শীতের সকালে ছোট খেয়া নৌকোটি মৃদুমন্দ চালে ভেসে চলেছে। বইঠা তুলে নিয়েছেন হেমকান্ত। তার ইশারায় কৃষ্ণকান্তও তাই করেছে। মৃদু স্রোতে নৌকো বয়ে চলেছে ভাটিতে। নদীর মাঝ বরাবর অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা আছে। মুগ্ধ বিভোর হেমকান্ত সেই নিস্তব্ধতাকে অনুভব করছেন। মাঝে মধ্যে গাংচিল বা কোনও পাখির ডাক ভেসে আসে। আর আছে জলের মৃদুমন্দ শব্দ। যেন তা এই নিস্তব্ধতাকেই গভীরতর করে তোলে। কৃষ্ণকান্ত তার বাবার এই তদগত ভাব লক্ষ করে সতর্কভাবে চুপ করে থাকে। নৌকো যাতে দিকভ্রষ্ট না হয় তার জন্য হেমকান্ত অভ্যস্ত হাতে একটি বইঠা জলে ড়ুবিয়ে রাখেন কিছুক্ষণ। আবার তুলে ফেলেন। এ ছাড়া অনেকক্ষণ আর তার বাহ্যিক কোনও নড়াচড়া থাকে না।
অনেকটা ভাঁটিয়ে গিয়ে যেখানে নদী একটা বাঁক নিয়েছে সেইখানে নৌকোকে ধীরে ধীরে তীরের দিকে চালনা করেন হেমকান্ত। ভারী নির্জন জায়গা। ধারে কাছে গাঁ গঞ্জ নেই। নদীর ধারে বেঁটে কাটাঝোপ আর বেতবন। তটস্থ মাঝি জিজ্ঞেস করে, নৌকো বাঁধব কর্তা?
বাঁধ।–হেমকান্ত উদাস স্বরে বলেন।
বুড়ো মাঝি একটা লগি পুঁতে নৌকোটা বাঁধে। হেমকান্ত হাটুজলে নেমে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণকান্তর দিকে চেয়ে বলেন, নামো।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো কৃষ্ণকান্ত জলে নেমে দাঁড়ায়। শীতের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা জল তার কোমর অবধি ওঠে। হেমকান্ত সেদিকে খেয়াল করেন না। ধীরে ধীরে তীরভূমির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলেন, এই সেই জায়গা। এই সেই জায়গা।
বেতবন উত্তরে বাতাসের শব্দ হুহু করে শোকাবহ শব্দ তুলে বয়ে যাচ্ছে। ঝিমঝিম করছে রোদ। আস্তে আস্তে হেমকান্ত ডাঙায় উঠে দাঁড়ালেন, সঙ্গে কৃষ্ণকান্ত।
হেমকান্ত নদীর ধারে দাঁড়িয়ে উদাস দৃষ্টিতে ব্রহ্মপুত্রের বহমানতার দিকে চেয়ে থেকে বলেন, নৌকোটা ড়ুবেছিল আরও উজানের দিকে। অনেকটা দূরে, শহরের কাছাকাছি। নলিনী এত দূরে ভেসে এসেছিল। কেন কে জানে!
কৃষ্ণকান্ত বোবা বিস্ময়ে শান্ত সুন্দর জায়গাটির চারদিকে চেয়ে সেই ঘটনার বিষণ্ণ রেশটুকু খুঁজতে থাকল। তারপর বয়সোচিত ছেলেমানুষি একটা প্রশ্ন করল, কাকা কি সাঁতার জানত?
হেমকান্ত তার দিকে ফিরে একটু হেসে বললেন, জানত। খুব ভাল সাঁতার দিতে পারত নলিনী। ভরা বর্ষাতেও ব্ৰহ্মপুত্ৰ এপার ওপার করত।
তা হলে ড়ুবে গেল কেন?
কে জানে। ভবিতব্য।
মনুপিসি বলে, সাঁতার জানলে নাকি কেউ জলে ড়ুবে যেতে পারে না।
হেমকান্ত একথার জবাব দিলেন না। আঘাটায় দাঁড়িয়ে চেয়ে রইলেন স্রোতের দিকে। নদীর স্রোত জিনিসটাই ভারী অদ্ভুত। এ যেন সময় ও জল একসঙ্গে মিশে চলেছে মোহনার দিকে।
কৃষ্ণকান্ত বলল, মনুপিসি বলে, কাকাকে কেউ মেরে জলে ফেলে দিয়েছিল।
বলে নাকি?–হেমকান্ত একটু হাসলেন।
কৃষ্ণকান্ত উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কাকার গায়ে কি খুব জোর ছিল বাবা?
তা মন্দ ছিল না। ব্রহ্মচারী মানুষ সে। সংযম ছিল, সর্বদা পরিশ্রম করত। জোর থাকারই কথা।
ব্যায়াম করত না?
বোধহয় করত।
কাকা লাঠি চালাতে জানত?
শিখেছিল খানিকটা।
তা হলে কাকাকে মারল কী করে?
হেমকান্ত একটু হেসে বললেন, সেটা তুমি তোমার মনুপিসিকেই জিজ্ঞেস কোরো।
কৃষ্ণকান্ত তার সরল চোখে অগাধ বিস্ময় নিয়ে বাবার দিকে চেয়ে বলে, মনুপিসি বলে,কাকার গায়ে নাকি ভীষণ জোর ছিল। একবার কাকা লাঠি নিয়ে একদল ডাকাতকে মেরেছিল।
হেমকান্ত হোঃ হোঃ করে হেসে ওঠেন। কৃষ্ণকান্তর মনের মধ্যে একটা বীরত্বের বীজ বপন করতে চাইছে রঙ্গময়ি। রঙ্গময়ি নয়, পুরোদস্তুর মিথ্যাময়ি। হাসলেও হেমকান্ত এ ব্যাপারটাকে প্রশ্রয় দিতে চাইলেন না। ছেলের পিঠে হাত রেখে বললেন, মনু একটু বাড়িয়ে বলেছে। অতটা নয়। নলিনী ডাকাত মারলে আমি ঠিকই জানতে পারতাম।
একথায় কৃষ্ণকান্ত একটু হতাশ হল। কাকার বীরত্বের কথা তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় বটে, কিন্তু সে জানে, তার বাবা সর্বদাই ঠিক কথা বলেন। সরলভাবেই কৃষ্ণকান্ত বলে, তা হলে মনুপিসি কি মিথ্যে কথা বলেছে?
রঙ্গময়িকে মিথ্যাবাদী বলতে বাধে হেমকান্তর। তিনি বললেন, রূপকথা বা ভূতের গল্পও তো বানানো জিনিস, তা বলে যারা সেগুলো লিখেছেন তারা কি মিথ্যেবাদী?
যুক্তিটা ঠিক বুঝল না কৃষ্ণকান্ত। হাঁ করে কিছুক্ষণ বাবার দিকে চেয়ে থেকে বলল, ভূতের গল্প কি সত্যি নয় বাবা?
না। ভূত বলে কিছু নেই।
কিন্তু কম্পাউন্ডার কাকা যে মাকে মাঝে মাঝে দেখতে পায়!
ওটা তো পাগল। ও কী দেখে আর কী না দেখে তার কোনও মাথামুন্ডু আছে নাকি?
পক্ষীরাজ ঘোড়া! তাও কি নেই?
না। ওসব মানুষের কল্পনা।
কৃষ্ণকান্ত একটু ব্যথিত হল বোধহয়। কিন্তু চুপ করে ভাবতে লাগল।
হেমকান্ত একবার ভাবলেন শিশুমনের কল্পনাশক্তিকে আঘাত করে হয়তো কাজটা ভাল করলেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হল, তিনি যেমন অতিশয় কল্পনাপ্রবণ ও বাস্তববুদ্ধি বর্জিত হয়েছেন তেমনটা না হওয়াই কৃষ্ণকান্তর পক্ষে ভাল। অন্তত এই একজন কঠোর বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন যুক্তিবাদী ও কর্মঠ হয়ে উঠুক।
হেমকান্ত ছেলের দিকে স্নেহভরে চাইলেন, বললেন, এসো, এখানে দাঁড়িয়ে কাকাকে একটা নমস্কার জানাও। শ্রদ্ধাবোধ বড় ভাল জিনিস।
কৃষ্ণকান্ত সঙ্গে সঙ্গে হাতজোড় করে চোখ বুজল।
হেমকান্তও কিছুক্ষণ চোখ বুজে নলিনীকান্তকে স্মরণ করলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কত কথা মনে পড়ে গেল। তাদের তিন ভাইতে খুব সদ্ভাব ছিল, কিন্তু বাক্য বিনিময় বিশেষ হত না। তিন জনের প্রকৃতিই কিছু গম্ভীর। তা ছাড়া নলিনী নিজেকে সংসারের বাইরে নির্বাসিত করেছিল বলে তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল আরও কম। বেঁচে থাকলে আজ নলিনীর বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হত। একটি সাইকেল ছিল তার অচ্ছেদ্য বাহন। কোথায় কোথায় চলে যেত সাইকেলে চেপে। বেলা অবেলা মানত না, নিয়মিত স্নান-খাওয়া ছিল না। তেলের অভাবে মাথার চুল পিঙ্গল বর্ণ ধারণ করেছিল। গালে অযত্নের দাড়ি বেড়ে উঠত। সাধারণ টুইলের শার্ট আর ধুতিই ছিল তার পরিধান। পায়ে তালতলার চটি আর কাঁধে উড়নি। পাবনার এক আশ্রমের সঙ্গে ছিল তার গভীর যোগাযোগ। মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে সে আশ্রমে গিয়ে বেশ কিছুদিন করে থেকে আসত। পাকাঁপাকি আশ্রমবাসী হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তার। কিন্তু মা বেঁচে থাকতে সেটা আর পেরে ওঠেনি। বড় ছেলে সন্ন্যাস নিয়েছে, ছোটটিও আশ্রমবাসী হলে মা শোকে মারা পড়তেন। কিন্তু আজ হেমকান্ত ভাবেন, নলিনী আশ্রমবাসী হলেই বোধহয় ভাল হত। বেঁচে তো থাকত।
