খুলে দেবেন দরজা?
হেমকান্ত নিঃশব্দে নীচে নেমে এলেন। ভোর চারটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে রোজ তার ঘুম ভাঙে। প্রাতঃকৃত্য শুরু করেন। আজ একটু আগেই শুরু হল তার দিন।
কুয়োয় বালতি ফেললেন। হাত বেয়ে খড়খড়ে শুকনো দড়ি নেমে যাচ্ছিল নীচে। জল তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বহু নীচে গোল চক্রাকার জলের স্থির আয়না। জ্যোৎস্নায় আলোকিত আকাশের একটুখানি প্রতিবিম্ব তার বুকে। স্কুল বালতির স্পর্শে শতখান হয়ে ভেঙে গেল জলের বৃত্তাকার কাচ।
বালতিটা টেনে তুলতে ইচ্ছে হল না হেমকান্তর। দড়িটা ধরে রইলেন আলগা হাতে। তার মনে হচ্ছিল, ঠিক পিছনেই অপরূপ এক সাতরঙা ময়ূর পেখম মেলে চালচিত্রের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। পিছন ফিরলেই মুখোমুখি দেখা হয়ে যাবে। হয়তো সেই মৃত্যুর দূত।
মুঠিটা হঠাৎ আলগা করে দিলেন হেমকান্ত। দড়িটা ছপাৎ করে গভীর কুয়োর মধ্যে পড়ে গেল। পার্থিব যা কিছু আকর্ষণ ছেড়ে হেমকান্ত তাঁর মৃত্যুর মুখোমুখি হলেন।
কী চাও?
তোমাকে। শুধু তোমাকেই।–ময়ুর বলো।
আমি প্রস্তুত নই।
মৃত্যু তো কারও প্রস্তুতির ধার ধারে না। খেলার মাঝখানে খেলার ঘাঁটি তুলে নিয়ে যায়। প্রস্তুত নও সে তোমার দোষ।
মৃত্যুর কি কোনও রচনা নেই? সে কি চোর?
না। তা কেন? সে তো আসবেই, জানা কথা। বেঁচে থাকা মানেই তো প্রতিটি মুহূর্ত তার পদধ্বনির জন্য অপেক্ষা করা।
আমি অন্যরকম জানতাম।
সে কীরকম?
আমার মনে হয়, জীবনেরই পরিণতি মৃত্যু। আগে পরিপূর্ণ জীবন। উৎস থেকে শুরু করে নানা ঘাত প্রতিঘাত ভেদ করে বয়ে যাওয়া। কত বাঁক, কত খাদ, কত উঁচুনিচু, গ্রাম ও শহর ছুঁয়ে নদী যেমন যায়। তারপর মোহনায় যখন গতি শ্লথ, বিস্তার অগাধ তখন মহাসমুদ্রের সঙ্গে দেখা।
মৃত্যু উপমা মানে না, নিয়ম মানে না।
কোনও নিয়মই নয়?
তার নিয়ম আলাদা। তোমাদের সঙ্গে মিলবে না।
কেন এরকম? মৃত্যু কি স্বেচ্ছাচারী শাসক?
তার স্বরূপ জীবন থেকে জানা অসম্ভব।
সে কি এক স্থির ও ব্যাপ্ত অন্ধকার?
না। তাও নয়।
সে কি ভিন্নতর এক অস্তিত্ব?
তুমি আছো, এটা যদি সত্যি হয় তবে তুমি যে ছিলে এবং তুমি যে থাকবে তাও সত্য। কেউই তো অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব গ্রহণ করতে পারে না।
সে কেমন অস্তিত্ব?
সে এক গভীর আকাঙ্ক্ষা, আকুল পিপাসার ঘনবদ্ধ একটি বিন্দু।
কীসের আকাঙ্ক্ষা? পিপাসাই বা কীসের?
তুমি কি জানো না?
আমার আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা নেই। আমার জীবন স্তিমিত, আমার আকাঙ্ক্ষাও স্তিমিত।
তা হলে কীসের জন্য বেঁচে থাকতে চাও?
তা তো জানি না। স্বল্প পরিসরে আবদ্ধ আমার জীবন। কিন্তু তবু আমার বেঁচে থাকতে ভাল লাগে।
অন্ধকারে মিশে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন হেমকান্ত। মুখ, পা শরীরের অনাবৃত অংশগুলিতে হেঁকে ধরেছে মশা। তবু হেমকান্তের শরীরে চেতনা নেই। তার নিজস্ব চেতনা যেন চরাচরের অদ্ভুত এই জ্যোৎস্নামাখা ব্যাপ্তির মধ্যে হারিয়ে গেল।
ভোরের কিছু আগে লোকজনের সাড়া পাওয়া গেল। হেমকান্ত সম্বিতে এলেন।
শ্যামকান্ত শরীরচর্চা করতেন। তার কিছু কাঠ ও লোহার মুগুর নীচের একটা ঘরে আজও জড়ো। করা আছে। প্রাতঃকৃত্য সেরে হেমকান্ত আজ গিয়ে সেই ঘরে ঢুকলেন। ফুটবল ছেড়েছেন অনেকদিন। তারপর আর শরীর নিয়ে মাথা ঘামাননি। আজ মনে হল, মানসিক এই বিহুল ও বিবশভাবটা শরীরের আলস্যের দরুনও হতে পারে। সম্ভবত শরীরটাকে চাঙ্গা করা গেলে মনও চাঙ্গা হবে।
ঘরের দবজা সাবধানে এঁটে তিনি মাঝারি একটা মুগুর তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ ঘোরালেন। কিন্তু অল্পেই হাঁপিয়ে উঠতে হল। একটু বিশ্রাম, আবার কিছুক্ষণ ঘোরালেন। মন্দ লাগছিল না। বুড়ো বয়সের একটা খেলা।
যখন বেরিয়ে এলেন তখন মুখ লাল, গা ঘামে ভেজা। তবে মনটা একটু চনমনে লাগছিল। যেন বয়সটা এক দুই দশক পিছু হেঁটেছে। নির্দিষ্ট রুটিনের বাইরে তিনি বড় একটা চলেন না। অনিয়মের কপাটগুলো বন্ধ রাখেন। আজ নিয়ম ভাঙার একরকম আনন্দ পাচ্ছিলেন।
কৃষ্ণকান্ত তার ঘরের বারান্দায় মাদুর পেতে রোদে পিঠ দিয়ে পড়তে বসেছে। হেমকান্ত তার কাছে গিয়ে হাজির হলেন। মুখে একটু উদ্বেগ। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি একটু-আধটু শরীরচর্চা করো তো?
কৃষ্ণকান্তর মুখখানা আজ ভার এবং বিষণ্ণ। মুখ তুলে বাবাকে একটু বিস্ময়ভরে দেখে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি ফুটবল খেলি।
ও আচ্ছা, খুব ভাল।
আমি ভাল ঘোড়ায় চড়তে পারি।
বেশ। আর কী? সাঁতার কাটতে শিখেছ?
হ্যাঁ।
নীচের ঘরে কয়েকটা মুগুর আছে। ভাঁজতে পারো। মুগুর ভাঁজা ভাল।
মুগুর কি ঘোরাতে হয়?
হ্যাঁ। ওপর নীচ ডাইনে বাঁয়ে। দরকার হলে বোলো, আমি দেখিয়ে দেবখন।
বলে হেমকান্ত চলে আসছিলেন।
পিছন থেকে কৃষ্ণকান্ত ডাকল, বাবা।
হেমকান্ত ফিরে চেয়ে বললেন, কী বলছ?
শশীদা কি ফিরে আসবে?
শশী!–হেমকান্ত একটু বিপন্ন হয়ে বললেন, আসবে না কেন?
সবাই বলছে শশীদার ফাঁসি হবে।
হেমকান্ত নিস্তেজ গলায় বলেন, বিচারে দোষী প্রমাণিত হলে, হতে পারে।
যদি হয়?
আগে তো হোক।
শশীদার তো অসুখ। অসুখ না সারলেও কি ফাঁসি দেবে?
ফাঁসির কথা উঠছে কেন এখন? সে কোনও অন্যায় করেছে বলে তো আমরা জানি না।
শশীদা এক সাহেবকে মেরেছে। বরিশালে।
তুমি জানলে কী করে?
মনুপিসির মুখ থেকে শুনেছি।
মনু জানে না।
শশীদা জ্বরের ঘোরে নিজেও বলছিল।
তাই নাকি? জ্বরের ঘোরে মানুষ ভুলই বকে।
যদি শশীদা দোষী হয়েই থাকে তা হলে?
