এখন কী করা যায় সেটা তো বলবেন।
এখন রাস্তা একটাই। আমি ওকে বিয়ে করব।
ও রাজি হবে না।–রেমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলো।
আপনি ওকে রাজি করান বউদি।–একটু ভাঙা গলায় সমীর বলে।
আপনি কেন এরকম একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটাতে চাইছেন?
মরিয়া হয়ে। আমাকে শেষ করে ও দিব্যি আরামে থাকবে, তা হয় না।
এটা কি প্রতিশোধ নেওয়ার সময়?
আমি জানি না। কিন্তু এখন পিছোনোর পথ নেই।
রেমি গলায় সামান্য দৃঢ়তা এনে বলল, তা হলে আমাকে ডেকেছেন কেন? আপনার কি ধারণা এই অসামাজিক কাজ সমর্থন করব?
না। তবে আপনাকে আমার লেভেল হেডেড পারসন বলে মনে হয়েছিল। আপনি হয়তো সিচুয়েশনটা বুঝে ওকে বোঝাতে পারবেন বলে ভেবেছিলাম।
আমার সম্পর্কে আপনার ধারণা চমৎকার।
রাগ করবেন না। আমি আপনার হেলপ চাইছি।
আমি হেলপ করতে পারব না সমীর। ছন্দাকে আমি নিজের কাছে নিয়ে যেতে চাই।
আচমকাই সমীর একটু উঁচু গলায় বলল, শাট আপ। আমি ওকে খুন করব তবু ছাড়ব না। আপনি যদি আমাকে হেলপ করতে না পারেন তবে চলে যান।
রেমি একটুও ভয় পেল না। কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীর অগাধ ক্ষমতার ছায়ায় থাকতে থাকতে সে ভয় পাওয়া ভুলে গেছে। সে জানে, কৃষ্ণকান্ত সব হয়কে নয় করে দিতে পারেন।
সে বলল, ঠিক আছে, যাচ্ছি। ছন্দাকে একটা কথা বলে আসি।
ঘরে ফিরে সে ছন্দাকে বলল, ভেবো না। সমীর এখন একদম পাগল। ওকে ট্যাকল করতে হলে অন্য লোকের সাহায্য দরকার।
রেমি ঘর থেকে বাড়িতে টেলিফোন করল। বাড়িতে কৃষ্ণকান্ত নেই, তবে ধ্রুব আছে। সে ধ্রুবর সঙ্গেই কথা বলতে চাইল।
টেলিফোনে ধ্রুব এলে রেমি বলল, একবার এক্ষুনি কেনিলওয়ার্থ হোটেলে আসবে?
কেন?
দরকার আছে।
তুমি ওখানে কী করছ?
এলেই দেখতে পাবে। এসো।
আমরা বউয়ের হুকুমে চলি না, কী হয়েছে বলো।
উঃ, বলছি আমার ভীষণ বিপদ।
কীরকম বিপদ?
এসো না। পায়ে পড়ি। সব কি টেলিফোনে বলা যায়?
আমি কিন্তু মাল খেয়েছি।
তবু এসো। কাউকে বোলো না।
আচ্ছা।
ধ্রুব পনেরো মিনিটের বেশি সময় নিল না আসতে। রিসেপশনে টেলিফোন করে বলে রেখেছিল রেমি। ধ্রুব আসা মাত্রই ওপরে নিয়ে এল বেয়ারা।
কী হয়েছে?
ছন্দা। চিনতে পারছ?–রেমি ছন্দাকে দেখিয়ে বলে।
পারছি। এরকম অবস্থা কেন?
রেমি সংক্ষেপে বলো। জিজ্ঞেস করল, কী করা যায় বলো তো!
সমীর কোথায়?
বাইরে কোথাও আছে।
ধ্রুব গম্ভীর হয়ে চারদিকটা তাকিয়ে দেখল একটু। তারপর এক অদ্ভুত কর্তৃত্বের গলায় ছন্দাকে আদেশ করল, তোমার জিনিস গুছিয়ে নাও। ট্যাকসি দাঁড়িয়ে আছে।
ছন্দা সেই গলার স্বরে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো উঠে পড়ল। বলল, গোছানোই আছে। ওই স্যুটকেসটা।
ধ্রুব সেটা তুলে নিয়ে বলল, এসো। সমীর বোধহয় পালিয়েছে।
তারা তিনজন নিরাপদে নেমে এল নীচে। ট্যাকসিতে উঠল। চলে এল কালীঘাটের বাড়িতে। ছন্দা তেমন গোলমালে পড়েনি। ধ্রুব মাঝখানে পড়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সমীরের কোনও পাত্তা পাওয়া যাচ্ছিল না।
০১৭. তরল মন্তব্য
রঙ্গময়ির আকস্মিক ওই তরল মন্তব্যে এত লজ্জা পেলেন হেমকান্ত যে, রাতে তার ভাল ঘুম হল না। শশিভূষণ এখন হাসপাতালে পুলিশের হেফাজতে, সেই চিন্তাও তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
জীবনটাকে তিনি যতদূর সম্ভব নির্ঝঞ্ঝাট এবং সরল রাখতে চেষ্টা করেছিলেন। তার জন্যই সংসারের সঙ্গে বেশি মাখামাখি করেননি, পুত্রকন্যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হননি, বিষয়ের প্রতি আসক্ত হননি। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটা জীবন যাতে জটিলতা নেই, আবর্ত নেই, অতিশয় শোক বা অত্যধিক আনন্দ নেই। কিন্তু তা পেলেন কই! জীবনের অনেকগুলি কপাট তিনি সভয়ে বন্ধ রেখেছিলেন। সেইসব কপাটের আড়ালে কী আছে তা জানার ইচ্ছাকে পর্যন্ত তিনি সভয়ে এড়িয়ে চলেছেন।
সেইরকম এক বন্ধ কপাট ছিল রঙ্গময়ি। আজ ওপাশ থেকে রঙ্গময়ি সেই কপাটে মৃদুমন্দ করাঘাত করতে শুরু করেছে। যদি অবারিত করে দেন দ্বার তবে হয়তো ভেসে যাবেন।
কাতর এক যন্ত্রণার শব্দ করে হেমকান্ত নিশুত রাতে পাশ ফিরলেন। এই শীতেও লেপের তলাকার উষ্ণতা তাঁর কাছে অসহ্য লাগছিল। উঠে আস্তে আস্তে এসে দাঁড়ালেন উত্তরের জানালার ধারে। জানালা খুলে দিলেন।
আজ কুয়াশা নেই। সামান্য জ্যোৎস্না আছে। গারো পাহাড়ের হিম বাতাস ব্রহ্মপুত্রের জল ছুঁয়ে আরও খরশান হয়ে আসছে। বালাপোশ ভেদ করে হাজারটা তিরের মতো বিদ্ধ করে যাচ্ছে শরীর। কিন্তু হৃদয় যখন উত্তপ্ত তখন বাইরের শীতলতা তেমন অনুভব করা যায় না।
ব্রহ্মপুত্রে সাদা বালির চর জেগে আছে। ওপারে জলা জমিতে মাঝে মাঝে ভূতের লণ্ঠনের মতো জ্বলে উঠছে নীলচে সবুজ শিখা। শুন্যে দোল খেয়ে হঠাৎ নিবে যাচ্ছে আবার। আলেয়া। রাত্রির কোন প্রহর ঘোষণা করছে শেয়ালের পাল? চাঁদের মুখে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে বাদুড়।
এই নিসর্গকে হেমকান্ত বুঝতে পারেন। তার শরীরের সীমায় আবদ্ধ অস্তিত্ব এই রহস্যময় গভীর রাত্রির আলো-আঁধারিতে নিজের দুকুল ছাপিয়ে যেন চারদিকে প্রবাহিত। নিজের মানুষি পরিচয়, নাম, গোত্র সব বিলুপ্ত হয়ে যেতে থাকে। যদি সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র এসব না থাকত তা হলে এই পৃথিবীতে হেমকান্তর মতো মানুষ বড় সুন্দর জীবন যাপন করতে পারত।
ঘড়িতে রাত তিনটে বাজবার সংকেত শুনে সামান্য নড়লেন হেমকান্ত। আজ আর ঘুম আসবে। জীবনের বন্ধ দুয়ারগুলিতে আজ বারবার কে কড়া নাড়ছে! কড়া নাড়ছে রঙ্গময়ি, শশিভূষণ, সচ্চিদানন্দ।
