তাড়াব! ওরে বাবা।
কেন, আমাকে তাড়ানো কি খুব কঠিন?
তোমাকে তাড়াতে গেলে নিজেকেই না ভিটে থেকে উচ্ছেদ হতে হয়!
ওসব কথার কোনও মানে হয় না। আমি ভেবে দেখেছি, আমি গেলেই তোমাদের মঙ্গল।
কীসের মঙ্গল?
সব দিক দিয়েই মঙ্গল।
এটা রাগের কথা।–হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, মনু, বিশাখা কেমন মেয়ে?
রঙ্গময়ি অবাক হয়ে বলল, তার মানে? বাপ হয়ে নিজের মেয়ের কথা আমার কাছে জানতে চাইছ কেন?
বাপ হলেই যে নিজের মেয়েকে ভাল চেনা যাবে একথা তোমাকে কে বলল? বরং তুমি নিজে মেয়ে বলেই বিশাখাকে ভাল বুঝতে পারবে।
রঙ্গময়ি একটু বিরক্ত হল যেন। বলল, মেয়ে তো ভালই। কিন্তু কথাটা উঠল কেন হঠাৎ?
এমনি।
এমনি নয়। তোমার প্রশ্নের পিছনে কারণ আছে। বলো।
সেদিন হঠাৎ বিশাখার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। মনে হল, ও স্বদেশিদের তেমন পছন্দ করে না।
রঙ্গময়ি হাঁ করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, ও আবার কোনদেশি কথা! বিশাখা স্বদেশিদের পছন্দ করতে যাবেই বা কেন?
হেমকান্ত মৃদু হেসে বলেন, কথা সেটা নয়।
তবে আবার কী কথা?
কথা হল, তুমি বিশাখাকে প্রভাবিত করতে পারোনি। কেন পারোনি, মনু? অথচ কৃষ্ণকে পেরেছ।
রঙ্গময়ি একথায় হঠাৎ একটু দিশাহারা বোধ করে চুপ করে থাকে। তারপর ধীর স্বরে বলে, তোমাকে যতটা ন্যালাখ্যাপা আর উদাসীন দেখায় তুমি ততটা নও তা হলে?
আমি অপদার্থ মনু, সে তো জানোই।
না, আমি তা জানি না। কিন্তু তুমি এত লক্ষ করতে শিখলে কবে?
তা হলে ধরেছি ঠিক!
রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, বিশাখা আমাকে ভালবাসে, কিন্তু তবু ও একটু অন্যরকম। একটু নিজের মতো।
ও কি স্বার্থপর?
তা তো বলিনি।
তবে কী?
সাবধানি বলা যায়। মেয়েদের পক্ষে সাবধানি হওয়া ভাল।
ওর ধারণা আমি শশীকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলাম। কোথা থেকে যে ধারণাটা হল!
রঙ্গময়ি বলে, শশীর ব্যাপারটা ওর ভাল লাগেনি। কে জানে, সেইজন্যই হয়তো—
কথাটা শেষ করল না রঙ্গময়ি।
হেমকান্ত চোখ তুলে প্রশ্ন করেন, সেইজন্যেই কী?
আমি ভাল জানি না।
কী জানো না?
সে তুমি অন্যের কাছ থেকেই শুনতে পাবে। আমি যাই।
রঙ্গময়ি চলে গেলে হেমকান্ত ভুকুটি করে বসে থাকেন। কথাটা হয়তো ভাল নয়। তবু জানা দরকার।
০২০. রেমি কিছুতেই বুঝতে পারছিল না
রেমি কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, ব্যাপারটা কী। তাদের বাচ্চা হবে, তাতে দুশ্চিন্তা বা ভয়ের কী? সে অবাক হয়ে ধ্রুবকে বললে, ওরকম করছ কেন?
ধ্রুব একটু হাসবার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল, খবরটা এখন চেপে যাও।
তার মানে?
কাউকে কিছু বোলো না।
কেন বলব না?
কারণ আছে, তাই।
রেমি রেগে গিয়ে বলল, কী কারণ তা আমার জানা দরকার।
ধ্রুব বিব্রত মুখে বলে, কারণটা এখনই বলতে পারছি না।
জীবনে প্রথম মা হতে চলেছে রেমি, এই সংবাদ তার ভিতরে যে রোমহর্ষ, যে রহস্যময় আনন্দের এক অদ্ভুত অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল তা এক ফুৎকারে উড়ে গেল। তীব্র অপমানে ঝা ঝা করতে লাগল মুখচোখ। সে ধ্রুবর জামা খিমচে ধরে বলল, তোমাকে বলতেই হবে! তোমাকে বলতেই হবে! কী দোষ করেছি আমি?
ধ্রুব নিজেকে ছাড়িয়ে নিল না। শুকনো ঠোঁট জিব দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে বলল, আসলে কী জানো? আমাদের পরিবারের প্রথম সন্তান বাঁচত না। লোকে বলে, কে বা কারা যেন বিষ নজর দিয়ে এই অপকর্মটি করে। আমি অবশ্য এই সব কুসংস্কার বিশ্বাস করি না। কিন্তু এই পরিবারের বউ পোয়াতি হলে খবরটা গোপন রাখাই নিয়ম। না হলে নাকি নজর লাগে।
একথায় রেমির রাগটা একটু ধাক্কা খেল। খানিকক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে সামলে সে বলল, কিন্তু এ খবর কি গোপন রাখা যায়?
যায়।–ধ্রুব মৃদু গলায় বলল, লোকের সামনে না বেরোলেই হয়।
সেটাও কি এই পরিবারের নিয়ম?
তাই তো জানি।
তোমরা শহরে বাস না করে আফ্রিকার জঙ্গলে গিয়ে থাকলে ভাল হত। সেখানে মানাত তোমাদের।
ধ্রুব কাতর গলায় বলল, মানছি। কিন্তু তবু যে পরিবারে এসেছ সেই পরিবারের প্রচলিত নিয়মগুলো খামোকা ভাঙতে যেয়ো না।
তা বলে দশ মাস ঘরবন্দি থাকতে হবে?
তা নয়। বেরোবে মাঝে মাঝে। কিন্তু নিজের মুখে এখনই খবরটা কাউকে দিতে যেয়ো না।
রেমি ফুঁসতে লাগল, কিন্তু আর ঝগড়া করল না ধ্রুবর সঙ্গে। তবে তার মনে একটা সন্দেহ ওত পেতে রইল। ধ্রুব বোধহয় কথাটা বানিয়ে বলেছে। নজর লাগার ব্যাপারটা একদম বাজে। সম্ভবত এই অযৌক্তিক অনুরোধের পিছনে অন্য কোনও গৃঢ় কারণ আছে।
পরদিনই ধ্রুব তাকে নিয়ে গেল একজন গায়নোকোলজিস্টের কাছে। ডাক্তারটি গোমড়ামুখো এবং কম কথার লোক। তবে ডাক্তারের অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটি ভারী হাসিখুশি এবং ছলবলে। রেমিকে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা সে-ই করল। তারপর বলল, আপনি প্রেগন্যান্ট, একথা কী করে জানলেন?
রেমি অবাক হয়ে বলল, কেন বলুন তো! নই নাকি?
মনে তো হচ্ছে না।
কিন্তু আমি সব লক্ষণই টের পাচ্ছি।
মেয়েটি হেসে বলল, ওরকম কত ফিলিং হয় মেয়েদের!
তবে আমার কী হয়েছে?
মনে হচ্ছে ভিতরে একটা ব্লাড ক্লট প্যাসেজে আটকে আছে। ওটাকে রিমুভ করা দরকার।
কেন?
ওটা থাকলে নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বেশিদিন থাকলে ক্যানসার অবধি হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
আপনি সেন্ট পারসেন্ট শিয়োর?
তা অবশ্য নই। তবে কাল আপনাকে একটা ক্লিনিকে ভর্তি হতে হবে। আরও পরীক্ষা আছে। তারপর হয়তো একটা মাইনর অপারেশন করতে হবে।
