তোমার কাকা।—ফিসফিস করে হরনাথ বলে।
কিন্তু কৃষ্ণকান্ত লক্ষ করেছে, দরজাটায় তালা দেওয়া নেই। এ ঘরটায় সর্বদাই তালা দেওয়া থাকে। ভিতরের কণ্ঠস্বর যদি নলিনীকান্তর প্রেতাত্মারই হয় তবে দরজার তালাটা খোলবার দরকারই হত না। নিশ্চয়ই কেউ আছে।
আবার সে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল।
সেই শব্দে লোক জড়ো হতে দেরি হল না। গগন মুহুরি বলল, ও ঘরে একজন অতিথি আজ দুপুর থেকে আছে। কর্তাবাবু তার ওপর নজর রাখতে বলেছেন।
কৃষ্ণকান্ত একটু রাগের গলায় বলল, নোকটা দরজা খুলছে না কেন? কে লোকটা?
গগন মাথা চুলকে বলল, আমরা চিনি না। তবে পাগলের মতো চেহারা।
কৃষ্ণকান্ত আরও কয়েকবার দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, লোকটার বোধহয় অসুখ করেছে। দরজাটা ভাঙতে হবে।
খবর পেয়ে হেমকান্তও দরজা ভাঙার হুকুম দিলেন। ভিতরে ঢুকে দেখা গেল, শশিভূষণের জ্ঞান নেই। গায়ে প্রবল জ্বর।
রঙ্গময়িকে কিছু বলতে হয় না। সে চট করে পুকুর থেকে এক বালতি জল নিয়ে এসে সযত্নে মাথা ধুইয়ে দিয়ে জলপটি দিতে লাগল কপালে। কুমুদ ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে বলে গেল, খারাপ ধরনের ম্যালেরিয়া। মাথায় রক্তের চাপ প্রবল।
কৃষ্ণকান্ত জনে জনে জিজ্ঞেস করেও লোকটার নাম ছাড়া আর কিছুই জানতে পারল না। শশিভূষণের বয়স প্রতুল মাস্টারমশাইয়ের সমান। কিন্তু চেহারাটা একদম মড়ার মতো শুটকো সাদা। গালে দাড়ি। লম্বা লম্বা চুল।
মনু পিসি, লোকটা কি পাগল?—সে রঙ্গময়িকে জিজ্ঞেস করল।
রে, দুদিন আমরাগানে লুকিয়েছিল। খায়-দায়নি। তাই ওরকম দেখাচ্ছে।
লুকিয়ে ছিল কেন?
শুনছি তো, পুলিশে নাকি তাড়া করেছিল।
কেন তাড়া করেছিল?
স্বদেশি করত যে!
এটা আর বুঝিয়ে বলার দরকার হয় না কৃষ্ণকান্তকে। স্বদেশিদের সে খানিকটা চেনে। তবে ভাল চোখে দেখে না। সে বলল, তা হলে পুলিশে খবর দিচ্ছ না কেন?
ওরে চুপ, চুপ! পুলিশ এলে তোর বাপেরও রেহাই নেই। ওসব বলিস না। তোকে বলাই ভুল হয়েছে দেখছি।
কৃষ্ণকান্ত জিজ্ঞেস করল, কোন আমরাগানে? বাড়ির পিছনেরটা?
তাই তো শুনছি।
ওখানে ছিল লোটা? দুদিন?
হ্যাঁ।
মশা কামড়ায়নি?
তা আর কামড়ায়নি! সারা গায়ে তো দেখছি দানা দানা হয়ে আছে।
কিছু খায়ওনি?
কী খাবে? শীতকালে কি আর আমরাগানে আম পাওয়া যায়?
লোকটার দিকে আর-একবার ভাল করে চেয়ে দেখল কৃষ্ণকান্ত। চেহারাটা তার পছন্দ হল না ঠিকই। তবে যে-লোক দুদিন না খেয়ে আমরাগানে লুকিয়ে থাকতে পারে তাকে একটু শ্ৰদ্ধা না করে উপায় কী?
০১০. রেমি
দিশাহারা রেমি অবিশ্বাসের চোখে ধ্রুবর দিকে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তার সন্দেহ, ধ্রুব স্বাভাবিক মানুষ নয়। হয় পাগল, না হয় পয়লা নম্বরের বদমাশ। তবু মাঝরাস্তায় এই লোকটির সঙ্গে গোলমাল বাঁধিয়ে লাভ নেই। রেমির চোখে তখন জল এসে গেছে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে বলল, চলো শিগগির। তোমার পায়ে পড়ি। ট্রেন ছেড়ে দেবে।
ধ্রুব ম্যাগাজিনটা বগলদাবা করে ধীরে সুস্থে দাম মেটাল। তারপর বলল, চলো। কিন্তু একটা কথা বলে দিচ্ছি। অবাধ্যতা কোরো না। আমার কিন্তু কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই।
তারা কামরায় ফেরার পর গার্ড সাহেব একবার হানা দিয়েছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণকান্তর ছেলে বলে পরিচয় পাওয়ায় জল আর বেশিদূর গড়ায়নি। এমনকী জরিমানা পর্যন্ত দিতে হয়নি তাদের।
শিলিগুড়ি পর্যন্ত বাকি রাস্তাটা ধ্রুব আর গোলমাল করেনি। কারণ প্রচুর মদ খেয়ে সে একদম অচেতন অবস্থায় গাড়ির মেঝেয় পড়ে থেকেছে। একবার টেনে হিচড়ে তাকে সিটে তুলে শুইয়েছিল রেমি। দশ মিনিটের মাথায় আবার সে দড়াম করে মেঝেয় পড়ে যায় এবং পড়েই থাকে। রেমি আর তাকে তোলার সাহস পায়নি। পড়ে গিয়ে যদি ঘাড় বা হাত-পা ভাঙে?
কৃষ্ণকান্তর বন্ধু সুদর্শন রায় শিলিগুড়ির মস্ত ধনী লোক। তার চা বাগান, কাঠের ব্যাবসা, নিউ মার্কেটে বাহারি দোকান, কী নেই? দার্জিলিং-এ তার একটা ভাল হোটেলও আছে। সেই সুদর্শনবাবু গাড়ি নিয়ে স্টেশনে হাজির ছিলেন। সোজা তাদের নিয়ে তুললেন হাকিমপাড়ায় নিজের
প্রকাণ্ড বাড়িতে। বললেন, দার্জিলিং তো যাবেই। একদিন এখানে রেস্ট নিয়ে যাও।
ধ্রুব একটু গাঁইগুঁই করেছিল বটে, কিন্তু থেকেও গেল।
ওই একটি দিন রেমির বড় চমৎকার কেটেছিল। সুদর্শনবাবুর দুটি যুবতী মেয়ের সঙ্গে তার ভীষণ ভাব হয়ে গেল। বড়লোকের মেয়ে বলে কোনও দেমাক-টেমাক নেই, কিংবা তা রেমিকে দেখায়নি। সেই সঙ্গে জুটে গেল সুদর্শনবাবুর ভাইপো সমীর। যেমন ঝকঝকে চেহারা তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত তার চালচলন আর কথাবার্তা। তারা চারজনে মিলে চমৎকার একটা টিম হয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি যে কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে পারে তা রেমির অভিজ্ঞতায় ছিল না। সম্ভবত দায়িত্ব ও কাণ্ডজ্ঞানহীন ধ্রুবর কাছ থেকে ধাক্কা খেয়েই রেমির মধ্যে একটা ভয় ও নিঃসঙ্গতার বোধ জন্ম নেয়। তাই এই তিনটি স্বাভাবিক, প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা যুবক-যুবতীকে পেয়ে সে আঁকড়ে ধরল। সেই টিমে ধ্রুব ছিল না। কারণ আগের দিনের অঢেল মদ তখন তার ওপর শোধ নিচ্ছে, দারুণ মাথা ধরা, বমির ভাব ও দুর্বলতায় আচ্ছন্ন হ্যাংওভার কাটাতে সে সারাদিনটাই প্রায় বিছান! আলিঙ্গন করে রইল।
নন্দা, ছন্দা আর সমীরের সঙ্গে রেমি বেরোল শহর দেখতে। কী সুন্দর শহরটি। খানিকটা কলকাতার সঙ্গে খানিকটা গ্রাম মেশালে যেমন হয় আর কী। শহর ঘেঁষে একটি পাহাড়ি নদী বয়ে যাচ্ছে। মহানন্দা। উত্তরে মহান হিমালয়।
