রেমি ঘরে ঢুকে বইটা বিনা ভূমিকায় কেড়ে নিয়ে বলল, তোমার সঙ্গে কথা আছে।
ধ্রুব বিরক্ত হয়ে বলল, তোমার অত কথা কীসের?
থাকলে কী করব?
আমার বেশি কথা ভাল লাগে না।
আমি কি বেশি কথা বলি?
তা একটু বলো। মেয়েরা বড্ড বাজে বকে।
আমি জানতে চাই, তুমি এরকম করছ কেন?
কী রকম করছি।
আবার মদ খাচ্ছ!
আমি তো বরাবর খাই। যোলো-সতেরো বছর বয়স থেকে।
মাঝখানে খেতে না তো!
ধ্রুব বিরক্ত হয়ে বলল, খাই তো নিজের পয়সায় খাই। তোমার বাপের পয়সায় খাই না, তোমার শ্বশুরের পয়সাতেও খাই না।
পয়সার কথা উঠছে না। খাও কেন? কী হয়েছে?
কিছু একটা হয়েছে।
আজ খেয়েছ?
খেয়েছি।
কতটা?
বেশি নয়। তিন পেগ। নেশা হয়নি। এখন আবার খাব। তুমি সেফলি কেটে পড়ে ওপরের ঘরে গিয়ে দরজা দাও। পারলে শ্বশুরকে দরজায় পাহাবা বসিয়ে রেখো। লাঠি হাতে গোঁফে তা দিতে দিতে বউমাকে পাহারা দেবে, যেন ছেলে গিয়ে তার সতীত্ব নষ্ট না করে।
তুমি গেলে কি আমার সতীত্ব নষ্ট হয়? যাও না কেন? গেলেই তো পারো। গিয়ে দেখো, কেউ তোমাকে আটকায় কি না।
ইজ ইট অ্যান ইনভিটেশন?
ধরো তাই।
আমি দোতলায় উঠি না। ওটা একজন নখদন্তহীন অথর্ব ও কুম্মাণ্ড মন্ত্রীর এলাকা।
উনি তোমার বাবা।
যা, দুর্ভাগ্যক্রমে।
ঠিক আছে, ওপরে যেতে না চাও, না যাবে। আমি কি আসব?
না। তোমাকে আমার দরকার তো নেই।
তোমাকে আমার আছে।
না, আমাকেও তোমার দরকার নেই।
আমার ওপর রাগ করেছ?
না। আলমারি থেকে হুইস্কির বোতলটা বের করে আনো। খেতে খেতে একটু কথা কই।
রেমি দাঁতে দাঁত পিষে তাই করল। ধ্রুবর মুখ থেকে তার কথা বের করাটা দরকার। অনেকটা হুইস্কি খাওয়ার পর ধ্রুব বলল, কী বলতে এসেছ?
তুমি আবার মদ খাচ্ছো কেন?
আমার খুব দুঃখ হয়েছিল, তাই।
কীসের দুঃখ?
বাচ্চাটার জন্য।
কোন বাচ্চা?
আমার বাচ্চা।
রেমি কেঁপে উঠল। বলল, কী বলছ?
ধ্রুব মাথা নাড়ল, ওটা ব্লাড ক্লট নয়। বাচ্চা।
০২১. রাজেন মোক্তারের ছেলে শচীন
রাজেন মোক্তারের ছেলে শচীন ল পাস করে ওকালতি শুরু করেছে সবে। শোনা যাচ্ছে কাছারিতে সে আরগুমেন্ট ভালই করে। হেমকান্তর পুরনো উকিল গগন তালুকদার বড়ই বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কোর্ট-কাছারি বড় একটা যান না। নতুন একজন উকিল নিয়োগের কথা বহুদিন ধরেই ভাবছেন হেমকান্ত। কিন্তু অলস লোকের যা স্বভাব। ভাবেন তো কাজে আর হয়ে ওঠে না। কাকে রাখবেন সেটাও ভেবে দেখা দরকার।
শচীনের কথা তাকে বলল রঙ্গময়ি। এসব খবর রঙ্গময়ির খুব ভাল রাখার কথা নয়। কিন্তু একদিন সে সকালে এসে সোজা বলল, গগনবাবুর তো নখদন্ত বলে আর কিছু নেই। কথা বলতে গেলে নালে-ঝোলে একাকার হয়। এই বুড়োকে দিয়ে তোমার মামলা-টামলা চলবে?
হেমকান্ত অবাক হয়ে বলেন, মামলা কীসের?
মামলা লাগতে কতক্ষণ? রামকান্ত দারোগা যে তোমাকে কী একটা লিখে দিতে বলেছিল, লিখেছ?
না, হয়ে ওঠেনি।
তোমার তো আজকাল কিছুই হয়ে উঠছে না। শুধু ছেলে নিয়ে নৌকো চালালেই হবে? ওটাও তো গোল্লায় যাচ্ছে। বইপত্র ছোঁয় না।
হেমকান্ত মৃদু হেসে বলেন, অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার দরকার কী? উকিলের কথাটা হঠাৎ তুললে কেন?
রামকান্ত দারোগা রোজ লোক পাঠাচ্ছে তোমাকে কী সব লিখে দেওয়ার জন্য।
কেন?
বাঃ, পুলিশ এখন শশিভূষণের নামে মামলা আনবে না? তুমি তাদের সাক্ষী যে!
ও, এই কথা! কিন্তু স্টেটমেন্ট লেখাও ঝকমারি, কাকে উকিল রাখা যায় বলো তো!
আমি তো শচীনের কথা বলি, অল্প বয়স, বুদ্ধিসুদ্ধি খুব।
শচীনকে ভালই চেনেন হেমকান্ত, রাজেনবাবুর বাড়ির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতাও অনেক দিনের। রাজেনবাবু ঢাকার লোক। ময়মনসিংহে আসেন ফৌজদারি মামলার ছড়াছড়ি দেখে। খুবই সামান্য আয়ে আইনের ব্যাবসা শুরু করেন। মুক্তাগাছার এক জমিদার নলিনীরঞ্জন। তার ছেলেকে পড়াতেন। সেই সূত্রে শহরে একটু বসতের জমি পান। আস্তে আস্তে অবস্থা ফিরিয়ে ফেলেছেন এখন। দুর্গাবাড়িতে একখানা বাড়ি করেছেন। সেখানে দুর্গোৎসব পর্যন্ত হয়। শচীন তার ছোট ছেলে। বেশ সুপুরুষ, লম্বা ছিপছিপে চেহারা, গান-টানও গায়।
শচীনের নিয়োগে আপত্তির কিছু নেই। হেমকান্ত বললেন, তা হলে ওকে একটু ডেকে পাঠাও।
রঙ্গময়ি একটু কুটিল চোখে হেমকান্তর দিকে চেয়ে ছিল। এরপর বলল, একটু বুঝেসুঝে কথাবার্তা বোলো, আর ছেলেটিকে ভাল করে লক্ষও কোরো।
হেমকান্ত অবাক হয়ে বলেন, শচীনকে আর লক্ষ করার কী আছে? ছোট থেকে দেখছি।
তোমার মতো ক্যাবলা দুটি নেই। শচীন শুধু উকিলই নয়, একজন সৎ পাত্রও বটে। তোমাদেব পালটি ঘর।
হেমকান্ত থতমত খেয়ে বলেন, ও বাবা, তুমি অনেকদূর ভেবে ফেলেছ দেখছি।
ভাবতেই হয়। মেয়ে বড় হচ্ছে, কিন্তু বাপের কোনও দুশ্চিন্তা নেই, কাজেই পাড়া পড়শিকেই ভাবতে হয়।
হেমকান্ত খুব হাসলেন। তারপর বললেন, আচ্ছা দেখা যাবে।
আর-একটা কথা।
বলো।
শশীর হয়ে মামলা লড়ার কেউ নেই।
বরিশালে ওর বাবা আছে।
তা আছে। কিন্তু ভদ্রলোক খুব গা করছেন না বলে শুনেছি।
কেন, গা করছে না কেন?
বাপ হচ্ছে সেই সৎ মায়ের পোষা ভেড়ার মতো। শশীকে নাকি ত্যাজ্যপুত্রও করেছে। আমার মনে হয় না, শশীর বাপ উকিল-টুকিল লাগাবে।
হেমকান্ত গম্ভীর হয়ে বলেন, লোকটাকে তো চাবকাতে হয়।
সে যখন হাতের কাছে পাবে তখন চাবকিয়ে। কিন্তু এখন তো অবস্থাটা সামাল দেওয়া দরকার।
আমার কী করার আছে?
শচীনকে একটু বোলো।
শচীন!
ছেলেটা ভাল। বুদ্ধি রাখে। পয়সার পিশাচও নয়। তুমি বললে হয়তো শশীর পক্ষে দাঁড়িয়ে লড়াই করবে। তোমাকে কোনও বিপদের ঝুঁকি নিতে হবে না। ভয় পেয়ো না।
