সমীর সে কথায় কান না দিয়ে বলল, ইন ফ্যাকট কাকাও ভয় পাচ্ছেন। তার যদিও মত ছিল না, তবু বলছেন, কৃষ্ণকান্তর কথা ফেলা ঠিক হবে না, তুই গিয়ে ঘুরে আয়।
তাই আপনি আমার কাছে এসেছেন?
আমি যে জানি, এর পিছনের কারণটা হলেন আপনি।
এবার রেমি লজ্জায় এবং রাগে লাল হয়ে উঠল। শ্বশুরমশাই কাজটা ঠিক করেননি। রেমিকে তার বিশ্বাস করা উচিত ছিল। তা ছাড়া ধ্রুব তো এসব গ্রাহ্য করে না, শ্বশুর হয়ে ওঁর তা হলে এত মাথাব্যথা কেন?
রেমি হঠাৎ অত্যন্ত দৃঢ় স্বরে বলল, রিস্ক আমারই। আপনাকে যেতে হবে না।
সমীর বোধহয় একটু অবাক হল। বলল, সত্যিই রিস্ক নেবেন?
নেব। আপনার সন্দেহটা দূর করা দরকার। আমার শ্বশুরমশাই অতটা মীন নন।
মীন কথাটা আমি কিন্তু উচ্চারণ করিনি।
আপনি সেটাই বোঝাতে চাইছেন।
না।–সমীর মাথা নেড়ে একটু শ্লেষের গলায় বলল, বরং আমি বলতে চাইছিলাম কৃষ্ণকান্তবাবু বড় বেশি পিউরিটান। বঙ্কিমের একটা লাইন আছে জানেন! ইহারা কুকুর মারে, কিন্তু হাঁড়ি ফেলে না।
তার মানে!
কৃষ্ণকান্ত তাঁর পুত্রবধূকে কিছুই বলবেন না, কিন্তু দরকার হলে আমাকে কান ধরে কলকাতা পর্যন্ত দৌড় করাবেন। ওঁর পিউরিটানিজমও একপেশে।
রেমি তর্ক করল না। কারণ ভিতরে ভিতরে তারও কিছু ভূমিক্ষয় হয়ে থাকবে। শ্বশুরের ওপর অনেক কারণে অনেকবারই ক্ষুব্ধ হয়েছে সে, তবে কোনওবারই শ্বশুরের ব্যবহার তাকে মারাত্মক আঘাত করেনি, এটা করল।
সারারাত ঘুমোল না রেমি। মাথা গরম। কখনও চোখে জল আসে, কখনও শরীর দিয়ে রাগের হলকা বেরোয়।
সকালে উঠেই স্নান করে পোশক পর সে। সমীরকে ডেকে বলল, চলুন কোথাও একটু বেড়াতে যাই।
সমীর বিস্মিত হয়ে বলে, তা হলে কলকাতা যাব না বলছেন!
না, কিছুতেই না।
দেখবেন গরিবকে ধনেপ্রাণে মারবেন না।
রেমি বলল, মরলে আমিই মরব। আপনার ভয় নেই।
সেদিন একটা আমরাসাড়ার গাড়িতে তারা গেল জলঢাকা অবধি। সাইটে সমীরের একটু কাজও
ছিল।
পথে প্রথম দিকটায় দুজনের কেউই কথা বলেনি। অনেকক্ষণ বাদে সমীর বলল, ছন্দার ব্যাপারে আপনি এবং ধ্রুব আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।
রেমি অবাক হয়ে বলল, সে কী! আমি তো উলটো ভেবেছিলাম।
সমীর মাথা নেড়ে বলল, না। আমি প্রায় ছেলেবেলা থেকে ওকে ভালবাসি ঠিকই, কিন্তু বরাবর আমার একটা দ্বিধাও ছিল। ছন্দা পাগলামি না করলে আমি ওই কাণ্ড করতাম না।
রেমি বলল, জানি। ছেলেরা রিস্ক নিতে ভয় পায়।
হ্যাঁ। কারণ ছেলেরা অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা করে। মেয়েরা করে না। আমি ছন্দাকে বিয়ে করলে কাকা আমার মুখদর্শন করতেন না। ছন্দা আর এ বাড়িতে ঢুকতে পেত না। আমরা অসামাজিক হয়ে যেতাম।
আপনি কি আর ছন্দাকে ভালবাসেন না?
সে কথা বলা কঠিন। হয়তো বাসি। আর বাসি বলেই চাই, ওর ভাল হোক।
ভালই কি হচ্ছে?
মনে তো হয়। অন্য ছেলের সঙ্গে বিয়ে হলে ও প্রথমটায় খুব অসুখী থাকবে ঠিকই, কিন্তু ক্রমে ক্রমে সেটা কেটে যাবে।
আপনার মনের অবস্থা কী?
কাকাকে খুব বড় একটা আঘাত দিতে হচ্ছে না এটা ভেবে আমি স্বস্তি পাচ্ছি। আপনি জানেন, আমি আমার কাকাকে ভীষণ ভালবাসি। নিজের বাবার চেয়েও বেশি। আমি কাকার কাছেই মানুষ বলতে গেলে।
রেমি বহুদিন পর একটা তৃপ্তি বোধ করতে লাগল।
সমীরের সঙ্গে সেই যে ভাব হয়ে গেল তা আরও প্রগাঢ় হল কয়েক দিনে।
কতটা প্রগাঢ়? তা রেমি জানে না। তবে সে একটা কথা নিজের বুক ছুঁয়ে বলতে পারে, সেটা প্রেম নয়। যৌন আবেগ নয়। তখন তাদের কারও মনের অবস্থাই তেমন স্তরে নেই।
ছন্দার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর যখন রেমি ফিরে এল তখনও কৃষ্ণকান্ত জার্মানি থেকে ফেরেননি। ধ্রুব তার নতুন চাকরির কাজে পুনা গেছে।
নিজের গর্ভ সঞ্চারের ব্যাপারটি এখনই সহসা টের পেল রেমি।
ধ্রুব ফিরে আসতেই বলল, কী কাণ্ড জানো?
না, কী কাণ্ড?
বলব না।
বোলো না।
শুনতে চাও না?
চাই তো। কিন্তু বলতে না চাইলে কী করব?
কোনও ব্যাপারেই তোমার আগ্রহ নেই কেন বলো তো?
ওঃ রেমি!
বিরক্ত হলে?
বিরক্ত করছ যে!
তুমি যে বাবা হতে চলেছ।
আমি? আমি কেন বাবা হতে যাব?
তবে কে হবে? ভূতে?
কী ব্যাপার বলো তো!
এখনও বোঝোনি?
ওঃ! তুমি কি প্রেগন্যান্ট?
মনে তো হচ্ছে।
হঠাৎ ধ্রুবর মুখটা কেমন সাদা দেখাতে লাগল।
» ০১৯. নতুন এক আনন্দ
নতুন এক আনন্দকে আবিষ্কার করলেন হেমকান্ত। শান্ত নদী, চব, নীল ও গভীর আকাশ, দিগন্তে গারো পাহাড়, এই অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে কোমল সূর্যের আলোয় নৌকো করে খানিকটা ঘুরে বেড়ানো। কতকাল জলে বইঠা মারেননি তিনি।
রোজ সকালে কৃষ্ণকান্তর পড়াশুনো শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন তিনি। ছেলের যে ইস্কুল আছে তা তাঁর খেয়াল থাকে না। পরীক্ষার পর সবে ইস্কুল খুলেছে, তাই কৃষ্ণকান্তরও বড় একটা গরজ নেই ক্লাস করার। বরং বাবার সঙ্গে এই দুর্লভ জলযাত্রা তার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
পড়া শেষ করে কৃষ্ণকান্ত ছুটে আসে বাবার ঘরে।
হেমকান্ত প্রসন্ন মুখে উঠে পড়েন। বলেন, চলো।
সোৎসাহে কৃষ্ণকান্ত বলে, আজ সেই জায়গাটায় যাবেন বাবা?
কোন জায়গাটায়?
যেখানে কাকা ড়ুবে গিয়েছিল।
হেমকান্ত মৃদু হেসে বলেন, সেই জায়গাটা দেখে কী করবে?
এমনি। দেখব।
কাকার কথা তুমি খুব ভাবো নাকি?
খুব ভাবি।
হেমকান্ত খুশিই হন। বলেন, মহৎ মানুষদের কথা চিন্তা করাও ভাল। তাতে নিজের ভিতরেও মহত্ত্ব জেগে ওঠে।
কয়েকদিন অভ্যাসে হেমকান্ত নৌকো বাওয়ার বিস্মৃত কলাকৌশল আবার আয়ত্ত করলেন। মাঝি বসে থাকে, তিনি এবং কৃষ্ণকান্ত নৌকো চালান। বয়সের তুলনায় কৃষ্ণকান্ত বেশ দীর্ঘকায় এবং সবল। এটা অবশ্য এই বংশেরই ধারা। হেমকান্ত নিজেও বেশ দীর্ঘকায়। তবে শরীরের চর্চা করেন না বলে এখন আর ততটা সবলদেহী নন। কিন্তু তার শরীরে এখনও তেমন মেদ সঞ্চার হয়নি। সংযম এবং মিতাচারের ফলে অল্প শ্রমে ক্লান্তও হন না। স্বাস্থ্য তার ভালই। নৌকো বাইতে বাইতে তার শরীরের জরার ভাবটাও ঝরে গেছে। এখন আর বার্ধক্যের পদধ্বনি নিজের শরীরে তেমন টের পান না। যখন দিঘল চেহারার কৃষ্ণকান্ত দুটি কচি হাতে বইঠা টানে তখন তার অপরূপ দেহভঙ্গিমার ভিতর যেন নিজেকেই খুঁজে পান হেমকান্ত।
