তা হলে ফাঁসি হতেও পারে।
যদি গায়ে জ্বর থাকে তবে?
জ্বর সারিয়ে নেবে।
কম্পাউন্ডারকাকাও মাকে তাই বলছিল। গায়ে জ্বর থাকলে ফাঁসি দেবে না। জ্বর সারিয়ে নেবে।
হেমকান্ত একটু হাসলেন।
কৃষ্ণকান্ত হঠাৎ বলল, কেন এরকম নিয়ম বাবা? ফাঁসিই যখন দেবে তখন জ্বর সারানোর কী দরকার?
কথাটা হেমকান্ত একটু ভেবে দেখলেন। বড় মানুষরা এমন অনেক হাস্যকর ও অযৌক্তিক আচরণ করে যা ছোটদের চোখেও অসঙ্গত ঠেকে। সত্যিই তো, ফাঁসিই যদি দিবি তো জ্বর সারানোর কী দরকার?
হেমকান্ত প্রশ্ন করলেন, তোমার কি শশীর জন্য মন কেমন করছে?
এই প্রশ্নে কৃষ্ণকান্তর চোখ ছলছলে হয়ে এল। বলল, হ্যাঁ বাবা, খুব মন কেমন করছে। শশীদার তো দোষ নেই।
খুন করা নিশ্চয়ই অপরাধ।
শশীদা তো ইংরেজ মেরেছে। তাতে তো দোষ হয় না।
ইংরেজ মারলে দোষ হয় না একথা তোমাকে কে বলল?
সবাই বলে ওটা বীরত্বের কাজ।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বিষণ্ণ গলায় বললেন, সবাই বলে না। সবাই কি অযৌক্তিক কথা বলতে পারে? ইংরেজরাও মানুষ, মানুষ মারা বীরত্বের কাজ হতে যাবে কেন?
ওরা যে আমাদের পরাধীন করে রেখেছে!
সেটা শুধু ওদের দোষ তো নয়। দোষ আমাদেরও আছে। ওরা আমাদের সেই দোষটুকুর সুযোগ নিয়েছে মাত্র। ইংরেজ যদি আমাদের পরাধীন না করত তা হলেও আমাদের রেহাই ছিল না। ফরাসি বা পর্তুগিজরা এসে আমাদের দেশ দখল করত। তুমি এসব কথা জানো না?
একটু-একটু জানি।
পরের মুখে কখনও ঝাল খেয়ো না। নিজের বিচারবুদ্ধি কাজে লাগানোর চেষ্টা কোরো। যে অবস্থায় ভারতবর্ষকে ইংরেজরা দখল করেছিল সেই অবস্থায় ইংরেজের অধীনতাই ছিল আমাদের মন্দের ভাল।
কৃষ্ণকান্ত তদগতভাবে তার বাবার দিকে চেয়ে থাকে। কোনও কথা বলে না।
হেমকান্ত জানতেন না, তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রটি তাকে কত উচ্চাসনে বসিয়ে রেখেছে। বাবা যা বলেন তাই কৃষ্ণকান্তর কাছে দেববাক্য। বাবা বলেন অবশ্য খুব কম। আর কম বলেন বলেই বোধহয় সেগুলির ওজন অনেক বেশি মনে হয় কৃষ্ণকান্তর।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, একজন-দুজন ইংরেজকে মেরে লাভ কী? ওরা সাত সমুদ্র পেরিয়ে অনেক বিপদের ঝুঁকি নিয়েই এদেশে এসেছিল। সারা পৃথিবীটা জয় করতেও তো কম সাহস লাগে না। তুমি কি ভাবো ওরা দু-চারটে বোমা-বককে ভয় পায়, না দুচারজন মরলেই ঘাবড়ে যায়! ওরা অত ভীরু জাত নয়।
তা হলে কি শশীদার ফাঁসি হওয়াই উচিত?
তা বলিনি। শশী কী অপরাধ করেছে তা আমরা এখনও জানি না। ওসব কথা থাক। তোমার মনটা বোধহয় আজ ভাল নেই।
না। আমার মনটা আজ বড্ড কেমন করছে।
তা হলে চলো, ব্রহ্মপুত্রে একটু নৌকো করে বেড়িয়ে আসি।
একথায় কৃষ্ণকান্তর মুখ উজ্জ্বল হল, অবিশ্বাসের গলায় বলল, আপনার সঙ্গে বাবা?
হেমকান্ত বুঝতে পারছিলেন না, ছেলের কাছে তার কোনও দুর্বলতা ধরা পড়ে গেল কি না। পুত্রস্নেহের কোনও প্রকাশ ঘটুক এটা তিনি চান না। বড়ই অস্বস্তিকর ব্যাপার হবে সেটা। তাই একটু লজ্জার সঙ্গে বললেন, আমারও মনটা ভাল নেই। শশিভূষণের জন্য আমি তো কিছু করতে পারলাম না। কিন্তু অতিথিকে রক্ষা করা গৃহস্থের কর্তব্য। চলো, একটা ঘুরেই আসি।
নদীর ঘাটে কয়েকটা নৌকো সর্বদাই থাকে। হেমকান্তের নিজস্ব একটা ছোট বজরাও আছে। কিন্তু হেমকান্ত আজ নিজস্ব নৌকো নিলেন না। ছোট একটা ডিঙি ভাড়া করলেন। মাঝির কাছ থেকে বইঠা নিজের হাতে নিলেন। ছেলেকে বললেন, হালটা তুমিই ধরো।
কৃষ্ণকান্তর মুখ উদ্ভাসিত হয়ে গেল আনন্দে। শীতের কবোষ্ণ বোদ, ব্রহ্মপুত্রের গৈরিক বিস্তার, রুপোলি জলের ওপর বাতাসের হিলিবিলি এবং প্রিয় পুত্রটির নিস্পাপ মুখে উত্তেজিত আনন্দের প্রভা হেমকান্তের বড় ভাল লাগল। রাত্রির অনিদ্রার কথা ভুলে গেলেন। শরীরটা যেন যৌবনের গান গাইছে। তিনি সবল হাতে বইঠা বাইতে লাগলেন। অনভিজ্ঞ কৃষ্ণকান্তর হাল ধরার দোষে মাঝে মাঝে নৌকো দিগভ্রষ্ট হচ্ছিল। একবার একপাক ঘুরেও গেল! মাঝি হালের জন্য হাত বাড়াতেই হেমকান্ত ধমক দিলেন, তুই বসে থাক। ও ঠিক পারবে।
হেমকান্তর এরকম প্রগলভ আচরণ বহুকাল কেউ দেখেনি।
তিনি নৌকোটা ভেড়ালেন নদীর মাঝখানকার চরে। সে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের জঠর যেনবা। মাথার ওপর ঘন নীল চাঁদোয়া। দুদিকেই ব্রহ্মপুত্রের গম্ভীর স্রোত বয়ে যাচ্ছে। নদীর পরপারে বসতিহীন অবাধ প্রকৃতি। চরে কলুই শাকের বীজ ছড়িয়েছিল কে। হাঁটু সমান দুব্বোঘাসের মতো অতি সবুজ ও নরম খেত কী সুন্দর!
হেমকান্ত সামান্য জল ভেঙে কৃষ্ণকান্তকে নিয়ে চরে উঠে এলেন। কিছুক্ষণ বোবা হয়ে চেয়ে দেখলেন চারদিকে। তারপর ছেলের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ভাল লাগছে না?
খুব ভাল লাগছে।
তিনি সস্নেহে কৃষ্ণকান্তের মাথার চুলে একটু হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর খেতের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চরের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত চলে গেলেন। জল ও মাটির প্রগাঢ় গন্ধ রোদে আরও ঝাঝালো হয়ে উঠেছে এখন। এই গাছপালা, ওই আকাশ, আর চারদিকের এই যে অগাধ প্রসার এর মধ্যে কোথায় হারিয়ে যায় সমাজ ও সংসার, রাজনীতি বা রাষ্ট্র।
কৃষ্ণ।
বলুন বাবা।
এসো একটু বসি।
দুজনে পাশাপাশি মাটির ওপর বসার পর হেমকান্ত প্রশ্ন করলেন, বড়দার কাছে কলকাতায় যেতে তোমার ইচ্ছে করে না?
না।
একটুও না?
একটুও না।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তবু তোমার বড়দা তোমাকে নিয়ে যেতে চায়। যাবে?
