তুমি কী করে জানলে?
মনুদিদির কাছে ও নিজেই বলেছে।
কই, মনু তো আমাকে বলেনি!
আপনাকে আমোক বিরক্ত করতে চাননি।
তোমাকে কবে বলল?
পরশু মনুদিদি আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখনই বলেন।
শশী সুইসাইড করল না কেন?
সেটা বোঝা মুশকিল। হয়তো শেষ সময়ে দুর্বলতা এসে গিয়েছিল। পিস্তলের গুলিও ফুরিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। বাচ্চা ছেলে তো!
হেমকান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, কিন্তু আমার সম্পর্কে ওর ভুল ধারণাটা যে ভাঙা দরকার। কী করব বলতে পারো?
এখন কিছু করার দরকার নেই। আগে আমি ওর সঙ্গে কথা বলে দেখি।
মনু কি ছেলেটার সঙ্গে দেখা করেছে?
না, উনি চেষ্টা করেছিলেন। পুলিশ দেখা করতে দেয়নি।
ঠিক আছে। আগে তুমিই দেখা করো।
যে আজ্ঞে।
মামলা কবে নাগাদ উঠবে?
তা বলতে পারি না। তা ছাড়া মামলা তো এখানে হবে না। শশীকে বরিশালে চালান দেওয়া হবে। মামলা উঠবে সেখানে।
এখানে হয় না?
সেটা নরমাল প্রসিডিওর নয়।
তুমি কি বরিশালে গিয়ে মামলা লড়তে পারবে?
তা পারা যাবে না কেন? ও নিয়ে আপনি ভাববেন না।
আচ্ছা, তোমার ওপর অনেক দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দিলাম।
তাতে কী?
পারবে তো সব সামলাতে? চেষ্টা করব।
শচীন চলে যাওয়ার পর হেমকান্ত অনেকক্ষণ শচীনের কথাই ভাবলেন। ছেলেটি অতি চমৎকার। এই ছেলেটিকে যদি জামাই করেন তবে সব দিক দিয়েই তার ভাল হয়। বিষয় আশয় এবং মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে ভাববার মতো একজন লোক পেলে জীবনটা তিনি নিশ্চিন্তে কাটাতে পারেন।
হেমকান্তর ঘরের বাইরেই ওত পেতে ছিল কৃষ্ণকান্ত। শচীন বেরিয়ে আসতেই ধরল, শচীনদা, কী কথা হল?
শচীন একটু হেসে বলে, তা দিয়ে তোর কী দরকার?
আমার দরকার আছে। তুমি শশীদাকে বাঁচাবে?
আমি বাঁচাতে যাব কোন দুঃখে?
বাবা তোমাকে শশীদার উকিল ঠিক করেনি?
করলেই বা। উকিল কি ভগবান?
সি আর দাশ কীরকম আরগুমেন্ট করেছিল জানো?
খুব পেকেছিস দেখছি।
শচীন নীচে এসে বার-বাড়িতে রাখা তার সাইকেলটা টেনে নিয়ে বলে, শশীকে নিয়ে তোকে অত ভাবতে হবে না। লেখাপড়া কর।
করছি। আমি উকিল হব।
তাই নাকি?
উকিল হয়ে শুধু স্বদেশিদের হয়ে মামলা লড়ব।
বলিস কী? শুধু স্বদেশিদের মামলা লড়লে যে পেট চলবে না।
আমি তোমার সাইকেলের রডে একটু উঠি শচীনদা?
ওঠ। কিন্তু তোর মতলবখানা কী?
চলোই না, বলছি।
শচীন সাইকেলের রডে কৃষ্ণকান্তকে নিয়ে বড় রাস্তায় উঠে এল। রাস্তা মোটেই ভাল নয়। ইটের রাস্তায় গর্ত, উঁচু-নিচু।
সাইকেল চালাতে চালাতে শচীন বলল, এবার বল।
ছোড়দিকে তোমার পছন্দ হয়?
শচীন একটু থতমত খেয়ে হেসে ওঠে। বলে, আমার পছন্দ হলে তোর কী লাভ?
তোমার সঙ্গে ছোড়দির বিয়ের কথা চলছে, জানো?
শচীন একটু গম্ভীর হয়ে বলে, না তো! তোকে কে বলল?
মনুপিসি। বলেনি ঠিক। বাবাকে বলছিল, আমি শুনেছি।
তাই নাকি?
তুমি ছোড়দিকে বিয়ে করবে?
দূর ফাজিল!
ছোড়দি সুন্দর না?
কে জানে!
লোকে বলে, ছোড়দি নাকি খুব সুন্দর।
তা হবে।
কিন্তু ছোড়দির একটা দোষের কথা তোমাকে বলে দিই। রেগে গেলে কিন্তু ছোড়দির নাকের ডগা নড়ে।
শচীন এত জোরে হেসে ফেলল যে, সাইকেল বেসামাল হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। ফের সামলে নিয়ে সে বলল, আর কী দোষ আছে রে তোর ছোড়দির?
ভীষণ হিংসুটে। খুব মিথ্যে কথা বলে।
তাই নাকি? তা হলে ওকে তো বিয়ে করা উচিত নয়।
না, না। করো। ছোড়দি এমনিতে ভালই। তোমাব সঙ্গে বিয়ে হলে ছোড়দি তো কাছাকাছিই থাকবে, তাই না?
ও, সেইজন্যই আমাকে বিয়ে করতে বলছিস?
শচীন আবার হাসতে থাকে।
রঙ্গময়ি বিশাখার চুল বেঁধে দিল সেদিন বিকেলে। তারপর বলল, বাপ তো বোম ভোলানাথ, মেয়ের বয়সের দিকে লক্ষই নেই। কিন্তু এই বয়সে কি ঘরে রাখা যায়!
কথাটা শুনল বিশাখা। কোনও মন্তব্য করল না।
রঙ্গময়ি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, রাজেন মোক্তারের ছেলে শচীনকে তো দেখেছিস!
বিশাখা একটু বিস্ময়ভরে চেয়ে বলে, দেখব না কেন? সুফলার দাদা তো!
তার কথাই বলছি।
তার কথা কেন?
তোর বাবার খুব ইচ্ছে, ওর সঙ্গে তোর সম্বন্ধ করে।
ওর সঙ্গে?–বলে বিশাখা যেন আকাশ থেকে পড়ে।
কেন, ছেলেটা খারাপ নাকি? কী চমৎকার রাজপুত্রের মতো চেহারা!
বিশাখা একটা ঝামটা মেরে বলে, হলেই বা! মোক্তারের ছেলেকে বিয়ে করতে যাব কেন? আর পাত্র জুটল না।
রঙ্গময়ি বলে, মোক্তারের ছেলে তো কী! ও নিজে তো উকিল। ওরকম উকিল গন্ডায়-গন্ডায় আছে। তোর পছন্দ নয়?
দুর! —বলে প্রস্তাবটা একদম উড়িয়ে দিল বিশাখা।
রঙ্গময়ি স্তব্ধ হয়ে গেল। অনেকক্ষণ বাদে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, এমন পাত্র তোর পছন্দ নয়! সত্যিই পছন্দ নয়?
বিশাখা বিরক্ত হয়ে বলে, আমি কি তোমাদের পথের কাঁটা পিসি যে, ধরে বেঁধে জলে ফেলে দিতে চাও?
জলে ফেলে দেওয়া কি একে বলে?
তা ছাড়া আর কী? আমার কোনও দিদির কি এরকম ঘরে বিয়ে হয়েছে?
রাজেন মোক্তারও তো গরিব নয়।
একসময়ে তো ছিল। ওদের বাড়ি থেকে মার কাছে প্রায়ই লোক আসত চাল, টাকা, পুরনো কাপড় চাইতে।
সে তো কবেকার কথা!
তা হোক। ওদের সংসারে বউ হয়ে আমি যেতে পারব না। বরং তোমাদের অসুবিধে হলে বোলো, পুকুরে ড়ুবে মরব।
আমাদের অসুবিধে আবার কী? বারবার ওকথা বলছিস কেন?
হচ্ছে বলেই বলছি।
কীসের অসুবিধে? কার অসুবিধে?
অত জানি না। মনে হল, তোমাদের দুজনের একটু অসুবিধে হচ্ছে আমি থাকতে।
রঙ্গময়ি নিঃশব্দে পালিয়ে গেল।
০২২. কূট সন্দেহ
কূট সন্দেহ যখন সত্য হয়ে দেখা দিল অবশেষে, তখন রেমির সত্যিকারের ঘেন্না এল ধ্রুবর ওপর। আর রাগ। পারলে সে লোকটাকে খুন করে।
