ধ্রুব বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ করল না। বলল, মেয়েদের অত কী বলার থাকে বলে তো!
আজকের কথাটা ইমপর্ট্যান্ট।
কোন কথাটা ইমপর্ট্যান্ট নয় তোমার?
বাবা আজ আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
ডেকে পাঠানোর কী? তুমি তো সবসময়েই শ্বশুরের আশেপাশে পোষা বেড়ালের মতো ঘুরঘুর করছ বাবা।
তা করছি। তবু আজ ডেকে কয়েকটা কথা বললেন তোমার সম্পর্কে।
ওঃ হ্যাঁ, কথা একটা বলার আছে বটে। আমি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি।
কিন্তু সেটা আমাকে জানাওনি। অথচ আমি তোমার স্ত্রী।
চাকরি ছাড়লে স্ত্রীকে বলার একটা সাংবিধানিক নিয়ম আছে বোধহয়!
আছে। আমি জানতাম না।
তুমি অনেক কিছুই জানো না। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, আমাকে যখন বিয়ে করেছ, তখন আমারও ইচ্ছে করে স্বামীর রোজগারে খেতে পরতে। ইচ্ছেটা কি অন্যায়?
অন্যায় তো বটেই। তোমাকে আমি আজও বিয়ে করিনি। তোমার শ্বশুর আমার সঙ্গে তোমাকে জুটিয়ে দিয়েছেন। খাওয়া পরার ব্যাপারটা ওঁর সঙ্গেই ফয়সালা করে নাও গো
তোমার মুড পালটে যাচ্ছে।
ধ্রুব হেসে বলল, না। আমি ভাল মুডে আছি। চাকরি না থাকলে আমি সব সময়েই ভাল মুডে থাকি।
চাকরি ছাড়লে কেন?
আমার ভাল লাগে না। আমাদের বংশে কেউ কখনও চাকরি করেনি। ওটা আমার ধাতে নেই।
তুমি যে বাপের হোটেলে খাও তা নিয়ে শ্বশুরমশাই আজ একটু খোটা দিলেন। সেটা আমার ভাল লাগেনি।
সত্যকে সহ্য করাই তো ভাল।
কেন করব উপায় থাকতে?
উপায়টা কী?
তোমাকে রোজগার করতে হবে।
খামোকা রোজগার করে কী লাভ? বাবার মেলা টাকা। আমরা কভাই ছাড়া খাবে কে?
তবু সেটা বাবার টাকা, তোমার তো নয়।
বাবারও পুরোটা নয়। বলা ভাল, পূর্বপুরুষদের টাকা। তাতে বাবারও যা অধিকার আমাদেরও তাই।
সেটা উনি যখন থাকবেন না তখন দেখা যাবে। আমার স্বামী যে অক্ষম নয় আমি সেটা প্রমাণ করতে চাই।
শ্বশুরের অপমানের শোধ নেবে নাকি?
যদি বলি তাই?
লোকটা ঝানু পলিটিসিয়ান। অপমান গায়ে মাখে না। তুমি যে শোধ নিয়েছ তা হয়তো বুঝতেই পারবে না।
বোঝাতে চাইও না। আমি ওঁকে আর অপমান করার সুযোগ দিতে চাই না।
আমি চাকরি বা রোজগার করলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?
খানিকটা যাবে।
কী ভাবে?
আমরা আলাদা বাসা করে সংসার পাতব।
ধ্রুব কথাটা শুনে হঠাৎ উঠে বসল। রেমিকে দুহাতে ধরে স্থির দৃষ্টিতে মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে মৃদু একটু হেসে বলল, আমি একথাটাই তোমার মুখে শুনব বলে আশা করছিলাম। কিন্তু একথা আর কখনও উচ্চারণ কোরো না।
ধ্রুবর এই কথায় একটু ঘাবড়ে গেল রেমি। বলল, কেন?
আমাদের পরিবারে বাপ এবং ছেলের ভিন্ন হওয়ার প্রথা এখনও চালু হয়নি। হয়তো ভবিষ্যতে একদিন হবে। কিন্তু তুমি সেটা শুরু কোরো না।
তা হলে কী করে প্রমাণ হবে যে, তুমি ওঁর ওপর নির্ভরশীল নও?
কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী প্রমাণ চাইছে না। তুমি ভুল করছ। বাপের হোটেলে খাওয়া নিয়ে খোঁটা দেওয়াটা একটা মৃদু প্রোভোকেশন মাত্র। আমি আত্মনির্ভরশীল হলেই কৃষ্ণকান্তবাবু খুশি হবেন তা নয়। বরং উনি চান যে, আমি ওঁরই হাত থেকে রোজ ল্যাজ নেড়ে নেড়ে ভুক্তাবশেষ গ্রহণ করি।
ছিঃ, ও কী বলছ?
ঠিকই বলছি। তুমি লোকটাকে চেনো না।
রেমি একটু চুপ করে থেকে বলল, ঠিক আছে, তা হলে তুমি রোজগার করে ওঁর হাতে প্রতি মাসে টাকা দাও।
কত টাকা দেব?
যতই হোক। পাঁচশো-সাতশো।
তোমার শ্বশুর সেটা হাত পেতে নেবে?
নেবেন না কেন?
সেটা জিজ্ঞাসা করে এসো।
জিজ্ঞেস করতে হবে কেন? বাপ কি ছেলের টাকা নেয় না?
কৃষ্ণকান্ত কি তেমন বাপ?
নেবেন না বলছ?
হয়তো নেবে, তবে নিজে হাত পেতে নেবে না। হয়তো কোনও চাকরকে ডেকে বলবে, ওরে টাকাটা তোর কাছে রেখে দে তো।
যাঃ, শ্বশুরমশাই মোটেই ওরকম নন।
হবে হয়তো। আমি ভদ্রলোক সম্পর্কে খুব ভাল জানি না।
ইয়ারকি হচ্ছে?
বাস্তবিকই জানি না, আমার লোকটা সম্পর্কে একটু ধাঁধা আছে।
কীরকম ধাঁধা?
ধরো, লোকটা একসময়ে স্বদেশি করত। তাই না?
তা তো বটেই।
বেশ আদর্শবাদী লোক ছিল। তাই না?
এখনও আছেন।
আহা, এখনকার কথা ছাড়ো।
ঠিক আছে, বলো।
লোকটার জ্যাঠা সন্ন্যাসী হয়ে যায়। কাকা স্বদেশি করতে করতে খুন হয় বা দুর্ঘটনায় মারা যায়। ঠিক তো?
তাই তো শুনেছি।
সুতরাং লোকটার ভিতরে সন্ন্যাস এবং স্বদেশিয়ানার একটা অ্যাডমিকশ্চারও ঘটেছে। স্বীকার করো?
না হয় করলাম।
কিন্তু লোকটা এখন এক নম্বরের ধাপ্পাবাজ, মিথ্যেবাদী এবং কেরিয়ারিস্ট।
আবার?
ধ্রুব রেমির হাত নিয়ে খেলা করতে করতে বলল, তোমার বয়স কত?
কেন, তুমি জানো না?
মেয়েদের বয়স তারা নিজেরাই মনে রাখতে চায় না। সে যাক গে। তুমি খুব কম বয়সি বোকা একটি মেয়ে।
না হয় হলাম।
এ বয়সে একজন দেশবিখ্যাত নেতার মুখোমুখি হলে মাথা ঠিক রাখা মুশকিল। চোখ ধাধিয়ে যায়।
আমার কি তাই হয়েছে?
হয়েছে। একটু বেশি মাত্রায় হয়েছে। যতক্ষণ ওই ধাঁধানো ভাবটা থাকবে ততক্ষণ লোকটার আসল চেহারা তোমার নজরে পড়বে না।
রেমি অভিমানভরে বলল, তুমি ঠিক বলছ না গো। শ্বশুরমশাই কত সহজ সরলভাবে থাকেন, একটুও বাবুগিরি নেই, আরাম আয়েস নেই—
ঠিক কথা। লোকটার সপক্ষে পজিটিভ পয়েন্টও অনেক আছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে লোকটা সম্ভবত চরিত্রবানই ছিল। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই লোকটা চরিত্র হারাচ্ছে। খুব ধীরে ধীরে অবশ্য।
পলিটিকস করতে গেলে ওরকম একটু-আধটু হয়।
ধ্রুব নীরবে মাথা নাড়ল। তারপর অন্যমনস্ক চোখে ঘরের আলোটার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, তুমি কথাটা ভেবে বলোনি, কিন্তু খুব ঠিক কথা বলেছ।
