“তোমার এই অপদার্থ বয়স্যটিকে ক্ষমা করিয়ো। তবু শশিভূষণ যখন সামনে আসিয়া দাঁড়াইল তখন মনে হইল, এই তত সচ্চিদানন্দের দেশ কাল পরিস্থিতি আমার সম্মুখে আসিয়া হাজির হইয়াছে। ইহাকে একটু বাজাইয়া দেখিলেই তো স্বদেশিয়ানার প্রবণতাটা বুঝা যাইবে। সম্ভবত স্বদেশের প্রতি যে কর্তব্য আজও না করিয়া পাপ সঞ্চয় করিতেছি, এই ছোকরাকে আশ্রয় দিলে সেই পর্বতপ্রমাণ অপরাধের তিলপ্রমাণ ক্ষয়ও হইতে পারে। এখন সেই কর্মের ফলভোগ করিতেছি। শশিভূষণ বুঝি বাঁচে না।
“আর এক সমস্যা আমার কনিষ্ঠ পুত্রটিকে লইয়া। সে তাহার মাকে দেখে নাই বলিলেই হয়। স্বভাবতই সে আমার কিছু প্রশ্রয় পাইয়াছে। এই সপ্তানটির প্রতি আমার দুর্বলতার কথাও সকলেই জানে। এখন তাহার জ্যেষ্ঠভ্রাতা তাহাকে কলিকাতায় লইয়া গিয়া লেখাপড়া শিখাইতে আগ্রহী। আমি মতামত দিই নাই। যে কোনও বিষয়েই মনস্থির করিতে আমার সময় লাগে। মনে হইতেছে, কৃষ্ণকান্ত চলিয়া গেলে আমার কিছু কষ্ট হইবে।
“পুত্রকন্যারা আমার প্রতি স্নেহাসক্ত কি না জানি না। তাহাদের সহিতও আমার সেই দূরত্ব। সুতরাং কৃষ্ণকান্তের আমাকে ছাড়িয়া যাইতে কষ্ট হইবে কি না জানি না, যদি জানিতে পারি যে হইবে না, তবে বোধহয় খুব খুশি হইব না। কিন্তু কথাটা হইল এই, এই পৃথিবীতে আমরা পরস্পরের কতটা আপনজন?
“সচ্চিদানন্দ ভায়া, তোমাকে কোকাবাবুর গৃহে সংঘটিত একটি ঘটনার কথা লিখিয়াছিলাম। দাদু মরিতেছে আর নাতি পাখি শিকার করিয়া ফিরিয়াছে বলিয়া অন্যদিকে খুশির হিল্লোল বহিয়া যাইতেছে। সন্দেহ হইয়াছিল, আমাদের অধিকাংশ লোকই হয়তো কৃত্রিম। বৃদ্ধ পিতার জন্য তাহার পুত্রের তেমন কোনও স্নেহ থাকে না।
“সেই কথা যতবার মনে হয় ততবার শীঘ্র মরিতে ইচ্ছা করে…”
হঠাৎ রঙ্গময়ির কণ্ঠস্বর পিছন থেকে বলে উঠল, তোমার মরতে ইচ্ছে করে?
হেমকান্ত চমকে উঠলেন। কিন্তু চিঠি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেন না। বললেন, কখন এলে?
অনেকক্ষণ। পিছনে দাঁড়িয়ে চিঠিটা পড়ছিলাম। আমার শ্বাসের শব্দও পাওনি?
না। হয়তো শ্বাস বন্ধ করে পড়ছিলে।
মরতে ইচ্ছে করে লিখেছ কেন? সত্যিই করে?
হেমকান্ত মৃদু একটু হাসলেন। বললেন, বোধহয় করে।
ছেলেমেয়েরা ভালবাসে না তোমাকে একথা কে বলল?
কেউ বলেনি। আমি লিখেছি ভালবাসে কি না জানি না।
জানো না কেন? খোঁজ নিলেই তো হয়।
খোঁজ নিলে কী জানা যাবে বলো তো মনু? বাসে?
আমি বলতে যাব কোন দুঃখে?
তুমি ছাড়া আর তো কেউ বলতে পারবে না।
কৃষ্ণকে ছেড়ে থাকতে যদি কষ্টই হয় তবে সে কথা কনককে জানিয়ে দিলেই তো পারো। চ্চিদানন্দবাবুকে জানানোর কী?
হেমকান্ত মৃদু মৃদু হাসছিলেন। বিব্রতও বোধ করছিলেন। বললেন, সেটা জানানো ভাল হবে না।
পাছে ছেলের সম্পর্কে তোমার দুর্বলতা ধরা পড়ে যায়? আচ্ছা লোক। বাবা ছেলেকে ভালবাসে এর মধ্যে কি লজ্জার কিছু আছে?
হেমকান্ত একটু বিষণ্ণ হয়ে বললেন, মনু, লজ্জার কিছু আছে কি না তা তুমি ঠিক বুঝবে না। যদি সত্যি কথা জানতে চাও, তা হলে বলি, আছে।
এ রকম উদ্ভট কথা কখনও শুনিনি।
আমি চাই না কৃষ্ণ কথাটা জানতে পারে।
সে জানলে দোষটা কী?
দোষের কিছু নয় তা জানি। তবে হয়তো ভাববে, বাবা এমনিতে ডাক-খোঁজও করে না কিন্তু কলকাতায় যাওয়ার বেলায় বাগড়া দিচ্ছে।
শুধু এইটুকু?
না।–হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, আরও একটু কথা আছে।
সেটা কী?
আমি মায়া কাটাতে চাই।
তাই বা কেন?
তুমি বুঝবে না।
খুব বুঝব, একটু বোঝানোর চেষ্টা করে দেখো।
তা হলে বোসো।
রঙ্গময়ি শীতের রোদে পিঠ দিয়ে কারপেটের আর-এক অংশে বসল। তার মুখচোখে ক্লান্তির ছাপ, রাত্রিজাগরণের চিহ্ন।
হেমকান্ত বললেন, আমি হঠাৎ বুঝতে পেরেছি পৃথিবীতে আত্মীয়তার বন্ধনগুলো ভারী পলকা।
একথা কেন বলছ?
যা সত্যি বলে মনে হয়েছে তাই বলছি।
তুমি তো কখনও সংসারের ভিতরেই ভাল করে ঢুকলে না। ছেলেমেয়েদের কদিন কোলে পিঠে নিয়েছ তাও আঙুলে গোনা যায়। কাউকে তো কখনও আত্মীয় করে তোলার চেষ্টাই করলে না। তাই তোমার ওসব মনে হয়।
হেমকান্ত ব্যথিত হয়ে বললেন, কথাটা ঠিক নয়, মনু। সংসারকে যতই আপন করতে চাও না কেন সংসার তোমাকে ফাঁকি দেবেই।
রঙ্গময়ি তার উড়োখুড়ো চুল হাত দিয়ে চেপে মাথায় বসানোের ব্যর্থ একটা চেষ্টা করতে করতে বলল, তোমার মতো করে ভাবলে দুনিয়ার সব নিয়মই উলটে দেওয়া যায়। কিন্তু ওটা হল ভাবের কথা। এখন কাজের কথা শোনো। শশিভূষণের অবস্থা আজ সকালে আরও খারাপ হয়েছে।
হেমকান্ত উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, কতটা খারাপ?
টিম টিম করে প্রাণটা আছে এখনও। তবে বেশিক্ষণ নয়। কী করবে?
হেমকান্ত হতাশ গলায় বললেন, কী করব? আমার কী করার আছে?
তোমার তো কখনওই কিছু করার থাকে না, শুধু ভাবার থাকে। আমি সারা রাত ছেলেটার কাছে ছিলাম।
সারা রাত! ঘুমোওনি?
একটা অল্প বয়সের ছেলে চোখের সামনে মরে যাচ্ছে তা দেখেও কি ঘুম আসে?
তা বটে।
আজ সকালে মানুবাবু এসে দেখে ওষুধ দিয়ে গেছেন।
মানুবাবুটা আবার কে?
কদমতলায় যে হোমিয়োপ্যাথ ডাক্তার বসে।
সে কী বলল?
কিছু বলল না। ওষুধ দিয়ে গেল। কিন্তু সূর্যবাবু এক রকম জবাব দিয়ে গেছেন।
হেমকান্ত মৃদুস্বরে বললেন, কেন যে ছেলেটা মরতে এ বাড়িতে এল!
সে ভেবে এখন আর কী করবে?
কোনও রকমেই কি বাঁচানো যায় না, মনু?
রঙ্গময়ি মৃদু হেসে বলল, তা জানি না। তবে বেঁচেও বোধহয় লাভ নেই।
