মেজাজি একজন ডাকাবুকো শ্বশুরের সঙ্গ করে আজকাল রেমিরও কিছু মেজাজ হয়েছে। কর্তৃত্বের ভাবও এসেছে খানিকটা। সে রাগের গলায় বলল, আপনি?
সমীর খুব মৃদু স্বরে বলল, প্ল্যানটা আমার নয়। ধ্রুবর। সে আমাকে যেমন বলেছে, করেছি।
উনি তো আমাকে কিছু বলেননি।
সেটা আমি জানি না। যা সত্যি তাই বললাম। বিশ্বাস করা না-করা আপনার মর্জি।
বেশ চ্যাটাং চ্যাটাং কথা। রেমির মেজাজ আরও চড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এয়ারপোর্টে একটা সিন তৈরি করা উচিত হবে না বলে চেপে গেল। ছন্দা সমীরকে দেখেই সেই যে এক ধরনের অপরাধী ভাব করে নতমস্তক হল, আর ঘাড় তুললই না।
সুদর্শনবাবুর বাড়িতে পৌঁছে কিছুক্ষণের মধ্যেই রেমি বুঝতে পারল ছন্দার কোনও ভয় নেই। কেউ কিছু টের পায়নি। এদের যা বোঝানো হয়েছে তা হল, ছন্দা কলকাতায় গিয়ে রেমির কাছে কয়েকদিন থেকে যায়। তার দেরি হবে বলে সমীর আগেই ফিরে এসেছে। সহজ সরল বিশ্বাসযোগ্য গল্প। সুতরাং রেমির কাজ ফুরিয়ে গেল।
সে সুদর্শনবাবুকে বলল, কাকু, আমি কালই ফিরে যাব।
সুদর্শনবাবু অবাক হয়ে বললেন, সে কী? আমাকে যে ধ্রুব ট্রাংক কল করে জানিয়েছে যে, তুমি ছন্দার বিয়ে পার করে যাবে!
রেমির এক গাল মাছি। সর্বনাশ! অতদিন থাকতে হবে! এটা কি ধ্রুবর ষড়যন্ত্র?
রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার রাগের হলকা বেরোচ্ছিল। তবে সুদর্শনবাবুকে কিছু বলে লাভ নেই। ছাদে গিয়ে কিছুক্ষণ সে তার উত্তপ্ত মাথাটিকে ঠান্ডা করল। তারপর স্থির মাথায় ভাবতে বসল।
অনেক ভেবে তার মনে হল, ধ্রুব হয়তো খুব ভুল সিদ্ধান্ত নেয়নি। অবশ্য সিদ্ধান্তটার কথা তার রেমিকে জানানো উচিত ছিল। কিন্তু জানালে হয়তো রেমি আসত না। তবে ছন্দার বিয়ে পর্যন্ত এ বাড়িতে থাকাটা হয়তো দরকার। ছন্দা আর সমীরের মধ্যে সে একটা ব্যারিকেডের কাজ করতে পারবে। ওদের দুজনের কারওই মনের ভারসাম্য নেই। কখন কী করে বসে! আবার হয়তো পালাবে বা আরও খারাপ কিছু করে বসবে।
রেমি থেকে গেল।
তবে থাকাটা আগের বারের মতো সুখকর হল না। ছন্দা হাসে না, কথা বলে না, দূরে দূরে থাকে।
নন্দার একটা পরীক্ষা সামনে। সমীর লজ্জায় কাছে আসে না। অদ্ভুত এক পরিস্থিতি। তবু রেমি দাঁত মুখ টিপে রইল। ধ্রুবকে একটা চিঠি দিল না বা টেলিফোনে কথা বলল না। শুধু শ্বশুরমশাইকে টেলিফোন করে ব্যাপারটা জানাল। কৃষ্ণকান্ত বললেন, ভালই হয়েছে। ধ্রুবও বলছিল আমাকে। সুদর্শনের মেয়ের বিয়েতে আমি তো যেতে পারছি না, আমাকে দিন সাতেকের জন্য ওয়েস্ট জার্মানি যেতে হচ্ছে। তুমিই আমাদের রিপ্রেজেনটেটিভ হয়ে থাকো।
কিন্তু সারাটা দিন চুপচাপ কঁহাতক থাকা যায়? একা-একা বেড়াতে তার ভাল লাগে না। মেয়েদের একা বাইরে বেরোনো শ্বশুরমশাই পছন্দ করেন না বলে রেমি পারতপক্ষে একা কোথাও যায় না।
সময়টা খুবই খারাপ কাটবার কথা ছিল রেমির। কিন্তু সে শিলিগুড়িতে আসার দিন দুয়েকের মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটল। বিকেলে ছাদে একা বসে ছিল রেমি। ছন্দা নিজের ঘরে স্বেচ্ছাবন্দি। নন্দা কলেজ থেকে ফেরেনি। হঠাৎ সমীর রাঙা মুখে ছাদে এসে হাজির।
রেমি, আপনাকে একটা খবর দিতে এলাম।
খবর! রেমির বুক ধড়ফড় করতে লাগল। খারাপ খবর নয় তো!
সমীর বলল, খবরটা খুব উপাদেয় নয়। কৃষ্ণকান্তবাবুর হুকুম হয়েছে আমাকে কালকের ফ্লাইটেই কলকাতা যেতে হবে। কী যেন জরুরি দরকার।
রেমি ব্যাপারটা বুঝল না। বলল, তাই নাকি?
সমীর একটু হাসল। খুব শ্লেষের হাসি। বলল, আপনি হয়তো ব্যাপারটা তলিয়ে বোঝেননি।
রেমি সরলভাবে বলল, না।
কৃষ্ণকান্তবাবুর সঙ্গে আমার যোগাযোগ খুবই ক্ষীণ। আমাকে তার কোনও কারণেই খুব জরুরি কাজে ডেকে পাঠানোর মানেই হয় না। আগে কোনওদিন তেমন প্রয়োজন দেখাও দেয়নি।
রেমি বোকার মতো বলল, ডেকেছেন যখন নিশ্চয়ই কোনও কাজ আছে। আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন?
রেগে যাওয়ার কারণ আছে বলেই। উনি আমাকে এখান থেকে সরিয়ে নিতে চাইছেন, আপনি এখানে আছেন বলে।
তার মানে?
আপনার শ্বশুরমশাই চান না আপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার কোনও চান্স আমি পাই।
যাঃ, কী যে সব আবোল তাবোল বলছেন!
একটু ভেবে দেখলে আপনিও বুঝবেন। কাকা এখন আমাকে ছাড়তে রাজি নন। সামনে ছন্দার বিয়ে। আমাকে তার এ সময়ে দরকার। তবু কৃষ্ণকান্তবাবু ইনসিস্ট করছেন, যেন অবশ্যই আমাকে কলকাতা পাঠানো হয়। কোনও যুক্তিই তিনি মানতে রাজি নন।
রেমি শ্বশুরের পক্ষ নিয়ে বেশ রাগের গলায় বলল, তাতে কী প্রমাণ হয়?
সমীরকে খুবই উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। প্রায় রুদ্ধস্বরে সে বলল, তাতে একটাই জিনিস প্রমাণ হয় রেমি। ক্ষমতাবান লোকেরা যা খুশি করতে পারে। তারা ড়ুগড়ুগি বাজালেই আমাদের নাচতে হবে।
রেমি রেগে যেতে গিয়েও পারল না। সমীরের কথার ভিতরকার সত্যটুকু তাকে স্পর্শ করে থাকবে। শশুরকে সে ভীষণ ভালবাসে, ভক্তি-শ্রদ্ধাও করে। কিন্তু এও ঠিক, লোকটি অসম্ভব প্রভুত্ব করতে ভালবাসে, ভীষণ জেদি, অতিশয় কঠোর মনোভাব-সম্পন্ন।
রেমি কোমল স্বরে বলল, ঠিক আছে। আপনি না হয় যাবেন না।
সে ক্ষেত্রে রিস্কটা কে নেবে? আপনি?
কীসের রিস্ক? —রেমি অবাক হওয়ার চেষ্টা করে বলে।
রিস্ক অনেক। আমার কাকা সেটা হাড়ে হাড়ে জানে। কৃষ্ণকান্তকে চটালে কাকাকে এই উত্তরবঙ্গেও ব্যাবসা করে খেতে হবে না।
আপনি ব্যাপারটাকে ভীষণ জটিল করে তুলছেন।
