সমীর একটু ভেবে বলল, আপনি যদি অনুমতি দেন তবে কাল সকালে আমি ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলে দেখতে পারি। তবে উনি খুব গম্ভীর। কাল থেকে বহুবার কথা বলার চেষ্টা করেছি। উনি তেমন ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছেন না।
তবু আপনি একটু কথা বলে দেখবেন। তবে দয়া করে আমার রেফারেন্স দেবেন না। তাহলে চটে যাবে।
আরে না না, আমি অত বোকা নই। আপনাকে আড়াল করাই তো আমার উদ্দেশ্য।
রেমি মৃদুস্বরে বলল, আমার খুব ভয় করছে দার্জিলিং বেড়াতে এসে।
কীসের ভয়?
আমার মনে হচ্ছে কর্তাটি অ্যাবনরম্যাল। যে-কোনও সময়ে আমার কথা ভুলে গিয়ে হয়তো আমাকে ছেড়েই কোথাও চলে যাবে।
ধ্রুববাবু কি এতই ইরেসপনসিবল?
হ্যাঁ। আপনি ধারণা করতে পারবেন না। আসার সময় বর্ধমান স্টেশনে এমন একটা কাণ্ড করেছিল যে আমার ভিতরে একটা ভয় ঢুকে গেছে। আমি ওকে বিশ্বাস করি না।
সমীর খুব হালকা গলায় বলল, আপনার মতো মেয়েকে ভুলে গিয়ে বা ফেলে রেখে কি যাওয়া যায়?
সমীরের এই ভুতিটুকু তার ভালই লাগল। সে বলল, আমি এমন কিছু না।
সে আপনি জানেন না। আমরা জানি। কিন্তু ধ্রুববাবু অ্যাবনরম্যাল, এটা কি ঠিক জানেন?
জানি। ওর সবচেয়ে বেশি রাগ ওর বাবার ওপর।
কেন বলুন তো! কৃষ্ণকান্তবাবুকে আমি চিনি। দারুণ লোক।
শ্বশুরমশাইয়ের তুলনা হয় না। তবু ও ওর বাবাকে দেখতে পারে না। সেটাই অস্বাভাবিক।
জেলাসি নয় তো!
কে জানে কী। এ প্রসঙ্গটা বাদ দিন।
সরি। দার্জিলিং আপনার কেমন লাগছে?
ভাল।
ধ্রুববাবু নরম্যাল থাকলে আরও ভাল লাগত।
সেটা ঠিক। তবে যতটা খারাপ লাগার কথা ছিল এখন ততটা খারাপ লাগছে না।
এ হচ্ছে কথার পিঠে কথার খেলা। কিন্তু রেমি বাস্তবিক কথার খেলা জানে না। সে যা বলেছিল তা অকপট মন থেকে উঠে আসা কথা। সত্যিই তো তার খারাপ লাগছিল না।
তারা যখন হোটেলে ফিরল তখন দার্জিলিং-এর নিয়ম অনুযায়ি অনেক রাত। রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ জনশূন্য। হোটেলেও দু-চারজন মদ্যপায়ি ছাড়া বাকি সবাই ঘরে দোর দিয়েছে।
ফাঁকা ডাইনিং হল-এ বসে রেমি আর সমীর বাতের খাবার খেলা খেতে খেতে রাত গড়িয়ে দিল অনেকটা। কথা আর শেষ হতে চায় না। ধ্রুবর সঙ্গে সাতদিনে যত কথা না হয় তার চেয়ে ঢের বেশি সেই কয়েক ঘণ্টায় হল সমীরের সঙ্গে রেমির। খাওয়ার পর লাউজে ইলেকট্রিক হিটারের সামনে নরম সোফায় কম্বলমুড়ি দিয়ে বসেও অনেকক্ষণ সময় কাটাল তারা।
তারপর একসময়ে রেমির মনে হল, এবার ঘরে যাওয়া দরকার। হোটেলে কেউ আর জেগে নেই। ধ্রুবকেও অনেকক্ষণ একা রাখা হয়েছে।
সে অনিচ্ছার সঙ্গে বলল, এবার যাই।
আরে বসুন বসুন, সবে তো সন্ধে।
এইভাবে যাই-যাই করে কাটল আরও কিছু সময়। যখন বাস্তবিকই ঘরে এল রেমি তখন রাত পৌনে একটা।
ধ্রুব তখনও অচেতন। রেমির অনেকক্ষণ ঘুম এল না। কেমন একটা উদভ্রান্ত উত্তেজনায় বুক কাঁপছে। বারবার শিহরিত হচ্ছে সর্বাঙ্গ। এরকম তার আগে কখনও হয়নি। এমনকী ফুলশয্যার রাতেও নয়। নিজেকে বহুবার ধিক্কার দিল সে। তারপর ঠাকুর-দেবতার পায়ে মাথা কুটতে লাগল মনে মনে, আমাকে রক্ষা করো। এ আমার কী হল? কেন হল? ছিঃ ছিঃ।
পরদিন ধ্রুবর ঘুম ভাঙল বেলায়। গভীর হ্যাংওভার। ভাল করে তাকাতে পারছে না। মাথা ধরা, বমি-বমি ভাব।
রেমি তীব্র বিরাগের সঙ্গে বলল, এটা কী ধরনের হানিমুন হচ্ছে আমাদের?
ধ্রুব মাথা চেপে ধরে আধশোয়া অবস্থায় তার দিকে চেয়ে বলল, কে বলেছে হানিমুন? এটা হল একসাইল। কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীর পলিটিক্যাল ফিলড থেকে ধ্রুব চৌধুরীকে সরিয়ে দেওয়া। শুধু দেখাশোনা করার জন্য সঙ্গে তুমি।
তাই নাকি?
একজ্যাক্টলি তাই। যাও একটা হেভি ব্রেকহার্স্ট অর্ডার দিয়ে এসো। আর আমাকে ধরে একটু বাথরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে যাও।
স্নান এবং ছোট হাজরির পর কিন্তু ছিপছিপে তেজি চেহারার ধ্রুবকে আবার বেশ তরতাজা দেখাচ্ছিল। নিজেই পোশাক-টোশাক পরল। বলল, চলো, একটু ঘুরে আসি।
হঠাৎ ভূতের মুখে যে বড় রাম নাম!
ধ্রুব একটু হেসে বলে, চলল, দেখা যাক একসাইলটাকে হানিমুন করে তোলা যায় কি না।
সত্যি নাকি?
একটা দীর্ঘশ্বাসকে চাপা দিল রেমি। ভিতরকার উত্তেজনায় সারা রাত সে এপাশ ওপাশ করেছে। পাপবোধ তাকে ছিঁড়ে খেয়েছে। ধ্রুবর সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার শারীরিক বা মানসিক শক্তিতে তখন টান ধরেছে।
সে বলল, আমি হাঁটতে পারব না।
হাঁটতে হবে না। হোটেল থেকে একটা গাড়ি ম্যানেজ করা যাবে।
রেমি একটু তটস্থ হয়ে বলে, হোটেলের গাড়ি দরকার নেই। কালকের সেই জিপগাড়িটাই তো আছে।
কোন জিপগাড়িটা?
যেটায় আমরা এলাম। সমীরবাবুও আছেন।
কে সমীরবাবু? সুদর্শনকাকার ভাইপো?
অকারণে লাল হয়ে এবং মুখ নামিয়ে রেমি বলল, হ্যাঁ। তোমার ওই অবস্থা দেখে উনি আর কাল ফিরে যাননি।
ধ্রুব ভ্রু কুঁচকে বোধহয় সেকেন্ড দুই রেমির দিকে চেয়ে রইল। আর রেমির তখন মনে হল, ধ্রুব তার ভিতরকার সব দৃশ্য দেখে ফেলছে। কী যে অস্বস্তি! সে তাড়াতাড়ি উঠে সাজপোশাকে একটু সংশোধন শুরু করে দিল।
ধ্রুব বলল, সুদর্শনকাকার মেজো মেয়েটার নাম যেন কী!
ছন্দা। কেন বলো তো?
ওই ছন্দার সঙ্গে বোধহয় সমীরের একটা আনহেলদি রিলেশন আছে।
রেমি ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠে বলে, যাঃ, কী যে বলো না!
ধ্রুব একটু অপ্রতিভ হয়ে বলে, অবশ্য আমার ভুলও হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল।
ওরা আপন খুড়তুতো জ্যাঠতুতো ভাইবোন, সে কথাটা ভুলে যেয়ো না।
