বুড়ো মাঝি হারান এতক্ষণ সশ্রদ্ধভাবে চুপ করে ছিল। এখন হঠাৎ হাত জোড় করে বলে উঠল, কর্তা, কয়েকখানি কচি বেত কেটে নেব? বেতাইক খেতে বড় ভাল।
হেমকান্ত ঘাড় নেড়ে বললেন, আন।
কৃষ্ণকান্ত বলে, আমিও যাব বাবা?
হেমকান্ত বলেন, ভীষণ কাটা। সাবধানে যেয়ো।
হেমকান্ত শুষ্ক বালুকাময় তীরে বসলেন। হারান নৌকোর খোল থেকে একটা চকচকে দা বের করে বেতবনে চলল। সঙ্গে কৃষ্ণকান্ত। হেমকান্ত আনমনা চোখে দেখতে লাগলেন। হু হু করে হাওয়া কত জায়গা, কত গাঁ গঞ্জ ছুঁয়ে এসে তার কানে কত কী বলে যাচ্ছে ফিসফিস করে। বেলা দুপুরের খাড়া ও চড়া রোদে বড় তেতে আছে বালি। হেমকান্ত রোদকে অগ্রাহ্য করে বাতাসের কথা শুনতে লাগলেন।
বাতাস বলে, বহুদুরে এসে গেছ তুমি, বহু দূর। আর কি ফিরে যাওয়ার দরকার আছে? তোমার ছেলেকে নিয়ে মাঝি ফিরে যাক। তুমি বেরিয়ে পড়ো মহাপৃথিবীর দিকে।
হ্যাঁ, বাতাসের কথা তো এ নয়। এ হয়তো তারই গভীর অভ্যন্তরের কথা। বাতাসে সেই কথাই ছড়িয়ে যাচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করলেন তিনি। বেরিয়ে পড়া তাঁর কাছে সহজ নয় ঠিকই, আবার অসম্ভব কিছুও নয়। কিন্তু তিনটি ভাইয়ের মধ্যে বংশের সলতে জ্বলছে মাত্র একটি। তিনি চলে গেলে কৃষ্ণকান্তকে স্থানান্তরিত করা হবে। বিশাখার বিয়ে দিতে দেরি হবে না। ছেলেরা জমিদারিতে উৎসাহী নয়। আয় কমে যাচ্ছে, ঋণ বাড়ছে। তারা হয়তো গোটা সম্পত্তিই বিক্রি করে দেবে। বাড়ি অন্ধকার হয়ে যাবে।
না, আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই হবে তাকে।
বাতাস ফিসফিস করে বলল, আর কোনও কারণ নেই? রঙ্গময়ি! রঙ্গময়ির কথা ভুলে গেলে! তোমার সবচেয়ে শক্ত বন্ধন!
বুকের বাঁ ধারে আবার সেই ব্যথা। অবোধ যন্ত্রণা। হেমকান্ত ফিসফিস করে বললেন, মনু সুখী হোক।
সুখ কি সোজা! জানো না, প্রিয় মানুষ ছাড়া মানুষের কোনও সুখই নয়! তুমি ছাড়া রঙ্গময়ির এই বিশ্ব দুনিয়ায় সুখের আর কে ভাগীদার আছে?
শুধু আমি! তা কেন? রঙ্গময়ির আছে সেবা, আছে দেশোদ্ধার, আছে স্বদেশপ্রীতি। আমি তো অপদার্থ।
সেসব যুক্তি কি বোঝে হৃদয়? বাল্যাবধি রঙ্গময়ি কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে সে কি জানো না?
যদি এতদিনে রঙ্গময়ির বিয়ে হয়ে যেত তা হলে? তখন কোথায় থাকত সেই বাল্যপ্রেম, কোথায় থাকতাম আমি?
তুমি ঠিকই থাকতে। তার হৃদয়ের সংগোপনে এক কোণে। রঙ্গময়ির বিদ্রোহ ছিল অন্যরকম। বিয়ে ভাঙার জন্য নিজের নামে কলঙ্ক রটনাকে সে কি প্রশ্রয় দিত না! না দিলে সে অন্তত একবার তার নিন্দুকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করত। তা না করে সে এসে ঝগড়া করত তোমার সঙ্গে।
তা ঠিক। কিন্তু আমি কী করব? আমার কী করার আছে?
রঙ্গময়ি তোমার সবচেয়ে বড় বন্ধন। মহাপৃথিবীর দিকে যে অবারিত পথ তাতে সবচেয়ে বড় বাধা রঙ্গময়ি।
না।–নিঃশব্দে এক আর্তনাদ বুক থেকে উঠে এল হেমকান্তর।
শোনো, তুমিও রঙ্গময়ির জীবনে এক অভিশাপ। তোমাদের ওই বাড়ি, ওই সংসারে আজও সে দাসীর মতো পড়ে আছে এক অদ্ভুত মোহের জন্য। তা কি জানো? নইলে রঙ্গময়ির জন্যও ছিল অন্য এক পৃথিবী। সে তোমাকে ত্যাগ করতে পারে না।
হেমকান্ত মাথা নত করে বসে রইলেন।
বাবা, বাড়ি যাবেন না?–কৃষ্ণকান্তের আচমকা ডাকে চমকে ওঠেন তিনি।
চলো যাই।–বলে উঠলেন তিনি।
কৃষ্ণকান্ত এক গোছ বেত বয়ে এনেছে। কাঁটায় হাত রক্তাক্ত কিন্তু তার মুখে তৃপ্তির হাসি।
নৌকোয় ওঠার পর হেমকান্ত বললেন, হাত দুটো নদীর জলে ধুয়ে নাও।
কৃষ্ণকান্ত নৌকোর বাইরে ঝুঁকতেই হেমকান্ত বললেন, সাবধান। নদীতে কুমির আর কামট আছে। দেখে নাও।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নাড়ল। শীতের জল স্বচ্ছ। দুপুরের রোদ বহুদূর জলের মধ্যে প্রবেশ করেছে। দেখে শুনে জলে হাত দিল কৃষ্ণকান্ত। কাটায় হাত ছড়ে যাওয়াতেও যে বাবা তাকে বকেননি এর জন্য সে কৃতজ্ঞ বোধ করে।
উজানে নৌকো বাইতে বেশ কষ্ট। এক জোড়া বইঠা হারানের হাতে। দ্বিতীয় জোড়া হেমকান্তর হাতে। তিনি গলদঘর্ম হচ্ছেন।
কৃষ্ণকান্ত হাত বাড়িয়ে বলল, আমি কিছুক্ষণ বাই, বাবা?
পারবে? হাত তো কেটে ফেলেছ!
ওটা কিছু নয়। পারব।
নাও।–ছেলের হাতে বইঠা দিয়ে হেমকান্ত ধুতির খোঁটায় মুখের ঘাম মুছলেন।
বাড়ি ফিরে আসার পর রঙ্গময়ি একটু রাগারাগি করল। এত বেলা পর্যন্ত একটা দুধের বাচ্চাকে নিয়ে টো-টো করে ঘুরে বেড়াও, তোমার হল কী বল তো! বেত কাটতে গিয়ে ছেলেটার হাত দুটো কী পরিমাণ কেটেকুটে গেছে! আচ্ছা বাপ যা হোক।
হেমকান্ত রঙ্গময়ির দিকে ভাল করে তাকাতে পারেন না। কেমন এক পাপবোধ তাকে ঘেঁকে ধরেছে ভুতের মতো। শুধু বললেন, কষ্ট করতে শিখুক, আঘাত সহ্য করতে অভ্যাস করুক। না হলে তোমার স্বদেশি দলে ভিড়বে কী করে?
স্বদেশি দলে ও কেন ভিড়বে? ও হচ্ছে জমিদারের ছেলে, ইংরেজ কর্তাদের পেয়ারের লোক।
ও তো জমিদারি চায় না। ও চায় স্বদেশি হতে।
তাই নাকি? তোমাকে বলেছে?
সরাসরি বলেনি। হাবে ভাবে বলছে।
তা হলে এখন থেকে সাবধান হও।
কী করে সাবধান হব? ও হচ্ছে একটা হাওয়া। যার গায়ে লাগে সেই বিগড়ে যায়। ওঝা-বদ্যির কাজ নয় যে সারিয়ে দেবে।
অতই যদি ভয় তবে কনক কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইছে, পাঠিয়ে দাও না কেন?
পাঠালেই বা কী হবে? ওর মনুপিসি যে ওর বারোটা বাজিয়ে রেখেছে।
রঙ্গময়ি একথায় হেসে ফেলল। বলল, তা হলে আমাকেই না হয় তাড়াও। ছেলের চেয়ে তো আমি বড় নই।
