দুদিকে দুটি প্রকাণ্ড খাট। জানালা ঘেঁষে মস্ত ডেস্ক। তার ওপর সাজানো বইখাতা, দোয়াতদান ও কলম। একটি বিলিতি মহার্ঘ টেবিল ল্যাম্প। দুই খাটের পাশেই শ্বেতপাথরের তেপায়া। দেয়াল আলমারি, আয়না বসানো বার্মা সেগুনের আলমারি, কাচের বাক্সে সাজানো বিদেশি পুতুল আর খেলনা। দেয়ালে এয়ারগান।
চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন হেমকান্ত। এ ঘরে তিনি কদাচিৎ আসেন।
মেয়ের দিকে একটু সন্ধানী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন তিনি। লোকচরিত্র অনুধাবনের অভ্যাস তাঁর নেই। মুখশ্রী দেখে চরিত্রের ঠিকানা পাওয়া তার পক্ষে কঠিন। কিন্তু তার মেয়েটি যে ভারী শ্রীময়ি তাতে সন্দেহ নেই। তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, বুক ঠান্ডা হয়।
কিন্তু মানুষের মুখশ্রীকে কি বিশ্বাস আছে? তার অন্য মেয়েরাও সুন্দরী। অপাপবিদ্ধ মুখশ্রী। কিন্তু তবু গোপনে মায়ের গয়না সরাতে তো তাদের বাধেনি। বিশাখা যে অন্যরকম হবে তা মনে করার কোনও কারণ নেই।
হেমকান্ত মেয়ের দিকে চেয়ে সকৌতুকে প্রশ্ন করলেন, তুমি স্বদেশিদের পছন্দ করো না?
বিশাখা খুবই ঘাবড়ে গেছে। কী বলবে বুঝতে না পেরে হঠাৎ মাথা নত করে নখ দেখতে লাগল। ব্রীড়ার সেই ভঙ্গিটুকুও ভারী অপরূপ।
মেয়েকে আর অস্বস্তির মধ্যে ফেলতে ইচ্ছে হল না তার। মেয়েমাত্রই কিছুটা নির্বোধ, কুচুটে, পরশ্রীকাতর, ঈর্ষাপরায়ণ। তাদের দোষও নেই। মেয়েদের ব্যক্তিত্ব গঠনে কোনও চেষ্টাও যে সমাজে নেই। দেশে সম্প্রতি একটা নারীমুক্তি আন্দোলন শুরু হয়েছে। সেটা ভাল কি মন্দ এবং কাজ কতদূর এগিয়েছে তা হেমকান্ত জানেন না। তবে তার বিশ্বাস স্ত্রীলোকদের উচ্চশিক্ষা দিয়ে কোনও লাভ নেই। তাদের মনের জানালাকপাট খুলে বাইরের উদার মুক্ত আলো-হাওয়ার পথটুকু অবারিত করে দিলেই যথেষ্ট। সি এ টি ক্যাট শেখার চেয়ে থানকুনিপাতার আরোগ্য গুণ জানাটা অনেক বেশি কার্যকরী শিক্ষা। লোকে বলে, এদেশের মেয়েরা ভারী সহনশীলা। কথাটা সত্যি বলে মনে হয় না হেমকান্তর। সহনশীলতা এক অনবদ্য গুণ, তা শিক্ষা করতে হয়। এদেশের মেয়েরা সয়। বটে, কিন্তু সে দায়ে পড়ে। ভিতরে ভিতরে বিদ্রোহের আগুন ফুঁসতে থাকে, আর সে আগুন বেরোবার পথ পায় না বলেই অন্যবিধ রন্ধ্র খোঁজে। হেমকান্ত আজ একটু একটু টের পান, সুনয়নীর মধ্যেও সেই বিদ্রোহ ছিল। তাই আজ মেয়ের ওপর রাগ হল না হেমকান্তর। করুণা হল। ওকে তিনি কোনও শিক্ষাই দিতে পারেননি। শুধু জন্মসূত্রে পাওয়া সুন্দর মুখশ্রী ও ফরসা রংটুকুই ওর সম্বল।
বোধহয়! হ্যাঁ, বোধহয় কথাটা যোগ করে রাখা ভাল। কারণ বিশাখা তাঁর উরসজাত হলেও ওকে তো তিনি ভাল করে চেনেন না। সম্ভবত বিশাখা রঙ্গময়িকে অপছন্দ করে। আর তাই রঙ্গময়ির ঝোক যেদিকে, বিশাখার ঝোঁক ঠিক তার উলটোদিকে। নইলে স্বদেশির প্রতি অত আক্রোশ থাকার কথা ওর না। কিন্তু রঙ্গময়ির প্রতি ওর বিরাগের কারণটা কী? কারণ কি তিনি নিজেই?
ছেলের দিকে চেয়ে হেমকান্ত একটু স্বস্তি পেলেন। কৃষ্ণ তাঁকে দেখে তটস্থ বটে, কিন্তু ভীত নয়।
হেমকান্ত গাঢ়স্বরে প্রশ্ন করলেন, স্বদেশিদের তুমি পছন্দ করো?
কৃষ্ণ একটু ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
হেমকান্ত বললেন, তুমি তোমার দিদির কাছে যা শুনেছ তা ঠিক নয়। আমি শশিভূষণকে ধরিয়ে দেব না। স্বদেশিদের প্রতিও আমার আক্রোশ নেই। ভয় পেয়ো না। বলো।
কৃষ্ণকান্ত হেসে মাথা নোয়াল। বলল, হ্যাঁ বাবা। ওরা খুব সাহসী।
হেমকান্ত কেমন যেন একটু নিশ্চিন্ত বোধ করলেন। তাঁর আর কোনও ছেলেই স্বদেশিদের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। দেশে যেসব আন্দোলন হচ্ছে সে সম্পর্কে তারা নির্বিকার। তিনি নিজেও তাই। তার এই ছেলেটি যদি স্বদেশ নিয়ে ভাবে তো ভাবুক।
হেমকান্ত বললেন, তোমার কাকা স্বদেশি করতেন। অবশ্য শশিভূষণের মতো ইংরেজ মারেনি। জানো বোধহয়?
জানি। কাকাকে ইংরেজরা মেরেছিল।
বিস্মিত হেমকান্ত বললেন, একথা কে বলল?
মনুপিসি।
কথাটা সম্ভবত সত্য নয়। তবু প্রতিবাদ করলেন না হেমকান্ত। শুধু বললেন, হতে পারে। তবে কে মেরেছিল বা আদৌ মেরেছিল কি না তা এখনও আমরা সঠিক জানি না। একটা নৌকাড়ুবি ঘটেছিল, এটাই জানা আছে।
মনুপিসি বলে, কাকাকে মারার পর প্রমাণ লোপ করতে নৌকোটা ড়ুবিয়ে দেওয়া হয়।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এ ছেলের মনের মধ্যে কিছু জিনিস শিকড় গেড়ে বসেছে। তা সহজে ওপড়ানো যাবে না। বোধহয় বীজটা ছড়াচ্ছে মনুই। তবু অসন্তুষ্ট হলেন না হেমকান্ত। আকস্মিক এক দুর্বলতাবশে ছেলের মাথায় একবার হাত রাখলেন। স্নেহের স্বরে বললেন, পড়াশোনা হচ্ছে তো ঠিকমতো?
আমি ফার্স্ট হই বাবা।
হও?–হেমকান্ত বিস্মিত। বলেন, কই, আমাকে কেউ বলেনি তো! এবার বাৎসরিক পরীক্ষায় হয়েছি। বলোনি কেন? দিদি জানে।
হেমকান্ত হাসলেন। ছেলের পরীক্ষার ফলটুকু পর্যন্ত তার কানে কেউ পৌঁছে দেয় না। নির্বাসা কি একেই বলে না? এই নির্বাসন দণ্ডের দাতা তিনিই, গ্রহীতাও তিনিই।
কিন্তু আর নয়। বাইরে রোদ ম্লান হয়ে এল। একটু বাদেই কুঞ্জবনে এক অদ্ভুত ছায়া নামবে। ফার্ন জাতীয় গাছগুলির ছায়া আলপনার মতো পড়ে থাকবে ঘাসে। ভাঙা গাড়িটার পাদানিতে বসে চারদিকে এক নিবিড় রূপের রাজ্যে ড়ুবে যাবেন তিনি। সময় নেই।
হেমকান্ত ঘরে এসে পোশাক পরতে লাগলেন।
কিন্তু বাধা এল। একজন কর্মচারী এসে খবর দিয়ে গেল, স্বয়ং দাবোগা কাছারিঘরে অপেক্ষা করছেন। হেমকান্তর দর্শনপ্রার্থী।
