এ বছর হেমকান্ত একটু দ্বিধায় পড়লেন। আয় ভাল নয়। হিসেব করে যা দেখছেন তাতে এসটেট চালানোই যথেষ্ট কষ্টকর। এর ওপর বাড়তি কোনও খরচের বোঝা বইতে গেলে উপরি আয় চাই। প্রচলিত ও প্রথাসিদ্ধ অনুষ্ঠান কাটছাট করার ইচ্ছে হেমকান্তর নেই। বিশেষ করে বাবাব বাৎসরিকের প্রশ্ন যেখানে। অগত্যা তিনি রঙ্গময়িকে ডেকে পাঠালেন।
শোনো মনু, সুনয়নীর বেশ কিছু গয়নাগাটি আছে। সেগুলো কোথায় আছে আমি সঠিক জানি। মেয়েদের মহলে গিয়ে খোঁজ-খবরও করা যাবে না। খবরটা আমাকে এনে দিতে পারবে? গোপনে?
কেন, সুনয়নীর গয়নার খোঁজ করছ কেন?
দরকারেই করছি।
দরকারটা শুনি।
আহা, অত দারোগাগিরির কী আছে? গয়নাগুলোয় তো আমারও খানিকটা অধিকার আছে, না কী?
ওমা, তোমার নেই তো আছে কার? কিন্তু সুনয়নী একাল মরেছে, এ খোঁজটা এতদিন পরে করছ কেন?
বললাম তো দরকার আছে।
গয়না কোথায় আছে জানি। কিন্তু কী অবশিষ্ট আছে তা বলতে পারব না।
তার মানে? অবশিষ্ট কথাটা বললে কেন? চুরি-টুরি গেছে নাকি?
চুরি নয়। সুনয়নীই কিছু গয়না মেয়েদের আর বউদের ভাগ করে দিয়ে গিয়েছিল। আর যা ছিল তাও সব নেই। মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থেকে আসে, এটা ওটা নিয়ে যায়। বউরাও নিয়েছে।
হেমকান্ত বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে বলেন, গয়নার একটা হিসেব থাকা উচিত ছিল।
সুনয়নী অত হিসেবি মেয়ে ছিল না।
তোমার তো নিশ্চয়ই মনে আছে।
রঙ্গময়ি হেসে ফেলে বলে, গয়না তোমার বউয়ের আর তার হিসেব রাখতে হবে আমাকে?
হিসেব কি সত্যিই নেই?
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, না। তবে সুনয়নী আমাকে একজোড়া বালা আর একটা হার দিয়েছিল।
তোমাকে দেওয়া গয়নার কথা আসছে কেন?
আসছে, তার কারণ আছে। সুনয়নী কাউকে সাক্ষী রেখে গয়না দুটো আমাকে দেয়নি। আমি পরিও না। পরলে চোর-দায়ে ধরা পড়তে পারি। সেগুলো পড়ে আছে বাক্সে। তোমার গয়নার দরকার থাকলে নিতে পারো।
দূর, কী যে বলো।
রঙ্গময়ি একটু হাসল। প্রশান্ত গলাতেই বলল, তোমার মতো মানুষ বউয়ের গয়নার খোঁজ করছে এটা ভাবাই যায় না। ইদানিং কি খুব হিসেবি হয়েছ?
হলে দোষ কী?
দোষ তো নয়ই। বরং তুমি হিসেবি হলে আমি বাঁচি। কী দরকার বলো তো? বেচবে নাকি?
হেমকান্ত অস্বস্তি বোধ করে। প্রসঙ্গটা খুবই লজ্জাজনক। হেমকান্ত ঘরের সোনা বেচতে চান এটা পাঁচকান হলে গোটা পরিবারটারই মর্যাদার হানি। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, আরে না। হঠাৎ মনে হল, গয়নাগুলো গেল কোথায়?
সুনয়নীর ঘরে দেয়ালেব সিন্দুকে সব পাবে। তার চাবি আছে তোমার পড়ার ডেসকের ড্রয়ারে। ঠিক আছে।
একথাতে রঙ্গময়ি চলে গেল না। চুপ করে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গলাটা সামান্য নামিয়ে বলল, গয়না দিয়ে তুমি কী করবে জানি না। তবে আমি বলি, ও গয়না থেকে একটাও এদিক-ওদিক না করাই ভাল। তোমার হিসেব না থাক, তোমার মেয়ে আর বউদের আছে। কিছু সরালেই তারা টের পাবে।
হেমকান্ত বিস্মিত হয়ে বলেন, তারা টের পাবে? তা পাক না।
রঙ্গময়ি একটু বিব্রত হয়। একটু অপ্রতিভ হাসে। মৃদুস্বরে বলে, তুমি ভাবছ, তোমার বউয়ের গয়না, সুতরাং ওর ওপর তোমারই অধিকার।
তাই তো হওয়া উচিত, মনু।
উচিত তো অনেক কিছুই। কিন্তু ও গয়নায় হাত পড়লেই কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে। তোমার মেয়ে আর বউরা বনবেড়ালের মতো থাবা পেতে বসে আছে। পুজোর সময় কী কাণ্ড হয়েছিল তা তো জানো না।
কী কাণ্ড?
সে তোমার শুনে কাজ নেই। অন্দরমহলে অনেক কিছু হয়, সবটাই পুরুষের কানে না যাওয়া ভাল।
নিশ্চয়ই ঝগড়া?
হ্যাঁ, ভীষণ ঝগড়া। আর সেটা সুনয়নীর গয়না নিয়েই। তাই বলছিলাম হট করে গয়নায় হাত দিয়ো না।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মুখখানায় বিমর্ষতার ছায়াপাত ঘটল। হেমকান্ত বসেছিলেন নিজের শোওয়ার ঘরখানায় পূর্বাস্য হয়ে। মেঝের ওপর পুরু উলের গালিচা, তার ওপর একটা ছোট্ট ডেসকে প্যাড ও লেখার সরঞ্জাম সাজানো। সকালের বোদ এসে পড়েছে গালিচার ওপর। সেই আলোয় গালিচার অপরূপ রং ও নকশা ক্ষুরধার হয়ে উঠেছে।
হেমকান্ত গালিচার নকশার দিকে চেয়ে থেকে বললেন, কত ভরি গয়না আছে জানো?
না। তবে শুধু সুনয়নীরই বোধহয় হাজার ভরির মতো সোনা ছিল। এখন বোধহয় অত নেই।
ওরা কতটা নিয়েছে তা বোধহয় জানো না?
না। ওরা যখন সিন্দুক খোলে তখন আমি কাছে থাকি না।
তবে জানলে কী করে যে, নিয়েছে?
মেয়েমানুষ হচ্ছে হীন জীব।
হেমকান্ত হাঁ করে চেয়ে থেকে বললেন, একথাটার মানে বুঝলাম না।
রঙ্গময়ি হেসে বলে, মানে কি ছাই আমিই জানি! মেয়েমানুষের লেখাপড়া নেই, চিন্তাভাবনা নেই, তাদের মন আর চোখ সবসময়েই সংসারের আস্তাকুঁড় খুঁটছে। তাই তারা খবর রাখে।
তুমি কি সেইরকম মেয়েমানুষ?
তবে আর কীরকম?
হেমকান্তর একবার ইচ্ছে হল সচ্চিদানন্দর চিঠিটা রঙ্গময়িকে দেখান। কিন্তু সেই চিঠিতে তো শুধু রঙ্গময়ির প্রশংসাই নেই, তাঁকে এবং রঙ্গময়িকে জড়িয়ে এমন সব ইঙ্গিত আছে যা পড়লে রঙ্গময়ি হয়তো-বা গলায় দড়ি দেবে। হেমকান্ত রঙ্গময়ির দিকে এই সকালের আলোয় চেয়ে দেখলেন ভাল করে।
সচ্চিদানন্দ মিছে বলেনি। ধারালো এক ব্যক্তিত্ব রঙ্গময়িকে এই ভরা যৌবনে ভারী বিশিষ্ট করে তুলেছে। ব্যক্তিত্বটা কী ধরনের তা অবশ্য জানেন না হেমকান্ত। কারণ রঙ্গময়ি তার প্রতিদিনকাব দেখা ও জানা একটি মানুষ। এত কাছের মানুষের মধ্যে ধরা-ছোঁয়ার বাইরের কোনও গুণ আছে কি না তা টের পাওয়া কঠিন। তবু সচ্চিদানন্দর চিঠিটা পাওয়ার পর থেকে রঙ্গময়িকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করছেন হেমকান্ত। কিন্তু পুরনো চোখ সব গণ্ডগোল করে দিচ্ছে। হেমকান্ত বললেন, নিজের সম্পর্কে তুমি যা ই বলো, লোকে কিন্তু অন্য কথা বলে।
