“বিবাহের দিন সকাল হইতেই ধুম লাগিয়াছে। আমি উপরের বারান্দায় একটি ইজিচেয়ারে বসিয়া সেই কর্মব্যস্ততা কিছু লক্ষ করিতেছি। মনু আছে। সে বহু যজ্ঞ সামলাইয়াছে, এটিও পারিবে। তাই দুশ্চিন্তা নাই। কিন্তু অস্বস্তি আছে। তাহাকে হয়তো অনেক কটুকাটব্য বিদ্রুপ ও অপমান সহ্য করিতে হইতেছে। গহনার অধিকার সে ছাড়ে নাই। বিশাখাই সুনয়নীর অবশিষ্ট গহনা পাইয়াছে। ইহা এক স্থায়ি অশান্তির কারণ হইয়া রহিল। কৃষ্ণকে সর্বস্ব উইল করিয়া দিতেছি, ইহা জানাজানি হইলে অশান্তি চরমে উঠিবে। কাশী গিয়াও পরিত্রাণ পাইব না।
“বসিয়া বসিয়া এই সকল ভাবিয়া মনটা বিকল হইতেছিল। এক বয়স্কা আত্মীয়া উপরে আসিয়া কহিলেন, ও হেম, কেউ তো কাজ করছেনা। যে যার ঘরে বসে আছে। বলি বিয়েটা ওতরাবে কী করে?
কী হয়েছে?
জানি না বাপু, কী সব রাগবাগ হয়েছে সকলের। তোমার মেয়েরা বউমারা কেউ ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। কাজকর্ম দেখিয়ে দেবে কে?
কেন? মনু নেই?
সে তো কালীবাড়ি পুজো দিতে গেছে। একা মানুষের সাধ্যও তো নয়। কত লোক এসে কত কিছুর খোঁজ করছে।
মনু আসুক, আমি কী বলব? কনককে খুঁজে দেখো। আজ সেই কন্যাকর্তা।
কনক তো বিদ্ধি করতে বসেছে। এ বেলা আর উঠতে পারবে না।
“একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিলাম। স্পষ্টই অসহযোগ। কিন্তু আমার তো কিছু করিবার নাই। চোখ দুইটি মুদিয়া রহিলাম। কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়াইয়া পড়িল।”
১০২. দরজা খুলে বৃদ্ধা
দরজা খুলে বৃদ্ধা স্নিগ্ধ ও প্রসন্ন মুখে বললেন, আয়। মনে পড়ল তা হলে?
মনু ঠাকুমা, আমি তোমার কাছে কিছু কথা জানতে এসেছি।
দরকার না হলে যে এই পোড়াকপালিকে তোদের মনে পড়ে না সে আমি জানি। আয় বোস এসে।
বাইরের ঘরে নয়, ভিতরের দিকের চিক-ঢাকা বারান্দায় একটা মোড়ায় রঙ্গময়ির মুখোমুখি বসল ধ্রুব। রঙ্গময়ির বাঁ হাঁটুতে কঠিন বাত। উঠতে বসতে কষ্ট হয়। কষ্টেই বললেন, পুরনো কথা জানতে এসেছিস তো!
তা বলতে পারো।
আমার বাপু আজকাল মাথায় বুড়োমি ঢুকেছে। ভীমরতি না কী বলে। কিছু তেমন মনে থাকে। যা জানতে চাস এইবেলা জেনে নে।
সত্যি করে বলবে আমার পিতৃদেবতাটি কেমন লোক?
কী কথার ছিরি ছেলের! আবার বেঁধেছে নাকি তোদের বাপ-ব্যাটায়?
বাঁধলে বাঁধতেও পারে।
বাঁধলে যদি বাঁধতেই পারে তো গিয়ে ধুন্ধুমার লাগিয়ে দে না সোরাব-রুস্তমের কাণ্ড। আমার কাছে এসেছিস কেন?
তোমার কাছে কিছু পয়েন্ট নিতে এসেছি। ঝগড়া করতেও তো কিছু পয়েন্ট লাগে! তুমি যে টোপলা নিয়ে বসে আছ।
কীসের টোপলা রে বদমাশ?
পুরনো কথার। তুমি ছাড়া আর তো কেউ জানে না।
সেসব জেনে গিয়ে বাপের সঙ্গে লাগবি?
ধ্রুব একটু হাসল, আমার যে জানা দরকার, ঠাকুমা।
পুরনো কথা অনেক শুনেছিস। আর শুনে ডানা গজাবে না।
তবু বলো। আমার একটা কথাই জানা দরকার। কৃষ্ণকান্ত কেমন লোক।
সেও তোকে অনেকবার বলেছি। কৃষ্ণর মতো মানুষ হয় না।
এই যে তোমরা বলল, এতে আমার ভীষণ অবাক লাগে। কৃষ্ণকান্ত যদি এতই ভাল তবে আমি কেন লোকটাকে শ্রদ্ধা করতে পারিনি? কেন লোকটাকে আমার ভণ্ড আর দাম্ভিক বলে মনে হয়?
ছিঃ ধ্রুব। ওসব কথা মুখে বা মনে আনাই পাপ। কৃষ্ণ যদি ভণ্ড তবে দেশে আর খাটি লোক একটাও নেই।
কেন ঠাকুমা, সেটাই বুঝিয়ে বলো।
আগে বল তোদের বাপে ব্যাটায় হয়েছেটা কী?
ধ্রুব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, নতুন করে কিছু হয়নি, ভয় নেই। যা হয়ে আসছে তারই জের চলছে। বাইরে আমাদের ঝগড়া বা অশান্তি কিছুই নেই। হয়তো তোমার কৃষ্ণর মনেও কিছু নেই। শুধু আমার ভিতরেই লোকটা সম্পর্কে যত সন্দেহ।
রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সেইসব দিনে যদি তুই থাকতি, দেখতি কৃষ্ণ কেমন মানুষ। ওইটুকু বাচ্চা ছেলে যেন দেশ কাপিয়ে দেওয়ার শক্তি রাখে। রামকান্ত রায়কে খুন করে পাবনায় পালিয়ে গিয়েছিল। ঢাকায় গিয়ে ধরা দিল। তাকে দেখতে গাঁ গঞ্জ ভেঙে পড়েছিল সেখানে।
সেসব শুনেছি। দিল্লিতে নিয়ে গিয়েছিল। ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পাবনার আশ্রম থেকে লোক গিয়ে কী সব কলকাঠি নেড়ে তাকে ছাড়িয়ে আনে।
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বললেন, ছোট্ট করে বললি, কথাটা ফুরিয়ে গেল। কিন্তু সেদিন কী উত্তেজনা, কী তোলপাড়। তোর দাদু বোধহয় তিন দিন তিন রাত জলস্পর্শ করেনি, ঘুমোয়নি৷
লোকটা যে হিরো ছিল তা তো আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু হিরোর মুখোশ আঁটা মানুষটার ভিতরের কথা জানতে চাই।
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বললেন, কৃষ্ণর ভিতর-বার আলাদা ছিল না কখনও, ও তো তোদের যুগের মানুষ নয়, তোদের দলেরও নয়।
আমরা কি খুব খারাপ, ঠাকুমা?
তোর খারাপ হওয়ার কথা তো নয়, দাদু। খারাপ হবি কেন? কৃষ্ণ যার বাপ সে কি খুব খারাপ হতে পারে কখনও? তবে তোকে যে ভূতে পেয়েছে সে কথাও সত্যি। নইলে ওসব ছাইপাঁশ গিলে মাতলামি করে বেড়াতে পারিস কখনও?
তুমি জানো না, আমি কিন্তু ছেড়ে দিয়েছি।
সব জানি। ছেড়ে দিলি ভাল কথা, কিন্তু ধরেছিলি কেন? কোন দেবদাস রে তুই?
ধ্রুব একটু হাসল। কিছু বলল না।
রঙ্গময়ি বললেন, যদি ইচ্ছে ছিল না তবে মদ খেতি কেন? সেইজন্যই তো বলি তোদর ভিতরবার এক নয়। তোরা কোন সাহসে কৃষ্ণর বিচার করিস?
নাঃ ঠাকুমা, তুমিও হিপনোটাইজড।
কৃষ্ণর কথাই শুনতে এসেছিস তো! শোন বলি, সে ভাবের মানুষ ছিল না, অলস চিন্তা করে সময় কাটানোর মানুষ ছিল না। সে সারাজীবন কাজ করেছে। জেল থেকে বেরিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছে কাজে। ফের জেলে গেছে। বন্দি অবস্থাতেও সংগঠন করেছে। কত বদমাশ, পাজি, গুন্ডা, চোর, ডাকাতকে স্বদেশি করে তুলেছে। প্রাণ হাতে করে চলতে হয়েছে তাকে। তোদেব মতো বাবুগিরি করে সময় তো কাটায়নি।
