সমীর বলল, শিলিগুড়ি এখন ওয়েস্ট বেঙ্গলের সেকেন্ড সিটি। কলকাতার পরই শিলিগুড়ি।
কলকাতা-গরবিনী রেমি বলল, আহা রে, কলকাতার সঙ্গে টক্কর দেওয়া অত সস্তা নয় মশাই। শিলিগুড়িকে সাত জন্ম তপস্যা করতে হবে।
সমীর ছ্যাবলা নয়। একথার জবাবে মৃদু একটু হাসল মাত্র। হুড খোলা জিপগাড়িটা চালাচ্ছিল সে-ই। চোখে গগলস। কিছুক্ষণ বাদে সেই গগলসের ভিতর দিয়ে রেমির দিকে চেয়ে বলল, কলকাতা শুধু আপনারই নয় কিন্তু, আমাদেরও।
তাই নাকি?
যে-কোনও বাঙালিকেই জিজ্ঞেস করুন। নোংরা হোক, ঘিঞ্জি হোক, কলকাতার নিন্দে করলে যে-কোনও বাঙালি চটে যায়। আমি আরও বেশি চটি। কারণ কলকাতাকে আমার মতো করে কেউ আবিষ্কার করেনি। আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে কলকাতা।
রেমি বলল, তবু ভাল। আমি ভাবলাম আপনি বুঝি শিলিগুড়িকে তোল্লাই দিতে গিয়ে কলকাতাকে ছোট করছেন।
মোটেই নয়।
নন্দা বলল, সমীরদা অসম্ভব কলকাত্তাই। ছুটি পেলেই পালাবে। আমাদের তো বাবা সল্টলেকে অত বড় বাড়ি পড়ে আছে। কিন্তু আমার গিয়ে বেশিদিন থাকতে ইচ্ছে করে না।
ছন্দার অবশ্য অন্য মত। সে বলে, না বাবা, আমার কলকাতাই ভাল লাগে।
সেদিন তারা রেস্টুরেন্টে খেল, চোরাই হংকং মার্কেটে ঘুরে ঘুরে বিদেশি শাড়ি আর কসমেটিকস কিনল, সেভক রোড ধরে চলে গেল কালিঝোড়া পর্যন্ত। আর তারই ফাঁকে চারজনের টিমটা আরও আঠালো হয়ে উঠল।
পরদিন সেই চারজন এবং ধ্রুব একটা জোঙ্গা জিপগাড়িতে গেল দার্জিলিং। সমীর পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছিল বলে বেশি কথা বলছিল না। তার পাশে বসা ধ্রুবও চুপচাপ। কলকল করছিল শুধু তিন যুবতী পিছনের দিকে বসে। একান্ন মাইল রাস্তা টেরই পাওয়া গেল না।
কিন্তু মুশকিল হল বিকেলবেলা, যখন রেমি আর ধ্রুবকে দার্জিলিং-এ রেখে ওরা ফিরে আসবে। কারণ ধ্রুব হোটেলে ঢুকেই বার-এ সেঁটে বসে গিয়েছিল। বিকেল নাগাদ সে চুরচুর মাতাল। সুতরাং নন্দা, ছন্দা আর সমীর যদি শিলিগুড়ি ফিরে আসে তাহলে রেমি একা পড়ে যায়। এই অনাত্মীয়
শহরে একা একটি যুবতী মেয়ের কেমন কাটবে?
ধ্রুবকে সুদর্শনবাবুর হোটেলে রেখে তারা চারজন একটু বেড়াতে বেরিয়েছিল। ধ্রুব যেতে চায়নি বলেই তাকে নেওয়া হয়নি। বেড়িয়ে ফেরার পর ধ্রুবর অবস্থা দেখে সমীর মুখে আফসোসের চুকচুক শব্দ করে বলল, ম্যাডাম তো খুব অসুবিধেয় পড়বেন দেখছি। ধ্রুববাবু তো আউট।
ভয়ে বুক ঢিবঢিব করছিল রেমির। শুষ্ক গলায় সে বলল, আপনারা প্লিজ যাবেন না। ওর যদি কিছু হয় তাহলে কে দেখবে?
সমীর তার দিকে চেয়ে একটু হেসে বলে, ওর কিছু হবে না। বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দিলেই রাত কেটে যাবে। ভয় আপনাকে নিয়ে। আপনার রক্ষক তো কেউ থাকছে না।
নন্দা আর ছন্দাও অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। তারা বুঝতে পারছিল রেমিকে এই অবস্থায় ফেলে যাওয়াটা ঠিক নয়। কিন্তু তাদেরও ফেরা দরকার। ছন্দার কলেজ আছে। নন্দারও কী সব এনগেজমেন্ট। খানিকক্ষণ শলা-পরামর্শের পর ঠিক হল, সমীর থেকে যাবে। দুই বোন ফিরে যাবে শিলিগুড়ি। তাদের ফিরতে কোনও অসুবিধে নেই। সুদর্শনবাবুর হোটেলেরই নিজস্ব গাড়ি তাদের পৌঁছে দিয়ে আসবে।
কিন্তু রেমি আজ জানে, সমীরেরও থেকে যাওয়ার কোনও দরকার ছিল না। সেই সুন্দর ছিমছাম হোটেলটির মালিক স্বয়ং সুদর্শনবাবু। হোটেলের বশংবদ কর্মচারীরা তাদের ভালই দেখাশোনা করতে পারত। সুতরাং সমীরের ওই কথাটা আপনার রক্ষক তত কেউ থাকছে না ঠিক নয়।
কিন্তু বলতে নেই, সমীর থাকায় রেমির বুকের মধ্যে এক আনন্দের খামচাখামচি শুরু হয়েছিল। সেই অবোধ রহস্যময় অনুভূতির কোনও মানে হয় না। এত বেহায়া বেহেড রেমি বিয়ের আগেও ছিল না কোনওদিন। কিন্তু মাতাল ধ্রুবই কি তাকে ঠেলে দিয়েছিল ওই অসামাজিক এক সম্পর্ক শুরু করার রাস্তায়?
নন্দা আর ছন্দা চলে যাওয়ার পর ধ্রুবকে বিছানায় পৌঁছে দেওয়া হল। একজন বেয়ারা মজুত থাকল ঘরে। নিঃসাড়ে ঘুমোতে লাগল ধ্ৰুব।
সমীর বলল, চলুন সেকেন্ড রাউন্ড বেড়িয়ে আসি। ভাল করে ঢাকাটুকি দিয়ে নিন। দারুণ। শীত।
জোঙ্গা গাড়িটায় আবার দুজনে বেরোল। তখন সন্ধের পর রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা, ম্যাল প্রায় জনশূন্য, মেঘ করে হঠাৎ একটু বৃষ্টি পড়ছে। রেমির তবু খারাপ লাগছিল না। বুকটা একটু কেমন করছিল। বারবার মনে হচ্ছিল এবার একটা কিছু হবে, কিছু ঘটবে, জীবনে একটা মোড় ফিরবে।
আস্তে আস্তে গাড়িটা বিভিন্ন চড়াই-উতরাই ভেঙে চালাচ্ছিল সমীর। কোথাও যাচ্ছিল না। উদ্দেশ্যহীন চলা।
জিজ্ঞেস করল, ধ্রুববাবু সম্পর্কে আমি খুব বেশি কিছু জানি না। কিন্তু শুনেছি এক সময়ে উনি খুব ব্রাইট বয় ছিলেন। এরকম কবে থেকে হল? ইজ হি ফ্রাষ্ট্রেটেড?
রেমি তার কী জানে? সে মৃদুস্বরে বলল, আমি তো বিয়ের পর থেকেই এরকম দেখছি। আগে কীরকম ছিল জানি না।
আপনি নিশ্চয়ই খুব লোনলি ফিল করেন!
সেটা কি আর বলতে হবে!
উনি খুবই ইয়ং। বয়সে বোধহয় আমার চেয়েও ছোট। এই বয়সে এত ডিপ ফ্রাষ্ট্রেশন আমি দেখিনি কারও। এঁর সঙ্গে আপনি ঘর করবেন কী করে?
সেটাই তো ভাবছি।
ভাবছেন? যাক বাঁচালেন। প্রশ্নটা করেই আমি মনে মনে জিব কাটছিলাম, অনধিকার চর্চা হয় গেল ভেবে।
রেমি ম্লান একটু হেসে বলল, অত ফরমাল হওয়ার দরকার নেই। আমি ভীষণ প্রবলেমের মধ্যে আছি। এই সময়ে আমার একজন বন্ধু দরকার যে গাইডেনস দিতে পারবে। আমি আপনার পরামর্শ চাই। ওকে নিয়ে কী করব বলুন তো?
