কেন, ওকথা বলছ কেন?
বরিশালে এক পাদ্রিকে খুন করার জন্য ওর ফাঁসি হবে।
কে বলল?
আমি জানি।
কী করে জানলে?
সারা রাত ছেলেটা জ্বরের ঘোরে ভুল বকেছে। সেইসব প্রলাপ থেকেই বুঝতে পেরেছি।
কী বলছিল?
অত খুলে বলার সময় নেই। এখন গিয়ে স্নান করব, চারটি খাব, তারপর ফের এসে রুগির কাছে বসতে হবে। খানিকক্ষণের জন্য পিসিকে বসিয়ে রেখে এসেছি। আর কৃষ্ণ আছে। কিন্তু রুগির অবস্থা তো ওরা ভাল বুঝবে না।
সর্বনাশ!
সর্বনাশের কী হল?
পুলিশ যদি খবর পায়?
খবর কি আর পায়নি!
পেয়েছে?
এসব খবর কি আর গোপন থাকে! পরশু থেকে পুলিশের চর ঘোরাফেরা করছে।
কে বলো তো?
মহেশবাবু। সেই যে বাবরি চুল—
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, জানি।
তাই বলছিলাম ছেলেটার বেঁচেও লাভ নেই।
হেমকান্ত গভীর দৃষ্টিতে রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, তবু ছেলেটাকে বাঁচানোর জন্য তুমি প্রাণপণ করছ। কেন করছ রঙ্গময়ি?
কেন আবার! বাঁচানোর চেষ্টা তো করতেই হবে। কোন মায়ের কোল খালি করে চলে এসেছে। তাকে এমনি-এমনি মরতে দেওয়া যায়?
এই যে বললে রোগে না মরলেও ফাঁসিতে মরবে!
সেটা এখনও জানি না। তবে খুনটা বোধহয় ও করেছে।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তা হলে রোগেই কেন ওকে যেতে দাও না?
একথায় রঙ্গময়ি হঠাৎ একটু অদ্ভুত হাসল। সেই হাসিতে রোজকার দেখা রঙ্গময়ি বদলে গেল হঠাৎ। ধীর স্বরে বলল, তা হলে ওর কথা তো কেউ জানতে পারবে না। পত্রিকায় ওর নাম উঠবে না। ইতিহাসে নামটা লেখাও থাকবে না।
নামটা চাউড় হওয়াটা কি ভাল?
কে জানে! তবে আমার মনে হয়, ওইটুকু ছেলে একটা সাহসের কাজ যখন করেছে তখন দেশের লোকের সেটা জানা উচিত। ফাঁসিতেই যদি মরে তা হলে হাজার-হাজার ওর বয়সি ছেলে খবরটা জেনে এই কাজে নামবে।
মনু!–হেমকান্ত আর্তনাদ করে ওঠেন।
কী বলছ?–স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো গলায় রঙ্গময়ি জবাব দেয়।
তুমিও কি স্বদেশি করছ নাকি?
আমার তো জমিদারি নেই, করলে দোষ কী?
সর্বনাশ।
সর্বনাশের কিছুই নেই। মেয়েরা আবার স্বদেশি করতে পারে নাকি? হাতে পায়ে বেড়ি আছে না!–বলে রঙ্গময়ি একটু হাসে।
তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু ছোকরা যদি ধরা পড়ে তা হলে আমরাও কি রেহাই পাব! বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা।
তোমার যে কত রকমের ভয়!
ভয়টা কি মিথ্যে?
তা বলিনি। কিন্তু শশীর যা হবে তোমার তো আর তা হবে না। কেউ ধরে নিয়ে ফাঁসি দেবে না তোমাকে। তুমি তো আর স্বদেশি বলৈ ওকে আশ্রয় দাওনি।
তুমি পুলিশকে জানো না।
না জানলেই বা। অত ভয় পেয়ো না।
মহেশ কবে এসেছিল?
পরশু থেকেই ঘুরঘুর করছে।
কিছু বলেছে?
আমাকে না। তবে কাছারি বাড়িতে অনেককে নানারকম জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তোমার কাছেও আজ আসার কথা।
কে বলল?
মহেশবাবু নিজেই বলে গেছেন।
হেমকান্ত কিছুক্ষণ উদ্বিগ্ন মুখে ভাবলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, কী বলব বলল তো মনু!
কী আবার বলবে। আমি হলে তো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিতাম।
ওটা কাজের কথা হল না।
তা হলে যা বলবার নিজেই বুদ্ধি করে বোলো। রাত জেগে আমার মাথাটা ঠিক নেই এখন।
একটু বোসো, মনু। তোমার সঙ্গে আমার আর-একটু কথা আছে।
আবার কী কথা?
আছে।
কাজের কথা, না ভাবের কথা?
হেমকান্ত হেসে বললেন, দুরকমই। যে ভাবে যে নেয়।
রঙ্গময়ি বলল, ভাবের কথা হলে না হয় পরে শুনব।
ভাবের কথাকে এত ভয় কেন, মনু?
আমি বাপু, ভাবের কথাকে বড় ভয় পাই। তা ছাড়া এখন ভাবের কথা শোনার মতো মন নেই।
তুমি কাজের লোক জানি। তবু আজ একটা কথা জিজ্ঞেস করি। জবাব দেবে?
আগে তো শুনি।
তোমার কি কোনও বিশেষ দুঃখ আছে, মনু?
এই কথা বলে রঙ্গময়ি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল হেমকান্তর দিকে। বেশ দেখাল তাকে।
হেমকান্ত এই চোখের সামনে বরাবর কুঁকড়ে যান। কিন্তু আজ একটু সাহস করে চোখে চোখ রাখলেন। বললেন, কথাটাকে তুচ্ছ ভেবো না। কারণ আছে বলেই জিজ্ঞেস করছি।
রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কারণ ছাড়া তুমি কিছু করবে না জানি। কিন্তু কারণটা কী?
আগে বলো।
বলার কী আছে তাও তো ছাই বুঝছি না। আমি গরিব পুরুতের মেয়ে, আমার তো দুঃখ থাকারই কথা।
সে দুঃখ তোমার নেই। থাকলেও আমি তার কথা বলছি না। আমি জিজ্ঞেস করছি বিশেষ কোনও দুঃখের কথা।
রঙ্গময়ি শ্রান্তমুখেও হাসতে লাগল। বলল, আর-একটু বুঝিয়ে না বললে বোকা মেয়েমানুষের মাথায় কি সেঁধোয়?
হেমকান্ত চোখ থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন, ধরো যদি জিজ্ঞেস করি কোনও পুরুষের প্রতি তুমি আসক্ত কি না যাকে মুখ ফুটে কখনও কথাটা বলতে পারোনি?
রঙ্গময়ির কোনও ভাবান্তর বোঝা গেল না। তবে সে চোখ দুটো বুজে স্থির হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর চোখ খুলে হেমকান্তর দিকে তাকাল। স্নিগ্ধ ও গভীর এক দৃষ্টি। আস্তে করে বলল, না তো।
ঠিক বলছ, মনু?
রঙ্গময়ি হাসল। বলল, তুমি কি অন্য কিছু শুনতে চেয়েছিলে?
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, না। তবে কিছু লোক অন্য কথা বলে।
তাদের চেয়ে আমাকে তোমার ভাল জানবার কথা।
আমি তো তাই মনে করি। তবু কেন যে লোকের অদ্ভুত সব সন্দেহ!
কী সন্দেহ?
সচ্চিদানন্দ একটা চিঠি লিখেছিল। তাতে কিছু অদ্ভুত কথা ছিল তোমাকে নিয়ে।
রঙ্গময়ি মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে, কী কথা?
সেটা তোমাকে বলা যায় না।
কেন বলা যায় না? আমাকে নিয়েই যখন কথা তখন আমার জানা উচিত।
সচ্চিদানন্দটা পাগল।
রঙ্গময়ি হেসে বলল, সচ্চিদানন্দবাবুর মতো ঘড়েল লোক যদি পাগল হয় তবে দুনিয়ায় সবাই পাগল। কী লিখেছে বলো না। কারও প্রতি আমার দুর্বলতা আছে বুঝি?
