প্লিজ রেমি!
রেমি ফের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমি ভাবছিলাম এসব অনেক আগের কথা।
না। একেবারে টাটকা খবর।
বলো।
যখন ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছিলাম তখন দেখি নীচে টালিগঞ্জ পাড়ার এক মেজো মস্তান দাঁড়িয়ে আছে। আমার চেনা।
মারল নাকি তোমাকে?
ধ্রুব হাসল। মাথা নেড়ে বলল, না। আমাকে মারলে কালই গিয়ে জগাদা ওর হাত কেটে দিয়ে আসবে।
জগাদা কি গুন্ডা?
গুন্ডাদের গুরু। তবে আদর্শবাদী গুন্ডা। প্রফেশন্যাল নয়। জগাদার কথাতেই আসছি। সেই মেজো গুন্ডা আমাকে খুব অভয় দিল, নোটনের কাছে আমার যাতায়াতকে অ্যাপ্রুভও করল। আমি ওকে দু-চার কথা জিজ্ঞেস করতেই যা বেরিয়ে এল সেটা শুনলে তুমি বোধহয় মূৰ্ছা যাবে।
কী গো!
সে যা বলল তাতে বুঝলাম জগাদা সব খবর রাখে। সে গিয়ে ফ্যাতনকে বলে এসেছে যেন আমি নিরাপদে নোটনের কাছে যাতায়াত করতে পারি সেদিকে নজর রাখতে।
জগা। দাঁড়াও শ্বশুরমশাইকে ওর নাম বলছি!
ধ্রুব ম্লান হেসে বলে, সবটা শুনে নাও। অস্থির হোয়ো না।
অত আস্তে আস্তে ভাঙছ কেন?
রহস্যকাহিনি এভাবেই বলতে হয়। একটু আগে বাড়ি ফিরে আমি জগাদাকে চার্জ করেছিলাম। সে কী বলল জানো? বলল, নোটনের কাছে আমার যাতায়াত স্বয়ং তোমার শ্বশুরমশাই অনুমোদন করেছেন।
রেমি রাঙা হয়ে উঠে বলল, ধ্যাৎ! হতেই পারে না।
জগাদা প্রয়োজনে মিথ্যে কথা বলে বটে, কিন্তু কৃষ্ণকান্ত প্রসঙ্গে কখন বলবে না। গলা কেটে ফেললেও না।
শ্বশুরমশাই কি তেমন মানুষ?
জানি না, তোমার শ্বশুরমশাইকে আমি ভাল চিনি না। আমার শুধু মায়ের মৃত্যুর দৃশ্য মনে পড়ে। আগুনের মধ্যে মা বেগুনপোড়া হচ্ছে।
আবার পুরনো কথা?
ঠিক আছে, থাক। কিন্তু আমার প্রশ্ন তোমার শ্বশুর আমাকে লাম্পট্যের পথ দেখাচ্ছেন কেন? কেন রি-অ্যাক্ট করলেন না?
উঃ, আমি এত ভাবতে পারি না।
ভেঙে পোডো না। তোমার শ্বশুর সম্পর্কে আমার মনে অনেক ধাঁধা আছে ঠিকই, কিন্তু আজকের ব্যাপারটা আমি হজম করতে পারছি না। উনি কি ভাবেন যে আমার কোনও সেকসুয়াল চাহিদা মিটছে না বলেই আমি বখে যাচ্ছি? আর তাই সেই পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছেন?
উনি ওরকম করেননি, জগাদা মিথ্যে বলেছে।
তুমি অন্ধ, একদেশদর্শী। আমার বন্ধু হতে গেলে আর-একটু নিরপেক্ষ হতে হবে। নিজেকে রেফারি বলে ভেবে নাও। ফাউল যে করবে তার বিরুদ্ধেই বাঁশি বাজাবে।
শ্বশুরমশাই এরকম ফাউল করতে পারেন না।
কেন পারবেন না? উনি বহু ফাউল জীবনে করেছেন।
তা বলে নিজের ছেলেকে নিয়ে—
নিজের ছেলে বলে কি তাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে নেই? আমার তো মনে হয় উনি আমার রোগ ধরতে না পেরে মরিয়া হয়ে এখন বেপরোয়া নিদান দিচ্ছেন।
ছিঃ, তোমার মুখে কিছু আটকায় না।
না, আমার মুখ তোমার শ্বশুরও আটকাতে পারেননি। আর সেইটেই ওর মস্ত অশান্তির কারণ।
চলো আমরা কোথাও চলে যাই।
যেতে তো হবেই, রেমি। তোমার শ্বশুর এনিমি প্রপার্টির বিস্তর টাকা পাচ্ছেন। সেই টাকা দিয়ে আমাকে তিনি নাসিকে পাঠাবেন তার এক বন্ধুর সঙ্গে পার্টনারশিপে ব্যাবসা করতে। সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।
কেন? তুমি যাবে। আমিও যাব।
যেতে আপত্তি নেই। কিন্তু আমি এতদিনে বুঝে গেছি কোথাও গিয়েও আমি ভাল থাকব না।
হ্যাঁ গো, মদ ছেড়ে দিয়ে কি তোমার কষ্ট হয়?
না রেমি। মদের কোনও নেশা আমার ছিল না। বন্ধুরা জানে আমি বরাবর জোর করে মদ খেতাম। একথা জিজ্ঞেস করলে কেন?
ভাবছিলাম এতদিনের নেশা ছেড়ে দেওয়ায় তোমার ব্রেনটা হয়তো গোলমাল করছে।
না। ওসব নয়। আমার ব্রেন ঠিক আছে। শুধু বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা চলে যাচ্ছে।
আমি কী করব বলো তো?
বসে বসে ভাবো। সারাদিন ভাবো। দেখো কিছু করতে পারো কি না।
আমি দিব্যকে নিয়ে আজই চলে আসছি এ ঘরে।
দিব্যটা আবার কে?
তোমার ছেলে।
ওর নাম দিব্য? কে রাখল?
শ্বশুরমশাই। দিব্যকান্ত। পছন্দ নয়?
বেশ নাম।
ওর মুখের দিকে রোজ কিছুক্ষণ চেয়ে থেকো। দেখো তোমার সব অসুখ সেরে যাবে।
তাই নাকি? তবে তুমি নিজে পাগল হয়ে যাবে বলে ভয় পাচ্ছ কেন?
রেমি লজ্জায় হাসল। মাথা নেড়ে বলল, আর তেমন মনে হচ্ছে না। পাগলামি তুমি সারিয়ে দিয়েছ।
১০১. যখন বাড়ি ফিরিলাম
“যখন বাড়ি ফিরিলাম তখন বেশ ঘোরের মধ্যে আছি। চারিদিকে কিছুই ভাল করিয়া লক্ষ করিতেছি। কেমন যেন এক অলীক পৃথিবীর স্বপ্নবৎ দৃশ্যাবলী আমাকে ঘিরিয়া ধরিয়াছে। মনে মনে কেবল একটি প্রশ্নই গুঞ্জন তুলিতেছে, নিরুদ্দেশ যাত্রায় এক ক্ষুদ্র নৌকায় আমার প্রাণপ্রিয় কিশোর পুত্রটি কোথায় ভাসিয়া গেল? যাহা আমার প্রিয়, যে আমার প্রিয় তাহাকেই কেন দেশের প্রয়োজন হইল? কেন তাহাকেই গ্রাস করিল এই মহাপৃথিবী?
“জানি এই সকল প্রশ্নের সদুত্তর নাই। আমি চিরকাল মনে মনে আন্দোলন করিব, ভাবিব, কাঁদব। কিন্তু আমার করার কিছুই থাকিবে না। আমরা তো ঘটনাবলীর নিয়ামক নই। আমরা কর্তা নহি। ঘটনা আমাদের লইয়া ঘটে মাত্র।
“নানাভাবে নিজেকে স্তোক দিতে দিতে, আচ্ছন্ন হৃদয়ে এবং ক্লান্ত শরীরে ফিরিতেছিলাম। বাড়ির অনতিদূরে রাস্তার পাশে কিছু ঝোপঝাড়। হঠাৎ তাহার আড়াল হইতে এক ব্যক্তি বাহির হইয়া আসিল। বেশ শক্ত পোক্ত চেহারা, পরনে পুলিশের পোশাক। লোকটা আসিয়া আমার পথ আটকাইয়া কহিল, আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে।
“বিস্মিত হইয়া কহিলাম, কী কথা?
“এখানে নয়, আমার সঙ্গে আসুন।
“আমার যাইবার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু পুলিশকে ইদানীং সমীহ করিতে শিখিয়াছি। বুঝিয়াছি এই একটি জায়গায় বেশি ট্যান্ডাই ম্যান্ডাই করিলে মান লইয়া সংসারে বাস করা কঠিন হইবে। ইংরাজ কর্তারা ইহাদের কাঁধে ভর দিয়াই রাজ্য শাসন করিতেছে। কাজেই একটু দ্বিধার ভাব করিয়া কহিলাম, কেন বলুন তো?
