রেমির মনটা আবার ঝাৎ করে ওঠে। কেমন একটা সন্দেহ ঘুলিয়ে ওঠে মনে। কিন্তু ডাক্তারের যা চকচকে চেম্বার, নানারকম গ্যাজেট, অ্যাসিস্ট্যান্টের হাবভাবের মধ্যে উঁচুদরের পেশাদারি দক্ষতা এসব দেখে সে উচ্চবাচ্য করল না। সে ডাক্তার নয়, বিশেষজ্ঞ নয়, সে কী করে সব কিছু জানবে?
কিন্তু সন্দেহ ছিল। বারবার উসখুস করে উঠছে একটা অস্বস্তি, অজানা ভয়। ফেরার পথে গাড়িতে সে ধ্রুবকে জিজ্ঞেস করল, এরা কারা?
কারা মানে?
উনি কি খুব ভাল ডাক্তার?
খুব ভাল। যে-কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারো।
জিজ্ঞেস করতে হবে না, রেমি জানে। খুব উঁচুদরের ডাক্তার ছাড়া কৃষ্ণকান্তর পুত্রবধূর চিকিৎসা আর কেউ করবে না।
রেমি মৃদুস্বরে বলল, ব্লাড ক্লট না কী যেন বলছিল মেয়েটা। ওরকম কি হয়?
না হলে বলছে কেন?
মা-মাসিদের কারও এরকম হয়েছে বলে শুনিনি।
শোনোনি বলেই কি হতে নেই?
আমার কেমন ভয় করছে। অন্য কোনও ডাক্তারকে দেখালে হয় না?
কাকে দেখাতে চাও?
আমার বাপের বাড়ির ডাক্তার হলেন অমিত গুপ্ত। ভাল গাইনি।
ধ্রুব একটু অবাক হয়ে রেমির দিকে চেয়ে বলল, বাপের বাড়ি?
রেমি সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। তার খেয়াল ছিল না, ধ্রুবদের পরিবারে যারা বউ হয়ে আসে তাদের অতীত মুছে ফেলেই আসতে হয়। কোনও সূত্রেই বাপের বাড়ির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিশেষ থাকে না। কথায়-কথায় বাপের বাড়ির রেফারেন্স দেওয়া বারণ, বাপের বাড়ির কোনওরকম সাহায্য নেওয়া বারণ, এমনকী ছোটখাটো নিমন্ত্রণেও সেখানে যাওয়া নিষেধ। রেমির অবশ্য এই নিয়ম মেনে নিতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি। কৃষ্ণকান্ত তাকে অগাধ স্নেহ দিয়ে ঘিরে রেখেছেন, দেওরননদদের কাছ থেকেও সে যথেষ্ট আদর আর সহানুভূতি পায়। একমাত্র স্বামীটিই যা অন্যরকম। তবু এই সুদর্শন ও অদ্ভুত মানুষটির প্রতি এক রহস্যময় আকর্ষণ এবং একে আবিষ্কার করার এক নাছোড় নেশা রেমিয় শূন্যস্থানটি ভরিয়ে রেখেছে। বাপের বাড়িকে সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, কিন্তু ধ্রুবর ওই বাপের বাড়ি? প্রশ্নটি উচ্চারণে যে প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপ টের পেল সে, তাতে মন ফুসে উঠল হঠাৎ।
রেমি শান্ত গলায় বলল, হ্যাঁ। আমার বাপের বাড়ির রুগি দেখেন বলে তো আর অমিত গুপ্ত পচে যাননি।
রেমির কথার ঝঝে ওর মনের অবস্থাটা টের পেয়েই বোধহয় ধ্রুব কথাটা ঘুরিয়ে নিল। বলল, ভয় পেয়ো না রেমি, তোমাকে যিনি দেখছেন তিনি দেশের সবচেয়ে ভাল ডাক্তারদের একজন।
জানি। তবু বড় ডাক্তারদেরও ভুল হয়। আমি আর-একজন ডাক্তারকে দেখাতে চাই।
বেশ। দেখাবে।
কথা রেখেছিল ধ্রুব। পরদিন আরও একজন বড় ডাক্তার রেমিকে দেখল এবং অনেক রকম প্রশ্ন করল। কিন্তু রেমির প্রশ্নের জবাব দিল না। একটু স্নেহসিক্ত হাসিমুখে এড়িয়ে গেল বারবার।
রেমি কিছুতেই বুঝতে পারল না, তার গোলমালটা কী।
ফেরার সময় গাড়িতে ধ্রুব একটু হেসে জিজ্ঞেস করল, আরও ডাক্তার দেখাবে? আরও আছে। কিন্তু!
রেমি স্থির চোখে সামনের দিকে চেয়ে উউনডস্ক্রিনের আয়ত চতুষ্কোণে দ্রুত গুটিয়ে আসা রাস্তা দেখছিল শূন্য চোখে। একটা চক্রান্ত! একটা গণ্ডগোল! একটা অদ্ভুত ও অর্থহীন ষড়যন্ত্র! নইলে তার বাচ্চা হবে শুনে প্রথম দিনই ধ্রুব অমন সাদা হয়ে গেল কেন?
রেমি ধ্রুবর কথার জবাব দিল না। বাড়ি ফিরে এসে শুধু বালিশে মুখ ঠেসে ধরে গোপনে কাঁদল কিছুক্ষণ।
পরদিন একটা চমৎকার ক্লিনিকে ভর্তি হল সে। প্রথমূবারের গোমড়ামুখো ডাক্তারটি এত নিপুণভাবে সেই রহস্যময় জমাট রক্তটি বের করে নিল যে রেমি কোনও শারীরিক যন্ত্রণা প্রায় টেরই পেল না। কিংবা পেলেও তা প্রকাশ করল না একটুও। দুটো দৃঢ়বদ্ধ ঠোঁট বজ্রের মতো এঁটে থেকে ভিতরকার সব যন্ত্রণার শব্দকে আটকে রাখল। পরদিন একটু সাদা, একটু ক্লান্ত এবং একটু বিষণ্ণ চেহারা নিয়ে সে ফিরে এল বাড়িতে। ধ্রুবর সঙ্গেই।
ধ্রুব সেদিন কোনও কথা বলল না। ঠাট্টা নয়, সান্ত্বনা নয়, কিছু না। সেই রাতেই সে অফিসের কাজে চলে গেল বোম্বাই। সাত দিন আর তার কোনও খবর নেই।
সেই সাত দিনের মধ্যেই অবশ্য কৃষ্ণকান্ত বিদেশ থেকে ফিরলেন। প্রচুর জিনিসপত্র এনেছেন। সেগুলো আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে হই হই করে বিলোলেন। রেমির জন্য এনেছিলেন ফরাসি ও জারমান কয়েক রকম সুগন্ধ, বিখ্যাত সব শিল্পের দামি প্রিন্ট, সোনার বালার সেট করা ঘড়ি, কাট গ্লাসের কিছু জিনিস।
এত দামি সব উপহার পেয়েও যে রেমির মুখে সত্যিকারের খুশি উপচে পড়ল না এটা লক্ষ করেছিলেন কৃষ্ণকান্ত। বুদ্ধিমান মানুষ তাই প্রথমেই জেরা করেননি। পরদিন রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে উচ্চকিত হয়ে উঠলেন, সেই দামড়াটা কই? সেটা আবার কোথায় গেল?
দামড়াটা যে কোনওকালেই কৃষ্ণকান্তর সঙ্গে বসে খায় না এটা সবাই জানে। তবু অভিনয়টা দেখালেন ভালই। রেমির দিকে চেয়ে বললেন, এই তল্লাটে আছে, না হিল্লিদিল্লি কোথাও গেছে?
নতমুখে রেমি বলল, বোম্বাই। অফিসের কাজে।
অফিস!–কৃষ্ণকান্ত চোখ বড় বড় করে বলল, আবার চাকরিতে ঢুকেছে নাকি? কোন কোম্পানির সর্বনাশ করছে এবার?
খাওয়ার পর রেমিকে স্টাডিতে ডেকে নিয়ে সুদর্শনের মেয়ের বিয়ে সম্পর্কে সব খুঁটিয়ে শুনলেন। সুদর্শনের সঙ্গে তার কতকালের ও কেমন বন্ধুত্ব তারও অনেক মজার ঘটনা বললেন। তারপর খুব নিরীহভাবে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে কেন এত রোগা দেখছি মা? দামড়াটার সঙ্গে কিছু আবার হয়নি তো!
