ধ্রুব মাথা নেড়ে জানাল যে, সে সবই জানে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তোমাকে আর-একটা জটিল সমস্যার কথা জানাতে চাই। শুধু ভয় পাচ্ছি তুমি কীভাবে ব্যাপারটা নেবে।
একসঙ্গে বেশি কি আমি সইতে পারব?
পারবে। পারতেই হবে। যদি আমার বন্ধু হতে চাও তা হলে শেয়ার করো।
রেমি ঝকমকে চোখে চেয়ে দেখল ধ্রুবকে। বলল, ঠিক আছে বলো।
আজই তোমাকে বলার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু ভাবি, কী জানি কী হয়! হাতে হয়তো বেশি সময় নেই।
উঃ! ফের সেইসব কথা।
আমার সঙ্গে কোনও মেয়ের কখনও কোনও ফিজিক্যাল রিলেশন ছিল না। তুমি ছিলে একমাত্র। মুখে আমি যতই আধুনিক হই না কেন, চিন্তায় যতই বিপ্লব করি না কেন, আমি বেসিক্যালি ইনঅ্যাকটিভ, চিন্তাকে আমি কদাচিৎ কাজে অনুবাদ করি। ভাষাটা একটু সাধু শোনাল, রেমি?
উঃ, বলো আমি বুঝতে পারছি। কার সঙ্গে তোমার কী হয়েছে?
পচা শামুকে পা কাটল, তুমি চিনবে না তাকে, নষ্ট ভ্রষ্ট একটা মেয়ে। আমাদের দেশের বাড়ির পুরুতের নাতনি, ওর মা এক সময় মেয়েটাকে আমার সঙ্গে বিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল। তাতে হেড অফিস চটে যায়। মেয়েটার এক দাদা তোমার শ্বশুরের অফিসে চাকরি করত। হেড অফিস অর্থাৎ তোমার শ্বশুর তাকে নিজের চাকরি থেকে তাড়ায়! ছেলেটা সেই থেকে নিরুদ্দেশ। এটুকু হল ব্যাকগ্রাউন্ড। বুঝলে?
বুঝছি, বলো।
মেয়েটা সংসার চালাতে নীচে নামতে থাকে। এরকম আকছার হচ্ছে। কিন্তু এই মেয়েটার ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পিছনে তোমার শ্বশুরের অবদান যথেষ্ট।
মেয়েটাকে আমি চিনি?
বোধহয় না। তার নাম নোটন, সিনেমা থিয়েটারে ছোট পার্ট করে। আসলে কলগার্ল, কেপ্ট এবং আরও হয়তো কিছু। অত জানি না। এক পিকনিকে মেয়েটার সঙ্গে হঠাৎ দেখা। দুঃখী মেয়ে, নীচে নেমেছে, তার ওপর ওর জীবনে আমাকে নিয়ে একটা ট্রাজেডি আছে বলে আমি খুব একটা এড়াতে পারিনি ওকে।
সে কী?–বলে রেমি বড় বড় চোখে তাকায়।
বন্ধু, শক্ত হও। অমন চমকে উঠলে বা রিঅ্যাক্ট করলে আমার মনের জোর কমে যাবে। আমি ভীষণ দুর্বল, শূন্য, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনাহীন। এখন আমাকে গাইড করার দায়িত্ব তোমার। শান্তভাবে শোনো, উত্তেজিত হোয়ো না।
রেমি স্তিমিত হল। বলল, বলো।
এখন আমি তোমার স্বামীই শুধু নই, বন্ধু। তাই না?
বেশ, বলো।
মেয়েটার কাছে আমি বশ মানলাম। কিন্তু কেন মানলাম তার কারণটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়, আমার মনে হল সামথিং ইজ ভেরি মাচ রং উইথ মি। ভিতরে যে ভ্যাকুয়ামটার কথা তোমাকে বলছিলাম সেটাই কারণ কি না কে জানে! একদিন বিনা কারণে ধারার গলা টিপে ধরেছিলাম। মেয়েটা মরতে বসেছিল।
রেমি চমকে উঠে বলে, বলো কী গো! গলা টিপে—
ধ্রুব কঠিন গলায় বলল, রেমি! প্লিজ ডোন্ট রি-অ্যাক্ট। পাদরিরা যেরকম মুখ করে কনফেশন শোনে, পাকা জুয়াড়িরা যেমনভাবে জুয়া খেলে ঠিক সেইরকমভাবে তোমাকে এসব শুনতে হবে। পাথর হও। কঠিন হও।
রেমি নিজের কপাল টিপে ধরে বলে, পারছি না। ধারাকে খুন করতে চেয়েছিলে!
না। আমি চাইনি। আমার ভিতরে একজন অচেনা ধ্রুব চেয়েছিল। সেই ধ্রুবকে আমি ভয় পাই। কে জানে একদিন সে তোমারও গলা টিপে ধরতে চাইবে কি না!
ধরো, তা হলে বেঁচে যাই।
আবার রি-অ্যাক্ট করছ?
রেমি একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আচ্ছা বলো।
নোটনের সঙ্গে মিশবার সময় আমার কোনও প্রতিক্রিয়া হল না। ঘেন্না হল না।
রেমি আচমকা প্রশ্ন করে, নোটন দেখতে কেমন?
মজানোর মতো রূপ নয়। তবে চটক আছে। প্লিজ ওটা নিয়ে আর খুঁটিয়ে জানতে চেয়ো না। তুমি ওর চেয়ে অনেক সুন্দর।
সত্যি কথা বলছ?
মিথ্যে বলব কীসের ভয়ে বলল তো? কোনও ভয় থাকলে কি এত কথা বলতাম?
মাপ চাইছি। রাগ কোরো না। বলো।
আমার সমস্যাটা বুঝতে পারছ তো? নোটনের সঙ্গে শারীরিক মেলামেশা আমার পক্ষে স্বাভাবিক নয়। কারণ আমি ওরকম নই। তবে কেন হল? আমি ভাবতে বসলাম। ভেবে কিছুতেই সভ করতে পারলাম না। আমাদের বংশটা কেমন জানো? জমিদারি হাবভাব থাকলেও লাম্পট্য নেই। আমার দাদু বুড়ো বয়সে একটা বিয়ে করেছিলেন বলে খুব হইহই হয়েছিল। কিন্তু আমি জানি তার মধ্যে কোনও কামের উন্মাদনা ছিল না। তোমার শ্বশুরের জ্যাঠামশাই সন্ন্যাসী হয়ে যান, কাকা স্বদেশি এবং ব্রহ্মচারী ছিলেন। তোমার শ্বশুরকেও লোকে চোর, ক্ষমতালোভী স্বজনপোষক বললেও কেউ কখনও লম্পট বলেনি। আমার মধ্যেও সম্ভবত ওই শুচিতার বোধ ছিল। প্রতিরোধ ছিল। সেই প্রতিরোধ নোটন ভাঙল কী করে? নোটনের কি সেই ক্ষমতা আছে?
সিনেমা-থিয়েটারের মেয়েরা অনেক ছলাকলা জানে।
ধ্রুব মাথা নাড়ল, না রেমি। প্রতিরোধ ভাঙবার ক্ষমতা নোটনের ছিল না। প্রতিরোধ ভেঙেছে আমার ভিতরকার অন্য এক ধ্রুব। তাকে আমি চিনি না। তাকে আমি ভয় পাই।
রেমি বলল, ওরকম করে বোলো না, আমার গা ছমছম করে।
তা করলে চলবে কেন সিস্টার? এ তো ভূতের গল্প নয়।
কিন্তু এমন করে বলছ যে ভয় করে।
ডাক্তার যেমন রোগীর রোগের বিবরণ শোনে তৈমনি করে শোনো। এক্ষুনি বললাম এটা ভূতের গল্প নয়, তাই না? আসলে কিন্তু আমার বিশ্বাস এটা বাস্তবিক ভূতেরই গল্প। একটা ধ্রুব আর একটা ধ্রুবর ভূত।
আবার?
রেমি, সবটা না শুনলে বুঝবে না। না বুঝলে চিকিৎসা করবে কী করে?
আচ্ছা বলো।
এবার আসল কথাটা বলছি। আজ বিকেলে আমি নোটনের কাছে ছিলাম।
সে কী! আজও?
আবার চমকাচ্ছ?
রেমি সাদা মুখ করে চেয়ে থাকে।
