হেমকান্ত রঙ্গময়ির চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার মুখের হাসি ধীর ধীরে মুছে গিয়ে একটা কঠোরতা ফুটল। ধীর স্বরে বললেন, মনু, তোমরা আমাকে সবাই একটু ভুল বুঝলে।
রঙ্গময়ি বুঝি একটু লজ্জা পেল। বলল, আমাদের মেয়েমানুষে বুদ্ধি, ওগো রাগ কোরো না। তুমি গম্ভীর হলে আমার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়।
হেমকান্ত খুব ম্লান একটু হেসে বললেন, থাক, আর মন-রাখা কথা বলতে হবে না, মনু। শচীনকে খবর পাঠাও। যা বলবার আমিই বলব।
বিকেলে কাছারির কাজ শেষ করে শচীন এল। রুচিবান ছেলে। বাড়ি গিয়ে উকিলের পোশাক ছেড়ে ধুতি পাঞ্জাবি শাল চাপিয়ে এসেছে। ভারী সুন্দর চেহারাটি। কমনীয় মুখশ্রীতে বুদ্ধির দীপ্তি ঝলমল করছে। হৈমকান্তকে প্রণাম করে সামনে বসল।
রঙ্গময়ির পরামর্শমতো ছেলেটিকে ভাল করেই লক্ষ করলেন হেমকান্ত। চমৎকার ছেলে, সন্দেহ নেই। এই ছেলে এ বাজারে এখনও পড়ে আছে সেটাই বিস্ময়ের।
হেমকান্ত বললেন, ঘটনাটা কি শুনেছ? শশিভূষণ নামে একটি ছেলে যে আমার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল!
আজ্ঞে হ্যাঁ।
সেটা নিয়েই গোলমাল। দারোগা রামকান্তবাবু আমার একটা বিবৃতি চাইছেন। সেটা কি দেওয়া উচিত বলে মনে করো?
শচীন বলল, স্টেটমেন্ট এখনই দেওয়ার দরকার নেই। মামলা উঠুক, তখন দিলেও চলবে।
দারোগা আমার কাছে কীরকম স্টেটমেন্ট চাইছে তা আন্দাজ করতে পারো?
শচীন মৃদু একটু হেসে বলল, তা বোধহয় পারি। উনি সম্ভবত আপনার কাছ থেকে একটা মুচলেকা আদায় করতে চাইছেন।
উদ্দেশ্যটা কী?
উদ্দেশ্য, শশিভূষণকে ফাসানো, তার বিনিময়ে আপনি আপনার নিরাপত্তা কিনে নিতে পারবেন।
হেমকান্ত গম্ভীর হয়ে বলেন, আর যদি সেরকম মুচলেকা না দিই?
তা হলে পুলিশ আপনাকেও ফাঁসানোর চেষ্টা করবে।
মামলাটা তুমি নেবে?
শচীন বিনীতভাবে ঘাড় হেঁট করে বলে, নিতে পারি।
আমাদের পুরনো উকিল গগনবাবু বুড়ো হয়েছেন। আমি সেই জায়গাতেও তোমাকে অ্যাপয়েন্ট করতে চাই।
যে আজ্ঞে।
তা হলে কাল থেকেই গগনবাবুর সঙ্গে বসে সব কাগজপত্র বুঝে নাও।
যে আজ্ঞে।
আমার এস্টেটের অবস্থা বিশেষ ভাল নয়। খাজনা আসে খুব সামান্য। আদায়-উসুল করার লোক নেই। প্রজাদের হাতে নাকি নগদ টাকারও খুব অভাব।
শচীন মৃদু স্ববে বলে, একটা ডিপ্রেশন চলছে ঠিকই।
ছেলেরা চায় জমিদারি বেচে দিই, তুমিও কি তাই বলো?
শচীন একটু ভেবে নিয়ে বলল, দেখাশোনার লোক না থাকলে অবশ্য জমিদারিটা একটা লায়াবিলিটি হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু এখনই বেচার কথা ভাবছেন কেন? আমি আগে কাগজপত্র দেখি।
তুমি তো দেখবে আইনের দিকটা, হিসেবপত্র দেখবে কে? আমি নতুন করে গোটা এস্টেটের একটা অ্যাসেসমেন্ট করতে চাই।
শচীন বলে, সেটাও খুব শক্ত হবে না। দলিল-টলিলগুলো আমাকে দেবেন। দেখে দেব। আপনার ম্যানেজার মশাইয়ের সঙ্গেও একটু বসা দরকার।
বেশ, সে ব্যবস্থাও হবে। তা হলে আমি নিশ্চিন্ত?
আগে সব দেখি।
শশিভূষণের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা সাজিয়েছে বলে কিছু জানো?
শচীন মাথা নেড়ে বলে, এখনও দেয়নি। তবে হাসপাতাল থেকে আজই তাকে হাজতে নেওয়া হয়েছে।
হেমকান্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তা হলে ছেলেটা ফাঁসিতে মরার জন্যই বেঁচে উঠল!
ফাঁসি যে হবেই তা বলা যায় না।
শশীকে তুমি বাঁচাতে পারবে?
শচীন চিন্তিত মুখে বলে, পুলিশের কাছে সে কী বলেছে তা তো জানি না। পুলিশই বা কী পয়েন্ট দিয়েছে তাও দেখা দরকার। আপনি বললে আমি শশীর সঙ্গে দেখা করতে পারি।
করো।
কিন্তু একটা কথা আছে।
কী কথা?
আমি একা গেলে সে হয়তো আমাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারবে না।
আমি যদি তোমার সঙ্গে যাই?
শচীন একটু দ্বিধা করল। কী যেন বলি বলি করেও সামলে নিয়ে বলল, তার হয়তো দরকার হবে না। শশীকে আমি কনভিনস করতে পারব।
আমি যাব না বলছ?
দরকার হলে বলবখন। তখন যাবেন।
হেমকান্ত উদাস হয়ে গেলেন। বললেন, ছেলেটাকে আমার একটু দেখতেও ইচ্ছে করছে। আমার বাড়িতে কয়েকদিন ছিল, কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় ভাল করে কথাও হয়নি। না, চলো, কাল আমিও তোমার সঙ্গে যাব।
শচীনের মুখে আবার সেই দ্বিধার ভাবটা দেখা গেল। মৃদুস্বরে বলল, আপনার এখন না যাওয়াই বোধহয় ভাল।
কেন বলো তো?
শচীন মৃদু একটু হেসে বলল, শহরে একটা গুজব রটেছে। লোকের ধারণা এ বাড়ি থেকে শশীকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হেমকান্ত চমকে উঠে বলেন, সে কী? কে রটাল?
গুজব রটানোই তো কিছু লোকের কাজ। আমার মনে হয় শশীরও সেরকমই ধারণা।
কেন, শশীর এরকম ধারণা হওয়ার কারণ কী?
কোনও কারণ নেই। তবে শহরের গুজবটা তার কানে পৌঁছানোই সম্ভব।
হেমকান্তকে ভারী ক্লান্ত দেখাল। বললেন, লোকে একথা বিশ্বাস করে?
হয়তো সবাই করে না।
তুমি করো?
না। আপনাকে আমি শিশুবয়স থেকে দেখে আসছি। এই পরিবারের কোনও লোক কখনও ছোট কাজ করেনি।
হেমকান্ত একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন, না, আমরা ছোট কাজ সহজে করি না। শশীকে ধরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
আমি জানি। বরিশাল মার্ডার কেস নিয়ে খুব তোলপাড় হচ্ছে। শশীর পক্ষে দলছুট হয়ে লুকিয়ে থাকা এমনিতেই সম্ভব ছিল না।
তুমি অনেক জানো দেখছি।
কিছু খবর রাখি। ওকে যারা প্রোটেকশন দিতে পারত তাদের সঙ্গে ও যোগাযোগ করতে পারেনি। তা ছাড়া আর-একটা নির্দেশ ছিল ওর ওপর। সেটাও ও মানেনি।
কী সেটা?
কথা ছিল, মার্ডারের পর সুইসাইড করবে।
হেমকান্ত শিউরে ওঠেন, তাই নাকি?
হ্যাঁ।
