সেরকমই।
লোকটা কে?
হেমকান্ত বিব্রত হয়ে বলেন, সেটাও উদ্ভট। লোকটা নাকি আমিই।
বটে।–রঙ্গময়ি চোখ পাকাল। তারপর হঠাৎ হেসে ফেলে বলল, চিঠিটা চুরি করে আমিও পড়েছি।
পড়েছ! ওঃ। তা হলে—
রঙ্গময়ি ক্লান্ত, তবু শান্ত স্বরেই বলল, কথাটা উদ্ভট কেন হবে? তোমার বিয়ের পর আমি কি তোমাকে কম জ্বালিয়েছি?
হেমকান্ত হঠাৎ লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলেন। বললেন, সে তো ছেলেমানুষি। কাফ লাভ।
রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তাই হবে হয়তো। এই কথাটা বলতে তোমাকে এত ভনিতা করতে হল কেন বলো তো!
০১৪. ভোটে জিতে কৃষ্ণকান্ত মন্ত্রী হয়েছেন
র আলো
ভোটে জিতে কৃষ্ণকান্ত মন্ত্রী হয়েছেন। বাড়ির আবহাওয়াটা খুবই ভাল। ফুরফুরে একটা আনন্দের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে সবসময়ে। সেই আনন্দটা রেমিকেও ছোঁয়। এমন এক বাড়ির সে বউ, যে বাড়িটা সর্বসাধারণের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এ বাড়ির লোককে সম্ভ্রম এবং খাতির করে। কৃষ্ণকান্ত এলেবেলে মন্ত্রী নন। বহুদিন ধরেই এক নাগাড়ে তিনি বেশ কয়েকটা ভারী দফতর চালিয়েছেন। তার সুনাম এবং প্রতিষ্ঠা নিখাদ। অতীতটাও স্বর্ণগর্ভ। স্বদেশি আমলে মার খেয়েছেন, জেল খেটেছেন, কৃচ্ছসাধনও কিছু কম করেননি। এখনও অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করেন। মোেটা খদ্দরের ধুতি, সাধারণ পাঞ্জাবি পরেন, সামান্য অনাড়ম্বর খাবার খান, কম ঘুমোন। মোটামুটি একটা গাঁধীবাদী গন্ধ আছে তাকে ঘিরে। শুধু মেজাজটা কিছু চড়া, প্রতাপ সাংঘাতিক।
একদিন রেমিকে ডেকে বললেন, রামছাগলটা আবার চাকরি ছেড়েছে জানো?
রেমি জানত না। মাথা নিচু করে রইল।
কৃষ্ণকান্ত বললেন, আটশো টাকা মাইনের চাকরি। এ বাজারে কিছু কম নয়। কেন ছাড়ল তা তোমাকে বলেছে?
উনি আমাকে কিছু বলেন না।
বলার পাত্র নয়। তোমাকে মানুষ বলে জ্ঞান করে না। আমাকেই করে না তো তুমি! ছাগলটাকে জিজ্ঞেস কোরো তো কেন ছাড়ল।
করব।
কৃষ্ণকান্ত একটু ভেবে বললেন, তোমাকে হয়তো বলবে না। তবে আমি খানিকটা আন্দাজ করতে পারি। চাকরিটা ছিল একটা প্রাইভেট ফার্মে। আমার চেনা ফার্ম। বোধহয় আমার সঙ্গে খাতির রাখতেই ওরা ছাগলটাকে ডেকে নিয়ে চাকরি দিয়েছিল। সেটাতে বোধহয় বাবুর অপমান হয়ে থাকবে। বাপের খাতিরে ওর মতো লাটসাহেব চাকরি করবে কেন! কিন্তু বউমা, আমি বুঝি না ছাগলটার কোয়ালিফিকেশনটাই বা কী যে খাতির ছাড়া আটশো টাকা মাইনের চাকরি জোগাড় করবে। ওকে একথাটাও জিজ্ঞেস কোরো।
রেমি মাথা নত করেই ছিল। জবাব দিল না। সে জানে, ধ্রুবর চাকরি ছাড়াটা এমন কিছু দারুণ ঘটনা নয়। এর আগেও কয়েকবার ছেড়েছে। আবার চাকরি পেয়েও গেছে। না পেলেও তো ক্ষতি নেই। ধ্রুবর রোজগারের পয়সা এ বাড়ির কেউ হেঁয়ওনি, এমনকী রেমি পর্যন্ত না। মাইনের টাকায় সে কী করে তা কেউ জানেও না, খবরও নেয় না।
কৃষ্ণকান্ত কিন্তু উত্তেজিত গলায় বললেন, চিরটা কাল এরকম যাবে না, বুঝলে বউমা? আমরা যৌবনে কেবিয়ার তৈরির কথা ভাবতাম না ঠিকই। কিন্তু তখন আমাদের সামনে একটা পজিটিভ লক্ষ্যবস্তু ছিল। দেশকে স্বাধীন করতে হবে। কিন্তু এখনকার ইয়ংগার জেনারেশনের সামনে ওরকম কিছু তো নেই। ওই গর্ভস্রাবটার তো আরও নেই। সামনে একটা পলিটিক্যাল ক্রাইসিস আসছে। চিরকাল তো আমি ক্ষমতায় থাকব না। মরতেও একদিন হবে। তখন ওর গতিটা হবে কী?
রেমি একথার জবাব দিল না। ইদানীং ধ্রুবর সঙ্গে তার সম্পর্কটা ভালই যাচ্ছিল। ধ্রুব অবশ্য বউ নিয়ে সিনেমায় যাওয়া বা রেস্টুরেন্টে খাওয়া ইত্যাদি হালকা পলকা ব্যাপারে নেই। প্রেমে গদ গদ ভাবেরও তার অভাব। উপরন্তু সে কমপ্লিমেন্ট দিতে জানে না। কোনওদিন রেমিকে সে বলেনি, বাঃ, তুমি তো খুব সুন্দর! কিন্তু রেমি অতটা আশাও করে না ধ্রুবর কাছ থেকে। ধ্রুব যে রোজ বাড়ি ফেরে, তার সঙ্গে স্বাভাবিক দু-চারটে কথাবার্তা কয় এবং এক বিছানায় শোয় সেইটেই যথেষ্ট বলে ধরে নিয়েছে রেমি। এর চেয়ে বেশি ভালবাসা প্রকাশের ক্ষমতাই ধ্রুবর নেই। রেমি মনে মনে ভগবানকে বলে, এটুকু বজায় থাকলেই যথেষ্ট। আমি আর বেশি চাই না। সুতরাং ধ্রুবর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় সে স্বামীর ওপর একটুও চটল না। সে জানে, কারও অধীনে কাজ করা বর পক্ষে শক্ত। অন্যে হুকুম করবে আর ধ্রুব তা তামিল করে যাবে এমনটা তার সম্পর্কে যেন কল্পনাই করা যায় না।
কৃষ্ণকান্ত বললেন, শোনো মা, ওর সঙ্গে তোমারও ভবিষ্যৎ জড়ানো। ওর কেরিয়ারটা তৈরির ভার তুমিও একটু নাও। ওকে বোঝাও, শাসন করো।
রেমি বলল, আপনি ভাবছেন কেন? একটা কিছু ঠিক করবে।
সেটা আর কবে হবে? চাকরি করতে যদি না চায়, ব্যাবসা করুক। কিন্তু সেটাও কি করবে? টাকা হাতে পেলেই ফুঁকে দিয়ে বসে থাকবে। বাপের হোটেলে থাকে বলে টের পায় না কত ধানে কত চাল। কিন্তু দেশ কালের অবস্থা তত সুবিধের নয়। ওকে একটু বুঝিয়ে বোলো।
একথাটা একটু বিঁধল রেমিকে। ধ্রুব বাপের হোটেলে খায় বটে, কিন্তু সে আরও অনেকেই খায়। কথাটা শ্বশুরমশাই রেমির সামনে না বললেও পারতেন।
ধ্রুব কয়েকদিন যাবৎ মদ খাচ্ছে না। সেদিনও ধ্রুবকে রাত্রি স্বাভাবিক অবস্থায় পেয়ে গেল রেমি। বিছানায় শুয়ে একটা অর্থনীতির বই পড়ছিল। কয়েকদিন যাবৎ-ই অখণ্ড মনোযোগে বইটা পড়ছে। থার্ড ওয়ার্ল্ড ইকনমি।
রেমি বইটা কেড়ে নিয়ে পাশে বসে বলল, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
