অসুখটাকে ফাঁপিয়ে ফুপিয়ে রটনা করেছিল বটে, কিন্তু শেষরক্ষা হল না।
হেমকান্ত কাছারির খাটেই স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাথার ওপর মশার পাল উড়ছে উমমম একটা একটানা শব্দ করে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ব্রহ্মপুত্রের জলে মিশে যাচ্ছে গারো পাহাড়ের মহিষপ্রতিম ছায়া।
একটা ঘোড়ার গাড়ি এসে থামল। সরকারি ডাক্তার তাড়াতাড়ি নেমে এলেন। কাছারির বারান্দায় চিত্ৰাপিতের মতো-কর্মচারীরা দাঁড়িয়ে আছে। হেমকান্ত তাদের দিকে একটু ইশারা করে মুখ ফিরিয়ে কুঞ্জবনের দিকে এগোতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ ভূতের মতো বসে রইলেন ভাঙা গাড়ির পাদানিতে। অন্ধকার তাকে ঘেঁকে ধরল। হেঁকে ধরল মশা। শিশিরে ভিজতে লাগল পোশাক। জোনাকি পোকারা উড়তে লাগল চারদিকে পরির চোখের মতো। কিছুই তেমন ভাবতে পারছেন না হেমকান্ত। মাথাটা অস্থির, এলোমেলো।
তীব্র একটা টর্চের আলো সেই একাকিত্ব আর প্রস্তরীভূত অন্ধকারকে ছুরির ফলার মতো কেটে পায়ের কাছে এসে পড়ল।
আর্তনাদের মতো গলায় রঙ্গময়ি বলল, ওকে নিয়ে গেল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেমকান্ত বললেন, তুমি বড় বোকা, মনু। অথচ তোমাকে আমি বরাবর বুদ্ধিমতী ভাবতাম।
টর্চটা নিবিয়ে রঙ্গময়ি কাছে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ আবার শান্ত শোনাল তার গলা, ঘরে যাও। ঠান্ডা লাগবে।
লাগুক। সেটা বড় কথা নয়। শশীর ফাঁসি হবে, তার কথা ভাবো।
আমাকে সকলের কথাই ভাবতে হয়। ওঠো। ঘরে চলো।
ঘর ভাল লাগছে না।
রঙ্গময়ি একটু চুপ করে থেকে বলল, শশী তো মরতেই চায়। বেঁচে থেকে আর কী করবে বলো? ওকে মরতে দাও।
আর আমি মরলে?
তুমি? মরলে এখনও যে একজনকে বিধবা হতে হয়। তার বড় জ্বালা।
০১৬. অচেনা গলা
রেমি এক সকালে টেলিফোন পেল। অচেনা গলা।
বউদি, বলুন তো আমি কে?
রেমি ভ্রু কুঁচকে বলল, কী করে বলব?
গলাটা চেনা লাগছে না?
টেলিফোনে গলা বোঝা যায় না।
এবার ওপাশ থেকে অচেনা কণ্ঠ বলল, কিন্তু ভয় হচ্ছে, পরিচয় দিলেও কি চিনতে পারবেন।
চেষ্টা করে দেখতে পারেন। আমার স্মৃতিশক্তি খারাপ নয়।
আমি সমীর। মনে পড়ছে?
রেমি আবার ভ্রু কোঁচকায়। মনে তার পড়েছে ঠিকই, কিন্তু খুশি হয়নি। এমনিতে সমীরকে তার খাবাপ লাগেনি। বরং বেশিই ভাল লেগে গিয়েছিল। কিন্তু ছন্দার সঙ্গে সম্পর্কটার কথা টের পাওয়ার পর থেকেই মনটা কিছু বিরূপ হয়েছে।
রেমি বলল, কী খবর! কবে এলেন?
আমি প্রায়ই আসি। গত মাসেও এসে গেছি।
কই, যোগাযোগ করেননি তো!
সময় পাইনি। কলকাতায় আসি হাজারটা কাজ নিয়ে।
তাই বুঝি!
আপনি এখনও ছন্দা আর নন্দা কেমন আছে সেটুকুও জানতে চাননি।
রেমি ঠোঁট কামড়ায়। কথাটা মিথ্যেও নয়। শিলিগুড়িতে গিয়ে ওদের কত সহজে আপন করে নিয়েছিল, অথচ আজকাল মনেই পড়ে না। সে লজ্জা পেয়ে বলল, ওদের চিঠি দেব-দেব করছিলাম। আমারও হাজারটা ঝামেলায় সময় হচ্ছে না।
সময়ের অভাব হতেই পারে। মন্ত্রীর পুত্রবধূ।
যাঃ, শ্বশুর মন্ত্রী তো আমার কী?
মন্ত্রীর বাড়ির বেড়ালটাও পায়াভারী হয়।
পায়ারী তো আপনিই, কলকাতায় এসেও খবর নেন না।
নিই না ভয়ে। ভি আই পি লোক, পাত্তা দেন কি না দেন তার তত ঠিক নেই। টেলিফোনে গলা শুনেই তো বুঝতে পারছি খুব খুশি হননি।
বাড়িতে এসে দেখুন পাত্তা দিই কি না!
সমীর ক্ষণকাল চুপ করে থেকে বলল, বাড়িতে যাব না, তবে আপনার সঙ্গে আমার একটা দরকার আছে বউদি।
রেমি ঠোঁট কামড়ে বলল, আচ্ছা, আপনি আমাকে তখন থেকে বউদি-বউদি করে যাচ্ছেন কেন বলুন তো! দার্জিলিং-এ তো দিব্যি নাম ধরে ডাকছিলেন!
ডেকেছিলাম নাকি?
কেন, মনে নেই?
সমীর হেসে বলে, আছে। কিন্তু তখন হয়তো নানা ঘটনায় লঘু-গুরু জ্ঞান নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
জ্ঞানের নাড়ি তো বেশ টনটনে দেখছি। কী দরকার বলুন তো!
আছে। আজ বা কাল আপনার একটু সময় হবে?
কখন?
বিকেলের দিকে!
হতে পারে।
আমি নিউ কেনিলওয়ার্থ হোটেলে উঠেছি। জায়গাটা চেনেন?
চিনি। কেন?
আসতে পারবেন একা?
একা!
হ্যাঁ বউদি, কাউকে না জানিয়ে আসবেন।
রেমি একটু ইতস্তত করে বলল, এ বাড়ির মেয়ে-বউরা হুটহাট বেরোতে পারে না। শ্বশুরমশাই পছন্দ করেন না ওসব।
আমার দরকারটা খুব জরুরি।
আপনি তো এ বাড়িতেই আসতে পারেন।
না। পারি না।
কেন বলুন তো!
সমীর একটু চুপ থেকে বলল, আপনি আপনার শ্বশুরকে কতটা চেনেন জানি না। উনি কিন্তু ভীষণ ডেঞ্জারাস টাইপের লোক।
তাই নাকি? উনি কি আপনার ওপর চটে আছেন?
ঘটনাটা আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন!
কোন ঘটনা?
দার্জিলিং-এ আপনি একবার উত্তেজনার বশে আমাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মনে আছে?
রেমি লজ্জা পেয়ে বলে, ধরেছিলাম নাকি?
ধরেছিলেন। এবং সেটা দেখতে পেয়েছিল লামা। তাকে ভোলেননি নিশ্চয়!
না, ভুলিনি।
আমি তখনই বলেছিলাম লামা ব্যাপারটা আপনার শ্বশুরকে রিপোর্ট করতে পারে।
হ্যাঁ, বলেছিলেন। লামা কি রিপোর্ট করেছে?
করেছে। কাকা একদিন আমাকে ডেকে কয়েকটা অপ্রিয় প্রশ্নও করেন। কৃষ্ণকান্তবাবু ব্যাপারটা ওঁকে জানিয়েছেন।
তাই আপনি এ বাড়িতে আসতে ভয় পাচ্ছেন?
ঠিক ভয় নয়। সংকোচ। কৃষ্ণকান্তবাবু হয়তো আমাকে খুব সুনজরে দেখবেন না।
রেমি একটু রাগের গলায় বলল, ওটা তো কাপুরুষতা। আপনি না এলেই বরং সন্দেহটা বাড়বে।
তা নয়। আমি তো কৃষ্ণকান্তবাবুর বাড়িতে বড় একটা যাই না। কাজেই এখন না গেলেও সন্দেহের কারণ নেই। গেলে বরং সন্দেহটাকে আরও খামোক খুঁচিয়ে তোলা হবে।
আপনি খুব হিসেবি লোক।
