কিন্তু জোর করে নিয়ে গেলে কী করব?
তুমি জোর করেই এখানে থেকে যাবে।
কৃষ্ণকান্ত একথায় হেসে উঠে বলল, হরদা, তুমি সত্যিই পাগলা। বাবা যদি বলে, ওরে কৃষ্ণ, কনকের সঙ্গে কলকাতায় যা, তা হলে কী হবে?
তুমি লুকিয়ে থেকো। আমি তোমাকে একটা জায়গা দেখিয়ে দেব। কেউ খুঁজে পাবে না তোমাকে।
কৃষ্ণকান্ত সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহলী হয়ে বলে, আছে সেরকম জায়গা?
অনেক আছে। কেউ খুঁজে পাবে না। জায়গাটা দেখাবে আমাকে?
হরনাথ মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখছিল কৃষ্ণকান্তকে। এ ছেলে ভবিষ্যতে খুব বড় কেউ একজন হবে। চোখের দৃষ্টি এই বয়সেই কী গভীর! কেমন ধারালো চেহারা। সে বলল, দেখাতে পারি। তবে একটু ভয়ের জায়গা।
ভয়! কীসের ভয়?
ওখানে আরও একজন থাকে কিনা।
সে কে?
তোমার কাকা। নলিনীকান্ত।
কী যে বলো! কাকা তো বেঁচে নেই।
তা না থাক, মরে তো আছে।
তার মানে?
হরনাথ নির্বিকার গলায় বলে, নলিনীবাবুর ঘরে এখনও নলিনীবাবু থাকেন।
কৃষ্ণকান্তর গায়ে একটু কাটা দিল। হরনাথের কাছ ঘেঁষে বসে সে বলল, সত্যি বলছ?
তিন সত্যি। মাঝরাতে সাইকেল চালিয়ে আসেন। ঘরে ঢোকেন। সব টের পাই।
কখনও দেখেছ?
দু-একবার। আমি তার সাড়া পেলেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। রোজ দেখতে পাই না অবশ্য। তবে দুবার দেখেছি। একবার আমাকে ইশারায় কাছেও ডাকেন।
তুমি কাছে গেলে?
গিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর আর কিছু দেখতে পেলাম না।
ও বাবা! ও ঘরে আমাকে লুকিয়ে থাকতে বলছ?
ভয় পেয়ো না। উনি তোমার কাকা হতেন। তোমার কোনও ক্ষতি করবেন না। বরং ভালই করবেন। ওদের ভয় পেতে নেই। আমাদের যেমন একটা জগৎ আছে, ওদেরও তেমনি একটা আলাদা জগৎ আছে।
তুমি ভূত দেখতে পাও?
খুব দেখতে পাই। তোমার মাকেও মাঝে মাঝে দেখি, ভিতরের দরদালানের জানালায় দাঁড়িয়ে দুপুরবেলা চুল শুকোচ্ছেন। কাল যখন বিকেলে তুমি ঘোড়া চালাচ্ছিলে তখন উনি এসে সামনের। গাড়িবারান্দার ছাদে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে দেখছিলেন তোমাকে।
কৃষ্ণকান্ত খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল হরনাথের সঙ্গে। বলল, মা আমাকে কেন দেখছিল?
দেখবে না? ছেলে বলে কথা! তোমাকে একটুখানি দেখে চলে গেছেন, এখন তুমি কত বড়টি হয়েছ। ঘোড়া চালাও, ইস্কুলে যাও, ফুটবল খেলল। মা তাই দেখতে আসেন।
ভয়-ভয় করলেও কৃষ্ণকান্তর ঘটনাটা খারাপ লাগল না। মার কথা তার মনেই নেই। তবু মা যে চোখের আড়ালে এখনও আছে সেটা ভাবতে ভালই লাগে।
হরনাথ অস্ফুট গলায় বলে, দুলিকেও দেখি। জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে শাক তোলে। আঁচলে মাছ ধরে। কখনও ঘরেও আসে। আমার মাথার কাছটিতে চুপ করে বসে থেকে আবার চলে যায়।
তবে যে প্রতুল মাস্টারমশাই বলে, ভূত বলে কিছু নেই।
কী জানি। আমি তো সব স্পষ্ট দেখি। এই যেমন তোমাকে দেখছি। তবে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা হয় না।
আমার মাকে দেখাবে? আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে।
দেখা কি আর না যায়? চেষ্টা থাকলে, ইচ্ছে থাকলে দেখা যায়ই। দুলি মরার পর আমি কেবল দিনরাত তাকে ভাবতাম আর কাঁদতাম। ভাবতে ভাবতে আর কাঁদতে কাঁদতে মাথাটা কেমন গণ্ডগোল হয়ে গেল। তারপর থেকে সব দেখতে পাই। কোকাবাবু যেদিন মারা গেলেন-..
সেদিন কী?
সেদিন তাঁকেও দেখেছি। সন্ধেবেলা ব্রহ্মপুত্রের জলে নেমে স্নান করলেন। সুন্দর একটা পিনিস এল। তাইতে উঠে কোথায় চলে গেলেন।
কৃষ্ণকান্ত একটু কাঠ কাঠ হয়ে গেল ভয়ে।
চারদিক অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। শেয়াল ডেকে উঠল। উত্তরের হাওয়া এল অদ্ভুত এক হাহাকারের শব্দ নিয়ে।
হরনাথ উঠে বলল, চলো, লুকিয়ে থাকার জায়গাটা তোমাকে দেখিয়ে দিই।
কৃষ্ণকান্ত ভয় পায় বটে, কিন্তু ভয়ে কুঁকড়ে যায় না, ভেঙেও পড়ে না। তার ভিতরে এক অফুরন্ত কৌতূহলই তাকে ভয়ের মুখেও এক ধরনের সাহস দেয়। সে উঠে বলল, কোথায় যাবে? কাকার ঘরে?
কাকার ঘরেই। তবে তার মধ্যেও একটু ব্যাপার আছে। চলো দেখাচ্ছি।
দুজনে আবছা অন্ধকারে টানা বারান্দা ধরে কাছারিঘর ছাড়িয়ে ভিতর দিকে হাঁটতে থাকে।
সারি সারি ঘর। এত ঘর কোনও কাজে লাগে না। এক সময়ে এই কাছারিবাড়িতে বিস্তর লোক কাজ করত। আজকাল জমিদারির আয় কমেছে। লোকজনও কমে গেছে। গোটা চারেক বড় বড় মোকদ্দমায় হেরে গেছেন হেমকান্ত, কেবল তদবিরের অভাবে। এখন শোনা যাচ্ছে, বড় ভাই বরদাকান্তর স্ত্রীও সম্পত্তির অংশ চেয়ে মামলা করবে। হেমকান্ত এসব বৈষয়িক ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামান না। তার কর্মচারীরাও তার কানে সব কথা তোলে না। কিন্তু এই মস্ত জমিদারিতে যে অলক্ষ্মীর সঞ্চার ঘটেছে তাতে সন্দেহ নেই। এই শূন্য ঘরগুলো তারই আগাম ইঙ্গিত বহন করছে।
নলিনীর বন্ধ দরজার সামনে এসে হরনাথ দাঁড়ায়। দরজায় কান পেতে কী একটু শোনে। তারপর ফিসফিস করে বলে, ওই শোনো। নলিনীবাবুর গলা!
আচমকা কৃষ্ণকান্তও শুনতে পেল, ঘরের মধ্যে একটা গলা বিকট স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ভূত! ভূত!
কুয়াশামাখা অন্ধকারে ভুতুড়ে ছায়া ধীরে ধীরে গড়িয়ে আসছে চারদিক থেকে। বাস্তব হারিয়ে যাচ্ছে এক রহস্যময় কুহেলিকায়। ব্রহ্মপুত্রের বুক থেকে আঁশটে গন্ধ বয়ে নিয়ে হু হু করে উত্তরে হাওয়া এল। কাছে পিঠে ডেকে উঠল একশো শেয়াল।
ভয় পাওয়ারই কথা। শশিভূষণকে যখন ধরে আনা হয় তখন কৃষ্ণকান্ত ইস্কুলে। তাই ঘটনাটার কথা সে জানে না। কৃষ্ণকান্ত একবার ভাবল, দৌড় দেবে। কিন্তু জানার কৌতূহলও তার অসীম। সে দরজায় দমাদম ঘা দিয়ে বলল, কে? কে ভিতরে?
