কমপ্লিমেন্টটা ভাল নয়। কিন্তু আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্টটার কী হবে বলুন।
কেনিলওয়ার্থ হোটেল আমি চিনি। কখন যেতে হবে বলুন।
কাল বিকেল পাঁচটায়। আমি রিসেপশনে থাকব। আপনি কি নিজেদের গাড়িতে আসবেন?
আমাদের গাড়ি তো মোটে একটা। সেটা শ্বশুরমশাই ব্যবহার করেন। আমি যাব ট্যাকসিতে। কেন বলুন তো!
যাক বাঁচা গেল! আমি গাড়িটা অ্যাভয়েড করতে চাইছিলাম।
রেমি সন্দেহের গলায় বলে, এত গোপনীয়তা কীসের বলুন তো!
আপনি কি ভয় পাচ্ছেন বউদি? তেমন কিছু নয়।
ভয় তো আপনিই পাচ্ছেন মনে হচ্ছে।
আমার ভয়ের একটু কারণ আছে। প্লিজ, আমার সঙ্গে ফোনে আপনার কথা হল সেটা কাউকে বলবেন না।
না বললাম।
তা হলে কাল বিকেলে?
আচ্ছা।
পরদিন বিকেলে একটা ট্যাকসি করে যেতে যেতে রেমির মনে হল, আমি কেন যাচ্ছি? এই গোপনীয়তা, এই রহস্য সত্ত্বেও একটা হোটেলে একজন পরপুরুষের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়াটা ঠিক নয়। তবু কেন যাচ্ছি? তার একটু ভয়-ভয় করছিল। আবার আগ্রহও বোধ করছিল সে। তার ঘটনাহীন একঘেয়ে জীবনে একটা কিছু অন্যরকম ঘটুক না একদিন।
হোটেলের রিসেপশনে সমীর অপেক্ষা করছিল। একটু কালো আর রোগা হয়ে গেছে। মুখে উদ্বেগের সুস্পষ্ট চিহ্ন।
বউদি।— বলে এগিয়ে এল সে।
রেমি খুব সেজে এসেছে। বিশুদ্ধ মুগার ওপর রেশমি বুটির দারুণ একখানা শাড়ি পরেছে সে। গায়ে রুপোর গয়নার একটা সেট। খুবই ভাল দেখাচ্ছে তাকে, সে জানে। কিন্তু সমীর তেমন মুগ্ধ হয়ে গেল না তো!
রেমি বলল, কী ব্যাপার বলুন তো!
ঘরে চলুন বলছি।
দোতলায় একটা বেশ কেতাদুরস্ত ঘরে তাকে নিয়ে গেল সমীর। কিন্তু ঘরে ঢুকেই থমকে গেল রেমি।
লন্ডভন্ড একটা মস্ত বিছানায় এলোচুলে, অবিন্যস্ত বদনে পড়ে আছে যে তাকে কষ্ট করে চিনতে হয়। সে ছন্দা। মুখ ফুলে আছে। চোখের কোলে জলের সুপষ্ট দাগ। কাজল আর লিপস্টিক লেপটে আছে মুখময়। এপাশ-ওপাশ করতে করতে এক নাগাড়ে উঃ বাবা উঃ বাবা করে যাচ্ছে ভাঙা রেকর্ডের মতো।
এ কী?–রেমি চেঁচিয়ে ওঠে।
ছন্দা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকে দেখল। তারপর হঠাৎ উঠে বসে কেঁদে ফেলল। আঁচল তুলে মুখে চাপা দিয়ে বলল, আমি পারব না। আমি পারব না।
কী পারবে না? বলে রেমি গিয়ে তাড়াতাড়ি ছন্দার পাশে বসে। তার কাঁধে হাত রেখে বলে, কী হয়েছে ছন্দা? তুমি এখানে কেন?
ছন্দা কাঁদছে। জবাব দেওয়ার মতো অবস্থা নয়।
সমীর একটু অপ্রতিভ মুখে বলল, আমরা একটা কাণ্ড করে ফেলেছি বউদি।
রেমি খানিকটা আন্দাজ করতে পারছিল। হোটেলের ঘরে এভাবে ছন্দা আর সমীর, এর একটাই মানে হয়। তার আজন্ম সংস্কার আর রুচিবোধে এমন অদ্ভুত আর ঘিনঘিনে লাগছিল ব্যাপারটা যে তা বলার নয়।
রেমি বলল, কী কাণ্ড সমীরবাবু? আপনি কি ওকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন?
না। ঠিক তা নয়। ছন্দার কলকাতায় আসার কথা ছিল। আমার সঙ্গেই।
তা হলে?
হোটেলে ওঠার কথা ছিল না।
উঠলেন কেন তবে? ছিঃ ছিঃ।
প্লিজ বউদি, ওরকম করবেন না।
তাতে ও আরও বিগড়ে যাবে।
বিগড়োবারই তো কথা।
দোষটা তো সবটাই আমার নয়। ওরও। ওকেই জিজ্ঞেস করুন। আমি আধ ঘণ্টার জন্য বাইরে যাচ্ছি।
সমীর বাইরে গিয়ে দরজা টেনে দিল।
স্তব্ধ ঘরে ছন্দার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ ক্রমে অসহ্য হয়ে উঠল রেমির কাছে। যান্ত্রিকভাবে সে ছন্দার মাথায় আর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, কেঁদো না, ছন্দা। আমরা তো আছি। ভয় নেই।
ছন্দা মিনিট দশেক বাদে একটু শান্ত হল। মাথা নিচু করে বসে রইল চুপচাপ।
রেমি বলল, কী হয়েছে বলবে তো!
ওর দোষ নেই।
কী হয়েছে খুলে বলো।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছন্দা বলল, আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। সেই বিয়ের বাজার করতেই কলকাতায় আসা। সমীরদা ঠিক রাজি ছিল না। আমিই বললাম, চলো এই সুযোগ আর পাব না। দুজনে হোটেলে এসে উঠলাম।
তারপর?
তারপর থেকেই হঠাৎ কেমন ওলট-পালট লাগছে। মনে হচ্ছে কাজটা ঠিক করিনি।
ঠোঁটকাটা রেমি বলেই ফেলল, কাজটা খুব খারাপ করেছ।
আমারও তাই মনে হচ্ছে। বাবা মা আত্মীয়রা কেউ আর আমার মুখদর্শন করবে না। আমি সেটা সহ্য করতে পারব না।
রেমি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, তোমরা কতদুর এগিয়েছিলে? এক ঘরে রাত কাটানো, এক বিছানায়…
আঃ, চুপ করে রেমি। আমার গা জ্বালা করছে। বোলো না। সবকিছুই হয়েছে। তবু আমি এসব থেকে আবার ফিরে যেতে চাই।
অত অস্থির হচ্ছ কেন? লোক জানাজানি তো হয়নি।
হয়েছে কি না জানি না। তবে আমাদের সল্ট লেকের বাড়িতে ওঠার কথা। সেখানে আমার এক বিধবা পিসি থাকে। বাবা নিশ্চয়ই টেলিফোনে খবর নিয়েছে।
রেমি কয়েক মুহূর্ত ভাবল। তারপর বলল, দাঁড়াও। আমি ব্যবস্থা করছি। কিন্তু সমীরবাবুকে বোঝনোর দায়িত্ব তোমার।
আমি কাউকে বোঝনোর দায়িত্ব নিতে পারব না। মাথা পাগল-পাগল লাগছে।
এত প্রেম হঠাৎ নিবে গেল কেন তা বুঝতে পারছিল না রেমি। তবে তার মনে হচ্ছিল, ছন্দার এসব অনুভূতি সত্য ও সঠিক।
সে দরজা খুলে বাইরে বেরোল। সমীর দাঁড়িয়ে আছে করিডরে। মুখচোখ অপ্রসন্ন।
রেমি তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, কী করতে চান?
সমীরের চোখ জ্বলে উঠল হঠাৎ। বলল, ও এখন ন্যাকা সাজছে।
তার মানে?
তার মানে ও কি আপনাকে কিছু বলেনি?
একটু বলেছে।
আমার সমস্ত কেরিয়ার নষ্ট হয়ে গেল। কাকা এই ঘটনার পর অবশ্যই আমাকে আর প্রশ্রয় দেবে না। কিন্তু সে প্রবলেম ছন্দার নেই।
প্রবলেম আপনাদের দুজনেরই।
না। কাকা ছন্দাকে ফিরিয়ে নেবে। কদিন বাদে ওর বিয়ে হয়ে যাবে। মুশকিলে পড়ব আমি। অথচ আমি দুম করে রিস্কটা নিতে চাইনি।
