তা বটে। তাহলে লেট আস গো। সমীরকে রেডি হতে বলো।
বলাই আছে! উনি তৈরি। আমরা নামলেই হয়।
যখন দুজনে নীচে নেমে এল তখন ধ্রুবর ফিটফাট চেহারা দেখে সমীর কিছুটা অবাক। বলল, আপনি হানড্রেড পারসেনট ফিট দেখছি।
ধ্রুব খুব লাজুক মুখে হেসে বলল, কাল একটু বেসামাল হয়েছিলাম। কিছু মনে করবেন না। শুনলাম, আমার জনাই আপনি আটকে গেলেন।
ও কিছু নয়।
ধ্রুব খুব ভদ্র গলায় বলল, কাল আপনি প্রায় সারাদিন গাড়ি চালিয়েছেন। আজ পাশে বসে রেস্ট নিন। আমি চালাব।
পারবেন? পাহাড়ি রাস্তা কিন্তু।
পারব।
আশ্চর্য এই, ধ্রুব চমৎকার পারল। গাড়ি টাল খেল না, ঝাঁকুনি লাগল না, এতটুকু বেসামাল হল না কোথাও। অত্যন্ত দক্ষ পাহাড়ি ড্রাইভারের মতোই সে ঘুম মনাস্টারি, সিনচাল লেক হয়ে কারশিয়ং পর্যন্ত নেমে এল। তারপর নিরাপদে আবার গাড়ি ফিরিয়ে আনল হোটেলে। পিছনে বসে মুগ্ধ বিস্ময়ে দৃশ্যটা দেখছিল রেমি। বুকের মধ্যে যেন দুটো হৃৎপিণ্ড ধুক ধুক করছিল তার। ধ্রুব! ধ্রুব যদি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে তবে রেমি ধ্রুব ছাড়া আর কাউকে পাত্তা দেবে কি?
দুপুরে ভাত খাওয়া অবধি তিনজনে চমৎকার সময় কাটিয়ে দিল।
সমীর বলল, আজ আমার ফিরে যাওয়ার কথা। যদি অনুমতি দেন তাহলে যাই।
ধ্রুব মৃদু হেসে বলল, আমাকে বিশ্বাস করবেন না। দার্জিলিং-এর ওয়েদারের মতোই আমার মেজাজ। এই ভাল আছি, চার ঘণ্টা পরে হয়তো দেখবেন মেঝেয় গড়াগড়ি খাচ্ছি। তার চেয়ে বরং সুদর্শনকাকাকে একটা ফোন করে দিই, আপনি কয়েকটা দিন আমাদের সঙ্গেই থাকুন। রেমিরও একটা কমপ্যানি হবে।
সমীর হঠাৎ সেই সময়ে বলল, আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে ধ্রুববাবু। আজ আপনার মেজাজটা ভাল আছে বলেই বলতে চাইছি।
আরে বলুন না!কী কথা! রেমি বরং ঘরে গিয়ে রেস্ট নিক। আমরা দুটো বিয়ার নিয়ে লাউঞ্জে বসি। সেই ভাল।
রেমি কাঁপা-কাঁপা বুক নিয়ে ঘরে এল। সমীর কী বলবে সে জানে না। কিন্তু হে ঠাকুর, এমন কিছু যেন না হয় যাতে ও চটে যায় কিংবা রেমিকে সন্দেহ করে।
অস্থির রেমি বিছানায় শুয়ে বই পড়ার চেষ্টা করল অনেকক্ষণ। মন দিতে পারল না। ঘণ্টাতিনেক কেটে যাওয়ার পর সে ক্লান্ত হয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। যখন ঘুম ভাঙল তখন সন্ধে হয়ে গেছে। ঘর ফাঁকা।
তাড়াতাড়ি উঠে নীচে নেমে এসে দেখল সমীর গম্ভীরভাবে লন-এ পায়চারি করছে একা।
সে কী? আপনি একা! ও কোথায়?
সমীর একবার কপালে হাত দিয়ে হতাশার ভঙ্গি করে বলল, হি ইজ বিয়ন্ড এভরিথিং।
তার মানে?
কিছু করা গেল না রেমি। আমি ভাল করে কথা বলা শুরু করার আগেই উনি আসছি বলে কেটে পড়লেন। কোথায় গেলেন কে জানে। ঘণ্টা দুই বাদে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে শুরু করলাম। খবর পেলাম, বাজারের কাছে একটা বার-এ মদ খেয়ে প্রচণ্ড হাঙ্গামা বাঁধিয়েছেন।
সে কী!–রেমির চোখ কপালে উঠল।
ব্যাপারটা স্যাড। কয়েকটা নেপালি ছোকরার সঙ্গে মারপিট হয়েছে। খুব বেশিদূর গড়ায়নি অবশ্য। তাহলে পেটে কুকরি ঢুকে যেত। তবে একটু চোট হয়েছে।
রেমি আর্তনাদ করে উঠল, ও কোথায় বলুন।
ডাক্তারখানায়। এখুনি আসবেন। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
নিশ্চয়ই আছে। ও কি উন্ডেড?
না, সেরকম কিছু নয়। বরং দুটো ছোকরা ওর হাতেই বেশি ঠ্যাঙানি খেয়েছে। উনি ঠিক আছেন। কপালটা একটু কেটেছে। আপনি অস্থির হবেন না। আমাদের হোটেলের ম্যানেজার নিজে গেছেন স্পটে।
রেমি অবশ হয়ে লনের একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। অত্যন্ত সেকেলে ভঙ্গিতে বলল, কী হবে?
হয়তো কিছু হবে না। কিন্তু লোক্যাল ছেলেদের সঙ্গে গণ্ডগোল করায় এখানে আপনাদের থাকাটা আর সেফ নয়। আপনি বরং ঘরে গিয়ে এসেনশিয়াল কিছু গুছিয়ে নিন। সুটকেসটুটকেসগুলো থাক, পরে পাঠিয়ে দেবে। ধ্রুববাবু এলেই আমি আপনাদের নিয়ে শিলিগুড়ি নেমে যাব।
রেমি ভয় পেয়ে বলল, কেন? লোকাল ছেলেরা কি গণ্ডগোল করবে?
করতে পারে। সেটাই স্বাভাবিক।
রেমির হাত পা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। কোনওরকমে ঘরে এসে সে পাগলের মতো ভুলভাল জিনিস ভরে একটা কিট ব্যাগ গোছাচ্ছিল। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা ধ্রুব ঘরে ঢুকে বিরক্ত গলায় বলল, কী করছ? আমরা শিলিগুড়ি যাচ্ছি না।
রেমি দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল ধ্রুবর বুকে, কী করেছ তুমি? কী সর্বনেশে কাণ্ড করেছ? জানো না, এখানে মারপিট করতে যাওয়া কী ভীষণ রিসকি? কেন মারপিট করেছ?
ধ্রুব তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আরে, অত তাড়াতাড়ি সব কথার জবাব কী করে দেব? মারপিট করিনি, নিজেকে বাঁচাতে মেরেছি। তা বলে পালাব কেন?
কিন্তু সমীর যে বলল—
হ্যাং সমীর। আমার গায়ে হাত পড়লে জল অনেক দূর গড়াবে রেমি। তুমি শ্বশুরের কথা ভুলে যাচ্ছ!
তখন স্থির হল রেমি। সত্যিই তো। ঘটনার আকস্মিকতায় সে বিস্মৃত হয়েছিল যে তার শ্বশুর কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী। শুধু দার্জিলিং কেন, সারা দেশের সর্বত্রই তার প্রভাব ছড়ানো। তবু সে বলল, কিছু হবে না তো?
কী হবে?–বলে ব্যঙ্গের হাসি হেসে ধ্রুব বলে, বাবার কাছে অলরেডি ট্রাংক কল-এ খবর চলে গেছে। পুলিশ হেভি অ্যাকশন নিচ্ছে। কিছু ভেবো না রেমি, লিডারের ছেলে হতে কপাল লাগে।
সকালটা সুন্দর কেটেছিল রেমির। কিন্তু সেই সন্ধেবেলাই আবার ধ্রুবর মেজাজ পালটাল।
০১১. পিতার বাৎসরিক কাজ
পিতার বাৎসরিক কাজটি হেমকান্ত প্রতি বছর বেশ ঘটা করেই করেন। শখানেক ব্রাহ্মণকে ভোজন করানো হয় এবং ভালরকম দক্ষিণা ও অন্যান্য দানসামগ্রী দেওয়া হয়। ব্রাহ্মণ ছাড়াও আমন্ত্রিত সংখ্যা বড় কম হয় না।
