শব্দের কি কোনও আকার আছে? প্রশ্নটা মাথায় আসে, কিন্তু জবাবটা ভেবে পান না হেমকান্ত। শব্দ সম্ভবত নিরাকার। তবু হেমকান্তর মন বলে, ওই পায়রার বুকুম বুকুম শব্দ, ওর আকার গোল। তুলোর বলের মতো। স্টিমারের বাঁশির শব্দকে কি কখনও তার সরু ও দীর্ঘ আকারবিশিষ্ট বলে মনে হয়নি? সেতারের ঝনৎকার যেন ফুলঝুরির বহুবর্ণ কেন্দ্রাতিগ অগ্নিবিন্দু। মাঝে মাঝে এই দুপুরবেলা তার এসরাজ নিয়ে বসতে ইচ্ছা করে। কিন্তু বসেন না। লজ্জা করে। এসরাজের শব্দ শুনলে ছেলে মেয়ে অবাক হবে। হয়তো দৌড়ে আসবে মনু। লোকটার হল কী? কিন্তু এসরাজের ছড় টানলেই তার চোখে ভেসে ওঠে তন্তুজালের মতো একটা আকৃতি। অদৃশ্য এক মাকড়সা অদ্ভুত দ্রুততায় বুনে চলেছে। জ্যোৎস্নারাত্রে বিরহী হরিপদ মাঝে মাঝে পুকুরের ঘাটলায় বসে আড়বাঁশি বাজায়। তখন দিঘল চিত্রময় এক সাপের আকার খেলা করে হেমকান্তর চোখের সামনে। এসবই ভ্রম হয়তো। শব্দের বাস্তবিক কোনও আকার নেই। কিন্তু হেমকান্তর ভিতরে তারা আকার পায়।
পায়রা গদগদ স্বরে কী বলে? ভালবাসার কথা? কিন্তু পশুপাখির আত্মজন নেই, সংসার নেই। নিতান্ত সংস্কারবশে তারা কখনও কখনও দলবদ্ধভাবে বাস করে বটে, কিন্তু সমাজ গড়তে জানে না। ভালবাসা তারা কোথায় পায়? তুলোর বলের মতো অবিরল তাদের বুকুম বুকুম ডাক এই নির্জন দুপুরে হেমকান্তর চারদিকে নেমে আসে। উড়ে উড়ে বেড়ায়। ভালবাসার কথা বলে।
দক্ষিণের সূর্য একফালি সাদা কার্পেট বিছিয়ে দেয় বারান্দায়। তাতে রেলিং-এর নকশাদার পুষ্পিত ছায়া। ভারী ভাল লাগে হেমকান্তর। ঘুলঘুলির রঙিন কাচ দিয়ে রঙের বিচ্ছুরণ ঘটে যায় দেয়ালে। পায়রার ময়ূরকণ্ঠী গায়ে খেলা করে রোদের বর্ণালি। চিকের ভিতর দিয়ে চেয়ে দেখেন, শতভাগে ভাগ হয়ে গেছে বাইরের দৃশ্যাবলী। কী চমৎকার!
এইসব শব্দ ও দৃশ্য, তুচ্ছাতিতুচ্ছ সব ঘটনা হেমকান্তকে বার বার অবাক করে দেয়। বেঁচে থাকতে আজকাল তার দ্বিগুণ ভাল লাগে কেন? এই আলো ও ছায়া, এইসব অর্থহীন শব্দ, এসব মৃত্যুর পর কি পৌঁছাবে তার কাছে কোনওদিন? কে জানে কেমন সেই চির প্রদোষের জগৎ! কিংবা কে জানে মৃত্যুর পর হয়তো কোনও অস্তিত্বই থাকে না কারও। সে এক স্বপ্নহীন অনস্তিত্বের অন্তহীন ঘুম।
কখন নিজের অজান্তে চলে আসেন দোতলার বারান্দা ঘুরে ছেলেমেয়েদের মহলে। এমনিতে আসেন না। স্নেহশীলা দাসী ও বিশ্বাসী যত্নশীল চাকরদের পরিচর্যায় ছেলেমেয়েরা ভালই আছে, তিনি জানেন। নিজের উপস্থিতির গুরুভার কখনও ওদের ওপর চাপিয়ে দিতে তার ইচ্ছে হয় না।
একটু চমকে উঠে শোনেন, কৃষ্ণকান্ত বিশাখাকে বলছে, দেখ দিদি, আজ যদি দুপুরে ঘুমোই তো গোরু খাই।
গোরুই তো খাস। কালও ঘুমিয়েছিস। টাস্ক করেছিলি মাস্টারমশাইয়ের?
কাল? ওঃ, রাত জাগতে হয়েছিল না?
তোকে কে রাত জাগতে বলেছে?
কে আবার বলবে?
তবে জাগিস কেন?
মনুপিসি যে বলে শশীদা বাঁচবে না!
তাতে তোর কী?
আমি সেইজন্যই তো বসে থাকি।
কেন বসে থাকিস?
কম্পাউন্ডার কাকা বলে, মরার সময় আত্মাটা শরীরের কোন ফুটো দিয়ে বেরোবে তার ঠিক নেই। কারও নাক দিয়ে, কারও কান দিয়ে, কারও মুখ দিয়ে, কারও নাভি দিয়ে, আবার গুহ্যদ্বার দিয়েও বেরোয়।
কী অসভ্য রে! ছিঃ ছিঃ ভাই! দাঁড়া, মনুপিসিকে বলব।
বাঃ, কম্পাউন্ডার কাকা বলে যে আত্মাটা ধোঁয়ার মতো জিনিস। এক বিঘত লম্বা। সুট করে বেরিয়ে আসে। আমি সেইটে দেখার জন্য বসে থাকি। শশীদার আত্মা কোথা দিয়ে বেরোবে জানিস?
আমি জানব কী করে?
ব্ৰহ্মরন্ধ্র দিয়ে। মহাপুরুষের আত্মা ব্রহ্মরন্ধ্র দিয়ে বেরোয়।
তোর শশীদা কি মহাপুরুষ নাকি?
শশীদা স্বদেশি না।
তাতে কী?
স্বদেশিরা তো আর যা তা লোক নয়। ইংরেজ মাবে। শশীদা এক পাদ্রিকে মেরেছে জানিস? বোমা দিয়ে।
খুব বীরত্বের কাজ করেছে, না? বাবা শুনলে দেবেখন তোমাকে। স্বদেশিদের ছায়া পর্যন্ত মাড়াতে নেই।
কৃষ্ণকান্ত একটু যেন অবাক হয়ে বলে, বাবা স্বদেশিদের পছন্দ করে না?
একদম না। আমরা ইংরেজদের পক্ষে।
তবে বাবা শশীদাকে বাড়িতে থাকতে দিল কেন?
মোটেই থাকতে দেয়নি। আটক রেখেছিল। পুলিশে ধরিয়ে দেবে বলে।
তবে এখনও দেয়নি কেন?
লোকটার অসুখ করল বলে।
যদি শশীদা সেরে যায় তা হলে দেবে?
নিশ্চয়ই দেবে। দেওয়াই উচিত।
কৃষ্ণকান্ত একটু চুপ করে থেকে বলল, তা হলে শশীদার মরাই ভাল।
হেমকান্ত খুবই অবাক হলেন। তাঁকে ইংরেজের সমর্থক ও স্বদেশিদের বিরোধী বলে কবে চিহ্নিত করা হল এবং কেন, তা তিনি জানেন না। একটু কৌতুক বোধ করলেন তিনি। শশিভূষণকে ধরিয়ে দেবেন বলে আটক রাখা হয়েছে একথাই বা কে রটাল? বিশাখাই বা এসব কথা জানল কোথা থেকে? তিনি তো মেয়েকে এসব প্রসঙ্গে কখনও কিছু বলেননি। স্বদেশিদের প্রতি বিশাখার এই জাতক্রোধের কারণটাও তাঁর অজানা। বরং উলটোটাই হওয়া উচিত ছিল। রঙ্গময়ির শাসনে এবং ছায়ায় ওরা মানুষ। রঙ্গময়ির নিজের একটু স্বদেশিপ্রীতি আছে। কাজেই বিশাখার এরকম উলটো মত হওয়ার কারণ নেই। তবে?
অনুচ্চ স্বরে তিনি ডাকলেন, কৃষ্ণ। বিশাখা।
ভাইবোনের ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল হঠাৎ।
হেমকান্ত ঘরে ঢুকলেন।
কৃষ্ণ ও বিশাখা উঠে দাঁড়ায়। তটস্থ, সন্ত্রস্থ। মুখচোখে বিহ্বল ভাব। হেমকান্তর সামনে ওদের কেন যে এরকম একটা রূপান্তর হয়! তিনি তো শাসন তর্জন করেন না কখনও।
