কোন কথাটা?
এই যে বললে পলিটিকস্ করতে গেলে অমন একটু-আধটু করতে হয়।
হয়ই তো।
আমি তো সেটা মেনেই নিয়েছি। কথাটা খুবই সত্যি। এদেশে পলিটিকস মানেই ওইসব। মিথ্যে কথা, ফেরেববাজি, ধাপ্পা এবং কেরিয়ার। চলো, কাল তোমাকে বিধানসভায় নিয়ে যাব। একটু দেখে আসবে, শ্রদ্ধেয় এম এল এ আর মন্ত্রীরা সেখানে বসে কেমন খেয়োখেয়ি করেন।
আমার দেখে দরকার নেই।
দরকার আছে। তোমার শ্বশুর কীরকম দেখোদ্ধার করছেন তার একটা আঁচ পাওয়া তোমার দরকার।
আমার চোখে শ্বশুরমশাইকে ছোট করে দিয়ে তোমার কী লাভ?
ধ্রুব গভীর এক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে স্নেহভরে বলল, তুমি কি বিশ্বাস করো কৃষ্ণকান্তকে কালিমালেপন করায় আমার খুব সুখ?
রেমি ধ্রুবর খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বলল, তবে সব সময় ওঁর সম্পর্কে ওরকম বলো কেন?
লাভ-হেট রিলেশন কাকে বলে জানো?
কথাটা শুনেছি। মানে জানি না।
মানে আমিও ভাল জানতাম না। কিন্তু কৃষ্ণকান্তর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা এখন বোধহয় ওই লাভ-হেট।
তার মানে?
আমি যখন কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীকে বাবা বলে ভাববার চেষ্টা করি তখন কিছুতেই মন্ত্রী কৃষ্ণকান্তর ছবি চোখের সামনে আসে না।
তবে কী ছবি আসে?
চল্লিশ দশকের গোড়ায় জেলখানায় বসে এক কৃষ্ণকান্ত খুব মলিন বিকেলের আলোয় লাল কাগজে পেনসিল দিয়ে তার বিরহিনী বউকে চিঠি লিখছে, এরকম একটা লোককে মনে পড়ে। কিংবা মনে পড়ে একটা লোক–যাক গে, ওসব বলে লাভ নেই।
রেমির চোখ ছলছল করছিল। বলল, উনি খুব কষ্ট পেয়েছেন এককালে। না গো?
ধ্রুব হেসে মাথা নেড়ে বলল, কষ্ট কীসের? স্কোপ পেলে আমিও ওরকম রোমান্টিক কষ্ট করতে রাজি। কিন্তু আমরা তো স্কোপই পেলাম না রেমি।
পেলে কী করতে?
ওঃ, সে অনেক কিছু করতাম। বোমা মের ফাঁসির দড়িতে হাসতে হাসতে মরতাম। তার আগে গীতা পাঠ করতাম। গান গাইতাম, হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী। কিংবা দ্বীপান্তরে চলে যেতাম গোল কয়েক ইংরেজকে নিকেশ করে।
খুব বকুনি! সাহস জানা আছে।
কেন, আমি কি খুব ভেড়ুয়া?
তা বলছি না।
তবে কী বলতে চাইছ?
তুমি কোনও ব্যাপারেই সিরিয়াস নও।
আমি ভীষণ সিরিয়াস রেমি। আমি যদি স্বদেশি আমলে জন্ম নিতাম তা হলে কৃষ্ণকান্তর মতো স্বদেশি করতাম না।
কী করতে?
অন্যরকম কিছু। ভারতবর্ষে স্বদেশি আমলটাই ছিল আবেগসর্বস্ব। আবেগ জিনিসটা ক্ষণস্থায়ি। চট করে কেটে যায়। কৃষ্ণকান্তর অবস্থা দেখছ না? স্বদেশি জ্বর যেই ছেড়ে গেল, দেশ যেই স্বাধীন হল, অমনি কোমরে কাপড়ে বেঁধে স্বদেশি সার্টিফিকেটখানা বুকে লটকে কেরিয়ার তৈরি করতে নেমে পড়েছে। সেই কৃষ্ণকান্তর সঙ্গে যদি এই কৃষ্ণকান্তর আজ দেখা হয়ে যায় তা হলে দুজনের মধ্যে তুমুল মারপিট লেগে যাবে।
রেমি হেসে গড়িয়ে পড়ল, কী যে বলো না!
সেইজন্যই বলছিলাম, মা যা ছিলেন এবং মা যা হইয়াছেন তা দেখতে চলো অ্যাসেমব্লিতে যাই। গ্যালারি থেকে দেখবে নীচের এরেনায় দুদল লোক দুদিকে বসে কেমন গলা ছেড়ে ঝগড়া করছে। কলেজের ডিবেটিংও এর চেয়ে অনেক ভাল। ওই কুয়োর মধ্যে যে তোতি, রেষারেষি, ঠেলাঠেলি চলছে তাই থেকে দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে এমন কথা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে।
তার জন্য তো শ্বশুরমশাই দায়ি নন।
না। তবে তিনি যদি সৎ হতেন তবে ওই কুম্ভীপাকে গিয়ে ঢুকতেন না। স্বাধীন ভারতের পলিটিকস সভয়ে পরিহার করে ভদ্রলোকের মতো জীবনযাপন করতে পারতেন।
যারা পলিটিকস করে তারা ভদ্রলোক নয়?
কে বলল নয়? তা বলিনি। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে অনেকেই ভদ্রলোক। ভাল এবং সৎ লোকেরও অভাব নেই। কিন্তু সেটুকু তাদের নন-পলিটিক্যাল একজিসটেন্স।
আমি আর এসব শুনতে চাই না। এখন আমাকে আদর করো।
আমার মেজাজটা চটকে দিয়ে এখন আদর চাইছ?
মেজাজ কখন চটকালাম?–রেমি চোখ কপালে তুলল।
এই যে এতক্ষণ বকালে!
তুমিই বকলে।
না, তুমিই বকালে। কৃষ্ণকান্তর প্রসঙ্গ পারতপক্ষে আমার কাছে তুলো না।
আচ্ছা, ঘাট মানছি।
শোনো।
বলো।
তোমার শ্বশুরকে বলে দিয়ে, আমি কেরিয়ারিস্ট নই। নিজের জীবন কীভাবে যাপন করব সেটাও ঠিক করব আমিই। উনি যেন সেটা নিয়ে চিন্তা না করেন।
ও বাবা, ওসব আমি বলতে পারব না।
তা হলে আমিই বলব।
দোহাই, পায়ে পড়ি। বোলো না। উনি রাগী মানুষ।
আমিও রাগী।
বেশ, রাগটা আমার ওপর দেখাও। ওঁর ওপর নয়।
তোমার ভয়টা কীসের?
তোমাদের যদি ঝগড়া হয়?
হোক না।
না গো। পায়ে পড়ি।
তুমি খুব পায়ে পড়তে শিখেছ তো! কার কাছ থেকে শিখলে?
ঠেকে শিখেছি।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, এটাও পলিটিকস নয় তো? এই পায়ে পড়াটা?
তুমি এক নম্বরের—
কী?
বলব না। আমাকে এবার একটু আদর করে। একটুখানি।
ধ্রুব সে কথায় কর্ণপাত করল না। উঠে পায়চারি করতে করতে বলল, আজ আমার ঘুম আসবে। একদম ঘুম আসবে না।
পরদিন থেকেই ধ্রুব আবার বেহেড। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি পাত্তা নেই। কোনওদিন নিজেই ফেরে, কোনওদিন পুলিশ পৌঁছে দিয়ে যায়। প্রায় দিনই বেহুশ অবস্থায় ফেরে।
কেঁদে ভাসাতে লাগল রেমি।
সেই দুঃসহ দুর্দিনে হঠাৎ একদিন এসে হাজির হল সমীর।
০১৫. ঝিমঝিম করে ভরা দুপুর
বাইরে ঝিমঝিম করে ভরা দুপুর। ভারী নির্জন, নিরিবিলি, অথচ রোদে ঝলমলে। কুয়াশা কেটে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায়। উত্তরে অতিকায় মহিষের মতো গারো পাহাড় পর্যন্ত। ব্রহ্মপুত্রের স্রোতে গলন্ত রুপো এসে মেশে। ঝিরঝির করে অবিরল কথা বলে মহানিম। মস্ত মস্ত ঘরের ঘুলঘুলি, বারান্দার ওপরের কড়িবরগায় নানান জাতের হাজারও পায়রা নড়াচড়া করে আর ডেকে ওঠে। ভরন্ত দুপুরে পায়রার গদগদ স্বরের ডাক এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করে।
