আপনি যা বলবেন।
হেমকান্ত একটু চুপ করে থেকে বলেন, হয়তো ভালর জন্যই বলছে। তুমি একটু ভেবে দেখো।
আমার কলকাতায় যেতে ইচ্ছে করে না।
কেন?
আমার এ জায়গাই ভাল।
কারও জন্য কষ্ট হবে?
আপনাকে আর ছোড়দিকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। খুব কষ্ট হবে।
হেমকান্তের বুকটা চলকে উঠল এক অনভিপ্রেত আনন্দে। যেন মায়ার একটি কলস ভরে গেল, উপচে গেল। তাকে ছেড়ে যেতে কৃষ্ণকান্তর তা হলে কষ্ট হবে? তা হলে তিনি যদি মরে যান তবে কৃষ্ণকান্ত বুঝি খুব কাঁদবে, হাহাকার করবে!
হেমকান্ত মৃদুস্বরে বললেন, আমি তো তোমার জন্য কিছুই করিনি। তুমি মা-হারা ছেলে, তোমার জন্য বোধহয় আমার আরও কিছু করা উচিত ছিল। নজরই দিতে পারলাম না তোমার দিকে।
কৃষ্ণকান্ত চুপ করে রইল।
হেমকান্তর খুব ইচ্ছে করছিল ছেলের চোখ দুটির দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকতে। কিন্তু সংকোচবশে পারলেন না। নিজের দুর্বলতা কখনও ছেলেপুলেদের কাছে প্রকাশ করতে নেই।
০১৮. ছন্দাকে নিয়ে আসা হল
ছন্দাকে নিয়ে আসা হল বটে, কিন্তু সে যেন সাপের মুখ থেকে ব্যাংকে ছাড়িয়ে আনা। শেষ অবধি সর্পদষ্ট ব্যাং বাঁচে না। যে দু-তিন দিন ছন্দা রেমির কাছে ছিল সেই কয়দিন সে কথাই বলত না। চোখে সর্বদা এক ঘোর-ঘোর চাউনি। ফঁক পেলেই কাঁদতে বসত। রেমির সে এক জ্বালা। একদিন ছন্দা হঠাৎ বলল, সমীরদা কোথায় গেল খোঁজ নেবে না, রেমি?
রেমি বিরক্ত হয়ে বলল, আবার তার খোঁজ কেন?
কোথায় আছে, কী করছে জানি না তো, তাই ভয় হচ্ছে। যদি সুইসাইড করে!
সমীর কি খোকা? আজকালকার ছেলেরা অত হট করে মরে না।
তবু একটু খোঁজ নাও। ধ্রুবদাকে বলল, ঠিক খোঁজ এনে দেবে।
তোমার কি সমীরের জন্য মন কেমন করছে?
করছে। ওর তো দোষ নেই। আমারই কেমন পাগলামি এল। নিজেও ড়ুবলাম, ওকেও ডোবালাম।
রেমি বিরক্ত হল। বলল, দু নৌকায় পা দিয়ো না ছন্দা। একটা পথ বেছে নাও। এখনও যদি সমীরের প্রতি তোমার উইকনেস থেকে থাকে তা হলে কিন্তু খুব বিপদে পড়বে।
ছন্দা অসহায়ভাবে বলল, আমি যে ওকে ভীষণ অপমান করলাম। এটা তো ওর পাওনা ছিল। প্লিজ, ওর একটু খবর এনে দাও আমাকে, তোমাদের পায়ে পড়ি।
কিন্তু সমীরের খোঁজ করা তো রেমির পক্ষে সম্ভব নয়। ছন্দা আসায় ধ্রুব একটু সংযত থাকে বটে, কিন্তু যেন একটা আনমনা উড়ুউড়ু ভাব। মুখ সর্বদা গম্ভীর। বেশির ভাগ সময়ে বাইরেই থাকে। তা ছাড়া ধ্রুবকে সমীরের খবর আনার কথা বলতে একটু লজ্জা পায় রেমি। কেন পায় তা স্পষ্ট করে ভাবতে চায় না। তবে তার ধারণা, দার্জিলিং-এর সেই ঘটনার কথা ধ্রুব জানে। শ্বশুরমশাইকে বললে অবশ্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শুধু খবর নয়, সমীরকে সুদ্ধ এনে হাজির করবে পুলিশ। কিন্তু শ্বশুরমশাইকে এসব তো বলা যাবে না। কৃষ্ণকান্ত ভিতরকার ঘটনা কিছুই জানেন না। বন্ধুর মেয়ে বেড়াতে এসেছে বলেই ধরে নিয়েছেন তিনি। কিন্তু সমীরকে খোঁজার কথা বললেই জেরা শুরু করবেন, আর সে জেরার মুখে রেমির ভিতর থেকে সব কথা টেনে বের করে নেবেন।
অগত্যা রেমি ধ্রুবকেই ধরল, ওগো, ছন্দা সমীরবাবুর জন্য খুব চিন্তা করছে। একটু খবর আনতে পারো না?
ধ্রুব অবাক হয়ে বলল, খবর কীসের?
লোকটা আত্মহত্যা-টত্যা করল নাকি, খুব ভাবছে ছন্দা।
ধ্রুব একটু হেসে বলল, সে মাল সমীর নয়। ছন্দাকে ভাবতে হবে না।
বলব, কিন্তু তাতে কাজ হবে না।
ধ্রুব একটু দোনোমোনো করে বলল, সমীর টাওয়ার হোটেলে আছে। বেশ মেজাজেই আছে। রোজই আমাদের দেখা হয়।
রেমি আকাশ থেকে পড়ল, দেখা হয়। তোমাদের দেখা হয়?
হবে না কেন? একই জায়গায় বসে আমরা মাল খাই। সমীর বেশ ভাল টানে।
রেমি কী বলবে ভেবে পেল না অনেকক্ষণ। তারপর বলল, একথাটা আমাকে বলোনি!
বলার কী! —বলে ধ্রুব নির্বিকার মুখ করে বেরিয়ে গেল।
রাগে দাঁত কিড়মিড় করল রেমি। তার রাগের কারণ, সমীরের সঙ্গে ধ্রুব সম্পর্ক রাখবে কেন? ফুঁসতে ফুঁসতে সে গিয়ে ছন্দাকে বলল, তোমাকে ভাবতে হবে না! সমীরের সঙ্গে তোমার ধ্রুবদার রোজ দেখা হয়। দুজনে একসঙ্গে বসে মদ খায়।
ছন্দা যে খুব খুশি আর নিশ্চিন্ত হল তা নয়। স্তিমিত চোখে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। যেন সমীর ভাল আছে এটা প্রত্যাশিত খবর নয়। খুব নিরুৎসুক গলায় বলল, ও, আচ্ছা।
এতে রেমির রাগ বাড়ল বই কমল না।
ছন্দার ফিরে যাওয়ার জন্য প্লেনের টিকিট কাটা হল। ধ্রুব সংসারের কোনও কাজেই নিজেকে জড়ায় না। কিন্তু ছন্দার প্লেনের টিকিট সে নিজেই কেটে আনল। একটা নয়, দুটো, টিকিট দুটো রেমির হাতে দিয়ে বলল, তুমিও ছন্দার সঙ্গে যাও। দিন দুই থেকে ফিরে এসো।
রেমি অবাক, আমি! আমি কেন যাব?
যদি কোনও কথা ওঠে তবে তুমি সামাল দিতে পারবে।
অসম্ভব! আমি যেতে পারব না। ছন্দাও তো আমাকে যেতে বলেনি ওর সঙ্গে।
ওর মাথার ঠিক নেই। আমি বলছি, তোমার যাওয়া দরকার। সুদর্শন কাকা কিছুই জানেন না, কিন্তু ছন্দার হাবভাব দেখে ওঁর সন্দেহ হতে পারে। আর ছন্দার এখন ব্যালানস নেই। এ অবস্থায় ঠান্ডা মাথার একজন কারও ওর সঙ্গে থাকা উচিত।
রেমি প্রস্তাবটায় খুশি হয়নি, তবে যৌক্তিকতাটা বুঝল। সে বলল, গেলে আমি একা কেন? তুমিও চলো।
যেতাম। কিন্তু আমার আবার একটা চাকরি হয়েছে। কালই জয়েন করতে হবে।
রেমিকে যেতে হল। কিন্তু বাগডোগরায় নেমেই সে অবাক। সমীর এবং একজন নেপালি ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে হাজির। সমীরের মুখ গম্ভীর।
