হেমকান্ত বিরক্ত হলেন। একটু উদ্বেগও বোধ করতে লাগলেন। দারোগার আগমন কেন তা অনুমান করতে কষ্ট নেই। শশিভূষণ।
দারোগা রামকান্ত রায়ের সঙ্গে হেমকান্তর পরিচয় সামান্য। শুনেছেন লোকটা দুদে এবং প্রভুভক্ত।
হেমকান্ত কাছারিঘরে ঢুকতেই রামকান্ত তাঁর হ্যাটটা বগলে করে উঠে দাঁড়ালেন। বিশাল ভুঁড়িদার চেহারা। কাছারির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা তার ঘোড়াটিও বিশালদেহী এবং তেজি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ঠুকে নালের বিকট শব্দ করছে।
রামকান্ত বললেন, একটু বিরক্ত করতে এলাম, হেমবাবু। সরকারি কাজ।
বসুন।
রামকান্ত বললেন, বসা-টসা পরে। অনেকক্ষণ বসে আছি। একবার সেই ছেলেটিকে দেখতে চাই।
হেমকান্ত ন্যাকা নন। বুঝলেন। তবু একটু বিস্ময়ের ভান করে বললেন, কোন ছেলেটি?
শশিভূষণ। যে ছেলেটিকে বরিশালের পুলিশ খুঁজছে। খুনের মামলা।
হেমকান্তর উপস্থিত বুদ্ধি ভাল খেলে না। তিনি কী করবেন বুঝতে পারলেন না। শেষে হতাশার গলায় বললেন, তাকে আর দেখার কিছু নেই। ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছে।
তা জানি। তবু সরকারি কর্তব্য তো করতেই হবে। জানা দরকার এই ছেলেটিই সে কি না।
হলে কী করবেন?
রিমুভ করার মতো অবস্থা দেখলে পুলিশ গার্ডে হাসপাতালে ট্রান্সফার করতে হবে।
হেমকান্ত মৃদু স্বরে বললেন, বোধহয় তা সম্ভব নয়।
দেখা যাক। একটু অধৈর্যের ভাব প্রকাশ করলেন রামকান্ত। বললেন, আপনার বাড়ি সার্চ করার ওয়ারেন্ট আমার সঙ্গেই আছে। তবু আমি তা করিনি। আপনি মান্যগণ্য লোক, যা করার, আপনার অনুমতি নিয়েই করতে চাই।
হেমকান্ত বললেন, চলুন।
দীর্ঘ বারান্দা দিয়ে রামকান্তকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে আজ নিজের ওপর একটু ঘৃণা হচ্ছিল হেমকান্তর। চিরকাল সুখের জীবনই কাটিয়েছেন তিনি। নির্বিকার, আত্মসুখী। নিজস্ব জগতেই তার বাস। বাইরে একটা অচেনা পৃথিবী আছে। সেখানে আছে অচেনা, অদ্ভুত চরিত্রের কিছু লোকজন। তাদের ভাল চেনেন না তিনি। এই শশিভূষণ সেই বাইরের দুনিয়ার লোক। কীই বা বয়স, তবু স্নেহের বন্ধন কেটে উধাও, বেরিয়ে পড়েছে। খুনও করেছে হয়তো। কাজটা ভাল না মন্দ তার বিচার ইতিহাস করবে। কিন্তু নিজের অস্তিত্বের একটা জানান তো দিতে পেরেছে। হেমকান্ত তা পেরে ওঠেননি।
বিছানায় শশিভূষণ শয়ান। অচৈতন্য। গালে এ কয়দিনে দাড়ি আরও কিছু বেড়েছে। শরীরটা বড়ই বিবর্ণ, শীর্ণ। মাথায় জলপটি দিচ্ছিল রঙ্গময়ি। তাঁদের দেখে উঠে দাঁড়াল।
রামকান্ত শশিভূষণের দিকে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে বললেন, আপনি রুগির কেউ হন?
না। দেখাশোনা করছি।
অবস্থা কেমন?
ভাল নয়।
একটু বাদে হাসপাতালের ডাক্তার এসে ওকে দেখবে। দুজন পুলিশ গার্ড থাকবে বাইরে।
রঙ্গময়ি একটু ক্লান্ত ও কটু গলায় বলল, রুগি কি পালাবে?
তা হয়তো নয়। তবু সাবধান হওয়া ভাল।
ডাক্তার বলে গেছে, রুগি বেশিক্ষণ নয়।
কোন ডাক্তার দেখছে?
তিনজন দেখছে।
তাদের স্টেটমেন্টও আমরা নেব। রুগির অবস্থা যদি সত্যিই খারাপ হয়ে থাকে তবে তার জন্য আপনারা কষ্ট পাবেন কেন? সরকারই ওর ভার নেবে।
সরকার ভার নেবে কেন?
শশিভূষণ সাসপেক্ট।
ক্লান্ত রঙ্গময়ি চুপ করে রইল।
হেমকান্ত মৃদুস্বরে জিজ্ঞাস করলেন, এই কি সেই?
রামকান্ত গম্ভীর গলায় বললেন, হ্যাঁ।
হেমকান্ত একটা শ্বাস গোপন করলেন।
রামকান্ত বারান্দায় বেরিয়ে এসে বললেন, কীভাবে ছেলেটি আপনার বাড়িতে আশ্রয় পেল সে সম্পর্কে আপনি একটা স্টেটমেন্ট লিখে রাখবেন। দরকার হবে।
আমার স্টেটমেন্ট? কেন?
যাতে আপনাকে ঝামেলায় পড়তে না হয়।
দারোগা রামকান্ত বারবাড়িতে এসে দুজন সিপাইকে ইশারা করতেই তারা শশিভূষণের ঘরে থানা গাড়তে রওনা হয়ে গেল। রামকান্ত ঘোড়ায় ওঠার আগে হেমকান্তর দিকে চেয়ে বললেন, শশিভূষণের অবস্থা আমার কাছে খুব খারাপ বলে মনে হল না।
বলেন কী?–হেমকান্ত হতভম্ব হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ডাক্তারও যে জবাব দিয়ে গেছে!
সে তো শুনলাম। কিন্তু মুমূর্ষ রুগি আমি কিন্তু কম দেখিনি।
আমরা কি মিথ্যে বলছি?–হেমকান্ত একটু রুষ্ট হয়ে বললেন।
তা বলিনি। এমনও হতে পারে ডাক্তাররা ঠিক বলছে না। সে যাই হোক, হাসপাতালের ডাক্তার এসে দেখলেই সব বোঝা যাবে। আমাদের এই কাজই করতে হয় হেমবাবু, মনটাও তাই কেমন সন্দেহপ্রবণ হয়ে গেছে। কিন্তু মনে করবেন না। আচ্ছা ওই মহিলাটি কে? আপনার আত্মীয়া?
হ্যাঁ। ছেলেবেলা থেকেই এ বাড়িতে আছে।
ওঁকে আমার কয়েকটা প্রশ্ন করার আছে, আপনি অনুমতি দিলে। তবে সে পরে হলেও হবে।
হেমকান্তর কেমন বিভ্রান্ত লাগছিল। তার সুরুচি ও সূক্ষ্ম অনুভূতির জীবনে এ যেন এক দৈত্যের হাত এসে মসিলেপন করতে লেগেছে। এ সব ওই বাইরের জগৎটা থেকে এসে হানা দেয়।
রামকান্ত রেকাবে পা রেখে ঘোড়ায় উঠলেন। তার দেহের ভারে ঘোড়াটা কেতরে গিয়ে আবার সোজা হল। রামকান্ত বললেন, স্টেটমেন্টটার কথা কিন্তু ভুলবেন না। দরকার মনে করলে আপনার
উকিলকে ডাকিয়ে তার পরামর্শ মতো লিখবেন। ফাঁকফোকর রাখবেন না।
রামকান্ত ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। সেই অশ্বক্ষুরধ্বনি একটা বিপদ-সংকেতের মতো বাজতে লাগল। ওঁর কথাগুলির মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন হুমকি ছিল তাও টের পাচ্ছিলেন হেমকান্ত। কিন্তু কী করবেন? বরাবরই তিনি খানিকটা অসহায়। আজ আরও বেশি অসহায় লাগছিল। না, নিজের বিপদের কথা ভেবে নয়। আজ তিনি শশিভূষণের বিপদের কথা ভাবছিলেন? বোকা রঙ্গময়ি ওর
