“উনি সামান্য উম্মার সহিত কহিলেন, বলার জন্যই আড়ালে নিয়ে যেতে চাইছি।
“আমার বাড়িতে অনেক ফাঁকা ঘর আছে। সেখানে বসে কথা বললে হয় না?
“উনি এবার সামান্য হাসিয়া বলিলেন, তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আপনার মেয়ের বিয়ে, বাড়ি ভর্তি আত্মীয়স্বজন, সেই পরিস্থিতিতে বাড়িতে পুলিশ গেলে নানা কথা উঠতে পারে। ভেবে দেখুন।
“ভাবিবার কিছু নাই। কথাটা যুক্তিযুক্ত। লোকটিকে ভাল করিয়া দেখিলাম। আমি মানুষের মুখ দেখিয়া কিছুই অনুমান করিতে পারি না। আমার সেই ক্ষমতা নাই। কিন্তু এই লোকটির মুখে পুলিশসুলভ রূঢ়তা কিছু নাই। একধরনের ভদ্র বিচক্ষণতা ও গাম্ভীর্য আছে। বুকটা একটু কাঁপিতেছিল। বিপ্লবী পুত্রের পিতা হওয়া বড় কম বিপজ্জনক তো নয়!
“বলিলাম, চলুন।
“লোকটি আমাকে ঝোপের আড়ালে একটা ফাঁকা জায়গায় লইয়া গেল। জায়গাটি নির্জন। মুখোমুখি দাঁড়াইয়া কহিল, কোথায় গিয়েছিলেন?
“বিপদের গন্ধ পাইলাম। সেঁক গিলিয়া কহিলাম, আমার মেয়ের বিয়ে। কত কাজ। একটু কাজে গিয়েছিলাম।
“মিথ্যাবাদী হিসাবে আমি নিতান্তই অপটু। তাই গলায় আত্মবিশ্বাস বা দৃঢ়তা ফুটিল না। অনেকটা দয়াভিক্ষার সুর বাহির হইল।
“লোকটা আমার দিকে কিছুক্ষণ স্থির চোখে চাহিয়া থাকিয়া কহিল, আপনি কোথায় গিয়েছিলেন তা আমি জানি।
“জানেন? বলিয়া বেকুবের মতো চাহিয়া রহিলাম।
“উনি কহিলেন, কৃষ্ণকান্তকে অ্যারেস্ট করা আমার পক্ষে শক্ত ছিল না। কিন্তু করিনি কেন জানেন?
“আমি মাথা নাড়িলাম, না।
“তিনি কহিলেন, একটি মাত্র কারণে। আপনার বাড়িতে একটা শুভ কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনি। কিন্তু আমি কৃষ্ণকান্তর গতিবিধি জানতে চাই। আপনি কি বলবেন?
“আমি ফাঁপরে পড়িলাম। কৃষ্ণ ধরা দিবে বলিয়াই রওনা হইয়াছে। কিন্তু এখানে নয়। আমি তাহার সেই পরিকল্পনা বানচাল করিব কেন? যদি এ লোকটা কৃষ্ণ ঢাকা পৌঁছাইবার আগেই তাহাকে গ্রেফতার করে? তাই কহিলাম, আমি জানি না। সে আমাকে কিছু বলেনি।
“লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কহিল, সেটাই স্বাভাবিক। তবে সে বলে থাকলেও আপনি আমাকে কিছুতেই বলতেন না। তাই না?
“আমি নীরব রহিলাম।
“উনি ধীর স্বরে কহিলেন, ও যেখানে যেতে চায় যাক। আমার তাতে ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। কিন্তু বিপদ কী জানেন? সর্বত্র কৃষ্ণের জন্য ফঁদ পাতা আছে। হয় ধরা পড়বে, নয়তো মারা পড়বে। আমার এলাকা থেকে বেরিয়ে গেলেই যে পরিত্রাণ পাবে তা নয়।
“আমি কী বলিব! চুপ করিয়া রহিলাম।
“উনি গাঢ় স্বরে কহিলেন, ও কোথায় যাচ্ছে হদিশ দিলে ওর উপকারই হত।
“কীভাবে? আমি ওকে নিরাপদে সেখানে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতাম।
“আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিলাম। পুলিশকে বিশ্বাস নেই। ইহারা মিষ্ট কথায় নানা ছলে মানুষকে। ভুলাইতে জানে। রামকান্ত রায়কেও দেখিয়াছি কখনও মিছরি কখনও ছুরি। তাই মাথা নাড়িয়া কহিলাম, আমি জানি না।
“লোকটা আর চাপাচাপি করিল না। শুধু কহিল, আপনার এবং আপনার বাড়ির সকলের ওপরেই পুলিশের নজর আছে। কাজেই একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন। আর কৃষ্ণর সঙ্গে যদি যোগাযোগ হয় তবে তাকে বলবেন, কিছুতেই যেন দিদির বিয়ের সভায় উপস্থিত না থাকে।
“আমি মাথা নাড়িয়া সম্মতি জানাইলাম। গলার স্বর ফুটিতেছে না।
“লোকটি চলিয়া গেলে আমি ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরিলাম। কুঞ্জবনের যে রন্ধ্রটি দিয়া নির্গত হইয়াছিলাম সেইটি দিয়াই প্রবেশ করিলাম। ঘরে আসিতেই উদ্বিগ্ন মনু জিজ্ঞাসা করিল, দেখা হল?
তুমি সবই জানো, তাই না?
না গো। তবে আন্দাজ করেছিলাম। কী বলল?
অনেক কথা। মনু, ফেরার সময় পুলিশের খপ্পরেও পড়েছি।
তারা কী বলল?
লোকটা ভাল না খারাপ বুঝলাম না। কৃষ্ণর খবর চাইছিল।
দিলে নাকি?
না। পাগল তো নই।
লোকটা কে?
চিনি না।
বেশ লম্বা ছিপছিপে চেহারা? নীচের ঠোঁটে কাটা দাগ?
“লোকটাকে ভাল করিয়া লক্ষই করি নাই। এত ঘাবড়াইয়া গিয়াছিলাম যে, লক্ষ করিবার মতো মানসিক স্থৈর্য ছিল না। কিন্তু মনুর বিবরণ শুনিয়া মনে হইল, লোটা ওইরূপই বটে। তাই কহিলাম, হ্যাঁ, চেনো নাকি?
ও মৃত্যুঞ্জয়। ওকে বললেও ভয় ছিল না।
কেন?
স্বদেশিদের প্রতি ওর একটু দয়ামায়া আছে।
তা আমি কী করে জানব?
বলে ভালই করেছ। এবার কৃষ্ণের কথা একটু শুনি।
“আনুপূর্বিক সবই তাহাকে বলিলাম। সে মন দিয়া ছলোছলে চোখ করিয়া শুনিল। তারপর দুটি হাত জোড় করিয়া কপালে ঠেকাইয়া কহিল, ধরা দিচ্ছে। ঠাকুর, দেখো।
ঠাকুর দেখবেন বলেই আমার বিশ্বাস। যদি না দেখেন তো ভবিতব্য, মনু।
তোমাকে কেমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। শরীর ভাল তো!
ভালই। তবে বুকটা কাঁপছে, একটু ব্যথাও টের পাচ্ছি।
শোও। চুপ করে একটু শুয়ে থাকো।
না। অনেক কাজ।
কাজ তো কী? একটা শক্ত অসুখ বাঁধালে কাজটা করবে কে? বুকের ব্যথা খুব ভাল কথা নয়। ডাক্তারকে খবর পাঠাই।
লাগবে না, মনু। ঠিক আছে, শুচ্ছি।
“শুইলাম। আমার হৃদযন্ত্র যে ঠিকমতো কাজ করিতেছে না তাহা টের পাইতেছিলাম। কিন্তু শরীর লইয়া আজ আর আমার মাথাব্যথা নাই। আমি এখনও স্বপ্নবৎ একটি ঘোরের মধ্যে বিরাজ করিতেছি। কৃষ্ণর মুখখানা চোখের সম্মুখে ভাসিতেছে। চোখে জল আসিল। বুক ফুলিয়া উঠিতে লাগিল। এত স্নেহ আমার কোথায় ছিল জানি না। আমার অন্য সন্তানদের কাহাকেও লইয়া আমার পিতৃত্ব এমন উথলিয়া উঠে নাই।
“মনু মাথার কাছে বসিয়া কহিল, বুকে একটু হাত বুলিয়ে দেব?
