বুড়ো সহিস লণ্ঠন হাতে এসে দাঁড়িয়ে আছে মাঠের মধ্যিখানে। ঘোড়র পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে।
ও ছোটকর্তা, এবার নামো। ঘোড়ার মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। আর না।
কৃষ্ণকান্ত ঘোড়া থামায়। হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বসে হরনাথের পাশে। বলে, ওফ, দারুণ চালিয়েছি আজ। না, হরদা?
খুব।
দুজনেই চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকে। কুয়াশা এবং অন্ধকার ঘনিয়ে ওঠে। মন্দির থেকে শঙ্খধ্বনি আসে।
কৃষ্ণকান্তর সত্যিকারের কোনও অভিভাবক নেই। হেমকান্ত তার প্রতি নজর দেন না। কেউই দেয় না। মাঝে মাঝে রঙ্গময়ি একটু-আধটু ডাক খোঁজ করে মাত্র। কৃষ্ণকান্ত বেড়ে উঠছে নিজের মতো করেই। সময় মতো লেখাপড়া করা আর ইস্কুলে যাওয়া ছাড়া বাদবাকি সময়টা সে কী করে বেড়ায় তার খোঁজ কেউ নেয় না। সুতরাং নানা সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড করে সে। তিনতলার চোর-কুঠুরিতে পুরনো আমলের কিছু অস্ত্রশস্ত্র আছে। সেই ঘর থেকে একদিন একটা তরোয়াল বের কবে এনেছিল কৃষ্ণকান্ত। সারাদিন খোলা তরোয়াল হাতে করে ঘুরে বেড়াল। কয়েকজন অবশ্য বারণ করেছিল, সে শোনেনি। বস্তুত হেমকান্ত ছাড়া আর কারও কথা শোনে না সে। ফয়জলের গোটা দুই ছাগল আর ছানাপোনারা রোজই ঘাস খেতে আসে বারবাড়ির পশ্চিম দিককার গোচর-ভূমিটায়। কখন যে কৃষ্ণকান্ত সেখানে হাজির হয়েছে তা কেউ জানে না। হঠাৎ তার আর্তনাদ শুনে লোকজন ছুটে গিয়ে দেখল ধাড়ি ছাগলটার মুন্ডু খসে পড়ে আছে মাটিতে, ধড়টা ছটফট করছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। কৃষ্ণকান্ত রক্তমাখা তবোয়াল হাতে দৃশ্যটার দিকে সম্মোহিতের মতো চেয়ে থরথর করে কাঁপছে।
কৃষ্ণকান্ত চমৎকার সাঁতার কাটতে পারে। বিশেষ করে ড়ুবসাঁতার। একদিন তার ইচ্ছে হল, অন্দরমহলের দিকে যে অথৈ পুকুরটা আছে তার তলা থেকে মাটি খামচে আনবে। যেই কথা, সেই কাজ। একদিন ড়ুব দিল তো দিলই। আর ওঠে না। হরি বিপদ বুঝে লোকজন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে। যখন কৃষ্ণকান্তকে তোলা হল তখন মৃত্যুর ঘণ্টা প্রায় বেজে গেছে।
হেমকান্তর অন্যান্য ছেলেরা যেমন শান্ত ও সুশীল কৃষ্ণকান্ত তেমন নয়। ঘরের চেয়ে বাইরের আকর্ষণ তার ঢের বেশি। বাড়ির পিছন দিকে পগারের ওপারে হেমকান্তর কিছু প্রজা বাস করে। তারা গরিব ও অসংস্কৃত। কৃষ্ণকান্ত নিয়মিত সেই পাড়ায় যায়। সেখানে তার একদঙ্গল অনুচরও জুটে গেছে। কৃষ্ণকান্ত তাদের সঙ্গী করে মাঝে মাঝে মারপিট লাগায় অন্য পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে। এর ওর তার বাড়ি থেকে ফুল ফল চুরি করে। তাদের সঙ্গে ফুটবলও খেলে।
ব্ৰহ্মপুত্রের ধারে যেসব ডিঙিনৌকো থাকে সুযোগ পেলেই কৃষ্ণকান্ত দড়ি খুলে সেগুলো স্রোতের মুখে ঠেলে দিয়ে আসে। বুড়ো রামভজুয়া দারোয়ানের কানে সে একবার গোকুলপিঠের গরম রস ঢেলে দিয়েছিল। রামভজুয়ার সেই কান একদম গেছে।
হেমকান্তর কাছে অবশ্য এসব খবর বড় একটা পৌঁছয় না। প্রথম কথা, কৃষ্ণকান্ত যে হেমকান্তর আদরের ছেলে এটা সবাই জানে। দ্বিতীয় কথা, মা-মরা ছেলে বলে সকলেরই একটু মায়া আছে। তাই কেউ নালিশ করতে যায় না। হেমকান্তর বড় ছেলে কনককান্তি কলকাতায় তাদের কালীঘাটের বাড়িতে থাকে। শ্বশুরের সঙ্গে সে একটা ব্যাবসায় নেমেছে। ব্যাবসা কীসের তা খোঁজ করেননি হেমকান্ত। তবে আয় বোধহয় ভালই হচ্ছে। কনকান্তি টাকার জন্য বাপকে চিঠি লেখে না। সম্প্রতি সে একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সে কৃষ্ণকান্তকে নিজের কাছে রেখে মানুষ করতে চায়। হেমকান্ত না বা হ্যাঁ কোনওটাই জানাননি। কৃষ্ণকান্তকে ছেড়ে থাকতে তার কষ্ট হবে। তবু তাকে যে কলকাতায় পাঠানোই উচিত তাও তার মনে হয়। এখানে কৃষ্ণকে দেখার কেউ তেমন নেই। কনককান্তিও আগ্রহের সঙ্গেই চাইছে।
কিন্তু কলকাতায় যাওয়ার প্রস্তাবে কৃষ্ণকান্ত কেঁদে ভাসিয়েছে। বাবা তাকে এখনও কিছু বলেনি ঠিকই, কিন্তু যদি বলে? বাবার কথার ওপর তো আর কথা চলে না। মনু পিসি বা রঙ্গময়িই হচ্ছে তার একমাত্র ভরসা। বড়দা তাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চায় শুনে সে গিয়ে মনু পিসির ওপর হামলে পড়ল, আমি কিন্তু কিছুতেই যাব না, বলে দিচ্ছি। তুমি বাবাকে রাজি করাও।
কৃষ্ণ কোথাও চলে যাবে এটা রঙ্গময়িও ভাবতে পারে না। সুনয়নী চলে যাওয়ার পর এই দুধের বাচ্চাটিকে সে বুকে আগলে এত বড়টি করেছে। তবু সে বলল, যাবি না তো কী করবি? এখানে কে তোকে অত চোখে চোখে রাখবে? কখন পুকুরে ড়ুবে মরিস, কার সঙ্গে মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে আসিস তার তো ঠিক নেই। কলকাতায় ধরাবাঁধা জীবন, সেখানেই গিয়ে থাকা ভাল।
এরপর কৃষ্ণকান্ত রেগে রঙ্গময়িকে আঁচড়ে কামড়ে চুল ছিঁড়ে একাকার কাণ্ড করল। রঙ্গময়ি ভরসা দিল, আচ্ছা যা, তোর বাবাকে রাজি করানোর চেষ্টা করব।
কৃষ্ণকান্ত ভরসা পেল বটে, কিন্তু ভয়টা আজও কাটেনি। কনককান্তি সামনের মাসে আসছে। সেই সময় আবার তাকে কলকাতা নিয়ে যাওয়ার কথা উঠবে। সেখানে এমন অবারিত মাঠঘাট নেই, ঘোড়া নেই, বন্ধু নেই, ধারেকাছে নেই নদী বা পুকুর। বড়দা লোকটা ভারী গোমড়ামুখো। বউদিও ভীষণ রাগী।
কৃষ্ণকান্ত হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, হরদা, কখনও কলকাতায় গেছ?
গেছি। অনেকদিন আগে।
তোমার ভাল লাগে?
না।
তোমার এ জায়গাটাই বেশি ভাল লাগে, না হরদা?
হ্যাঁ।
আমারও। তবু বড়দা আমাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইছে।
হরনাথ উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, সে কী? তুমি যেয়ো না।
