দাও।
“মনু নরম হাতে আমার বুক স্পর্শ করিয়া কহিল, তোমাকে নিয়ে আমার অনেক সাধ।
তাই নাকি? সাধ কি বুড়োকে নিয়ে হয়?
তুমি বুড়ো হলে আমিও তো বুড়ি। বয়সটা তো কথা নয়। যতদিন বাঁচি ততদিনই তো জীবন। মরার আগে অবধি তো ছাড়াছাড়ি নেই।
“একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কহিলাম, তা বটে। কিন্তু আমার কেবলই কেন মনে হয় বলো তো যে, আর বেঁচে থাকার কোনও মানেই হয় না?
মানে হবে না কেন?
কেবল মনে হয় যথেষ্ট বেশিদিন বেঁচে আছি। এবার বিদায় নেওয়াই ভাল। কে জানে কোথা থেকে আবার কোনও দুঃখ বা আঘাত আসে!
এই ভয় তো তোমার চিরকালের। কিন্তু ভয় পেলে চলবে কেন? ভয়ের কিছু নেই। তুমি কৃষ্ণর কথা বড্ড বেশি ভাবো।
ভাবি। না ভেবে পারি না।
এবার আমাকেও একটু ভাবতে দাও। তোমার ভাবনার ভার নেব বলেই না বউ হয়েছি।
ভাবনা কি ভাগ করা যায়, মনু?
ধরে নাও, মনু যখন ভাবছে তখন আমি একটু কম করে ভাবি না কেন। ওরকম মনে করলেই দেখবে দুশ্চিন্তা কমে যাচ্ছে।
চেষ্টা করব।
একবারটি ডাক্তার ডাকি?
আবার ডাক্তার কেন? তুমিই তো আমার ডাক্তার।
তা বটে। কিন্তু সামনে একটা শুভ কাজ, অনেক খাটুনি। একটু দেখিয়ে রাখা ভাল।
“চুপ করিয়া রহিলাম। মনু ডাক্তার ডাকিল। ডাক্তার আসিয়া বুক পরীক্ষা করিয়াই কহিল, করেছেন কী!
কী হয়েছে, ডাক্তার?
প্রেশার ভীষণ বেড়েছে। একটু মোক্ষণ দরকার।
মোণ! বলো কী?
“ডাক্তার আমাকে বিশেষ আমল না দিয়া তাহার আসুরিক চিকিৎসার আয়োজন করিতে লাগিল। আমি ভয়ে কাঁটা হইয়া রহিলাম। ছেলে মেয়ে বউ নাতি-নাতনিরা আসিয়া ভিড় করিল। ডাক্তার ছুরি শানাইতে লাগিল।
“শরীরটা যে আমার ভাল নাই, অপরিসীম ক্লান্তি ও দুর্বলতা যে আমাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে তাহা টের পাইতেছিলাম। সারা শরীরে ঘাম, উত্তাপ। খাস গরম। মাথা ঘুরিতেছে। বারবার চোখে অন্ধকার দেখিতেছি।
“মনু আমার ডান হাত শক্ত করিয়া ধরিল। ডাক্তার স্পিরিট দিয়া বাহুর ঊধ্বদিকে একটা জায়গা ভাল করিয়া মুছিল। ছুরির আঘাত আমি টেরই পাইলাম না। শুধু শুনিতে পাইলাম একটি পাত্রে কলকল করিয়া রক্ত ঝরিয়া পড়িতেছে। কত রক্ত ঝরিল তাহা বলিতে পারব না। হঠাৎ প্রগাঢ় এক নিদ্রাবেশ আসিল। আমি ঢলিয়া পড়িলাম।
“ঘুম ভাঙিল সকালে। শরীর অতিশয় দুর্বল। পাশ ফিরিবার সাধ্য নাই। শিয়রে ম্লানমুখী মনু উপবিষ্টা।
আমি কেমন আছি, মন?
ভাল আছ। শুয়ে থাকো, উঠো না।
খুব ফাঁড়া গেল নাকি?
গেল। ডাক্তার না ডাকলে কী যে হত!
কী আর হত?
খুব দুষ্টু হয়েছ। ডঙ্কা বাজিয়ে চলে যেতে সবাই পারে। সংসার দেখত কে?
আমার সংসার আর কোথায়, মনু? তুমি ছাড়া আর কে আছে?
আমি তো আছি। আমার প্রতি তোমার দায়িত্ব নেই?
“হাসিলাম। কে কাহার দায়িত্ব লইয়াছে তাহা আমি ভাবিয়া পাই না। এতকাল তো মনুর উপর নির্ভর করিয়াই কাটিল, বাকি জীবনটাও সেইভাবেই যাইবে বলিয়া অনুমান করি। আমি আর তাহার কী ভার লইব। হাতটা বাড়াইয়া তাহার হাতখানা মুঠা করিয়া ধরিলাম। কী যে এক ভরসা ও শান্তি অনুভব করিলাম তাহা বলিবার নয়, স্পর্শমাত্রই যেন মনটা নির্ভরতা, বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের অনুষঙ্গ পাইয়া নাচিয়া উঠিল, আর কেহ না থাক, মনু আছে। মনু কাছে থাকিলে কিছুদিন বাঁচিয়া থাকা যায়।
“মনু আর-একটু ঘন হইয়া বসিয়া কহিল, সারা রাত ওই মুখখানা দেখে দেখে কেটে গেল। ভালবাসা কেমন হয় তা জানো?
সারা রাত জেগে ছিলে?
জাগব না? এই তো আমার বাসর জাগা।
জেগে থাকার দরকার ছিল না। আমি তো ঘুমোচ্ছিলাম।
কাল ডাক্তার কত রক্ত বের করে ফেলল শরীর থেকে। ভয়ে মরি। বুকের ব্যথাটা কেমন?
টের পাচ্ছি না।
শুয়ে থাকে। একদম উঠবে না। আমি বিছানাতেই তোমার সব করে দেব।
“আমি মাথা নাড়িয়া কহিলাম, শুয়ে থাকলে শয্যাকণ্টকী হয়ে যাবে, মনু। আমার মেয়ের বিয়ে, ভুলে যেয়ো না।
যাইনি। কিন্তু আমি আছি, ছেলেরা আছে, তোমার অত ভাবনার কী?
“ভাবনা লইয়াই জগৎ, ভাবনার হাত হইতে নিষ্কৃতি কোথায়? বলিলাম, আমাকে না হলেও চলে জানি। কিন্তু বড় অস্থির লাগে।
আজকের দিনটা বিশ্রাম করো।
“করিলাম। প্রাতঃকৃত্যাদির পর নির্জন ঘরে আবার ঘুমাইয়া পড়িলাম। আমার এই দীর্ঘ বিশ্রামটির যেন প্রয়োজন ছিল। বিকাল গেল। ঘুম হইতে জাগিয়া আবার ঘুমাইলাম। অজান্তে দিন কাটিল রাত কাটিল।
“যখন বিছানা ছাড়িয়া উঠিলাম তখন সানাই পোঁ ধরিয়াছে। মনু মৃদু হাসিয়া কহিল, এই তো ঝরঝরে লাগছে!
“ম্লান হাসিলাম।
“বিপদে পড়িলেই মানুষ চেনা যায়, এই সাবেকি কথাটি যে কত খাঁটি তাহার প্রমাণ আর-একবার পাইলাম। বিশাখা ও শচীনের বিবাহ উপলক্ষে লোক জড়ো হইয়াছিল মন্দ না। আত্মীয়স্বজন কুটুম বয়স্য পরিচিত মিলাইয়া হাজার দেড়েক। তাহার উপর প্রজারা তো আছেই। আত্মীয় কুটুমদের কথাই বলি, যে-বিবাহ উপলক্ষে তাহারা আমন্ত্রিত সেই বিবাহ লইয়া কাহারও মাথাব্যথা নাই। মাথাব্যথা যত আমাকে ও মনুকে লইয়া। সকলেই কেবল আমাদের কথা ফুস ফুস গুজ গুজ করে, টিপ্পনী কাটে, তামাশা করে, এমনভাবে তাকাইয়া থাকে যেন আমরা দুটি চিড়িয়াখানার কিস্তৃত জন্তু। জীবনে আমি কদাচ এরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হই নাই। প্রবল অস্বস্তি বোধ করিতে লাগিলাম। সম্ভবত রক্তচাপ বাড়িল।
“আমার তো সমস্যা একটি নহে। শ্লেষ বিদ্রুপ সহ্য করিতে হইতেছে, পুত্রের জন্য দুশ্চিন্তা ভোগ করিতে হইতেছে, শরীরও বেচাল। মনু শুধু মাঝে মাঝে কানে কানে বলিয়া যায়, একটু সহ্য করো। আর কটা দিন। আমরা তো চলেই যাব।
