারী, রক্তের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাসী।
তাই নাকি?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, কেন, তুমি কি জানো না?
কী জানব?
বুদ্ধি থাকলে বুঝতে পারতে।
আমার বুদ্ধি নেই। বুঝিয়ে দাও।
নির্বোধদের মাথায় কোনও ফ্যানটাস্টিক আইডিয়া ঢোকাতে নেই, রেমি। তাতে সে খেপে উঠে যাচ্ছেতাই কাণ্ড করে বসতে পারে।
আমি কি ততটাই নির্বোধ?
তা কে জানে! তুমি নিজেই তো নিজেকে নির্বোধ বললে।
তুমি আমাকে একটা কিছু বলতে চাইছ। কিন্তু পারছ না। কেন বলো তো?
আমার কিছু বলার নেই।
আছে। আমি জানি।
ওসব এখন বাদ দাও। আমি টায়ার্ড অ্যান্ড হাংরি।
ঠিক আছে। পরে বোলো। আমি অপেক্ষা করব।
ধ্রুব অবাক হয়ে বলল, মনে হচ্ছে, তোমারও কিছু বলার আছে।
আছে। আমি তোমাদের রক্তের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।
ধ্রুব একটু ম্লান হেসে বলল, ব্লাড ইজ এ স্ট্রেঞ্জ থিং।
০২৩. গভীর রাত্রি পর্যন্ত হেমকান্তর ঘুম হল না
গভীর রাত্রি পর্যন্ত হেমকান্তর ঘুম হল না। মাথায় ধিকিধিকি অঙ্গার জ্বলছে। আত্মধিক্কার ও চারিদিককার কলুষিত পরিবেশের ওপর ঘৃণা তাকে আজ পাগলের মতো করে তুলেছে।
