ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, ঠিক ত্যাগ নয় রেমি, যাক গে, সেসব কথা বড্ড পুরনো হয়ে গেছে। তোমাকে যে কথাটা আজ বলতে চাই, তা একটু অদ্ভুত শোনাবে।
কী গো? ভয়ের কথা কোনও?
কী জানি। কথাটা শুনে তুমি ভয় পেতেও পারো।
কী কথা?
আমার আজকাল মনে হচ্ছে, আমি খুব বেশিদিন বাঁচব না।
রেমি একটু শিউরে উঠে ধ্রুবর হাত খামচে ধরল। তারপর স্তব্ধ হয়ে রইল। অনেকক্ষণ বাদে বলল, তোমার কী হয়েছে?
তেমন কিছু নয়। শরীর ভালই আছে। কিন্তু কী জানো, আমি এই জীবনের কোনও পারপাস খুঁজে পাচ্ছি না, বেঁচে থাকাটা বড্ড অর্থহীন, বড় জোলো।
রেমি আবার কেঁপে উঠল। কাঁপুনিটা উঠে এল বুক থেকে। একটা কান্নার তরঙ্গ বয়ে গেল সমস্ত শরীরে। ভেজা গলায় সে বলল, ওসব কী বলছ!
শোনো, তোমাকে বুঝিয়ে বলি। তুমি ছাড়া আমার বিশেষ কেউ বন্ধু নেই যাকে সব কথা উজাড় করে বলা যায়।
বন্ধু! আমাকে তুমি সত্যিই বন্ধু মনে করো?
করি রেমি। ইউ আর এ ফেইথফুল ফ্রেন্ড। গুড ফ্রেন্ড।
রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এতদিন একথাটা বলোনি কেন?
বলিনি, দরকার হয়নি বলে। আজ আমি মনে মনে একজন বিশ্বস্ত বন্ধু খুঁজছি। খুঁজতে খুঁজতে তোমার কথা মনে হল।
তা হলে বলো তোমার কী হয়েছে?
কিছু হয়নি আর সেটাই সমস্যা। আমার কিছু হচ্ছে না, আমি কিছু হয়ে উঠছি না, আমার অস্তিত্বের কোনও তরঙ্গ নেই। ভিতরে একটা বিরাট ভ্যাকুয়াম। তোমার পাগলামির চেয়েও যেটা বেশি যন্ত্রণাদায়ক।
একটু বুঝিয়ে বলো। আমার তো বেশি বুদ্ধি নেই।
বুদ্ধির দরকার নেই, রেমি। শুধু একটু অনুভব করার চেষ্টা করে তা হলেই হবে। বুদ্ধি দিয়ে কাউকে বোঝা যায় না, ভালবাসলে বোঝা যায়।
তা হলে তুমি স্বীকার করছ যে আমি তোমাকে ভালবাসি?
স্বীকার করি। তোমার ভালবাসা সাফোকেটিং, আমার কাছে অস্বস্তিকর। আমি যে ধরনের ফ্রিডমে বিশ্বাস করি তাতে পজেসিভ ভালবাসার স্থান নেই। দখলদারি ভাব স্বাধীনতার অন্তরায়। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা এবং অধীনতার জটিল সব সমস্যা আছে। তুমি হয়তো বুঝবে না।
হ্যাঁ গো, আমার মতো তুমিও কি একটু পাগল হয়েছ?
তুমি আমি কেউ পাগল নই। শুধু পরিস্থিতির শিকার। তোমার আর আমার মধ্যে একটা অদৃশ্য লড়াই ছিল। সে লড়াইটা আইডিয়া ভারসাস প্রিমিটিভনেস। কিন্তু ওসব তুমি বুঝবে না। তোমাকে শুধু আমার প্রবলেমটার কথা বলি।
বলো না গো।
আমার মনে হচ্ছে, অনেকদিন বেঁচে আছি। আরও বহুদিন বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না। আমি তা পেরে উঠব না। কারণ আমার আর কিছু করার নেই।
সে কী গো?
আমি জমিদার পরিবারে জন্মেছি, বাবা নেতা এবং মন্ত্রী। জীবনে আমাকে কোনও অর্থনৈতিক সংগ্রাম করতে হয়নি, হবেও না। যদি মা বাবা বউ বাচ্চার জন্য রুজি-রোজগারের লড়াই করতে হত তবে বোধহয় জীবনটা এত আলুনি লাগত না। আমি কাউকেই তেমন ভালবাসি না, কারও জন্য কোনও রেসপনসিবিলিটি আছে বলেও মনে হয় না, আমার কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। কীসের জন্য বেঁচে থাকা, রেমি?
রেমি খুব কষে আঁকড়ে ধরে ধ্রুবকে। বুকে গাল ঘষতে ঘষতে বলে, তোমার ছেলে হয়েছে না? তাকে মানুষ করবে কে?
ছেলের জন্য আমার কিছু করার আছে কি রেমি? দাদুর দেদার টাকা, আদরের নাতির জন্য সব বন্দোবস্তই তিনি করবেন। আমার কাছ থেকে ওর কিছু নেওয়ার নেই। না কোনও সৎ শিক্ষা, না ধনদৌলত বা বাড়ি জমি। আর যদি বাপের স্নেহের কথা ভোলো, তা হলে বলব তারও ওর দরকার নেই।
রেমি বড় বড় চোখ করে বলে, তুমি কী বলতে চাইছ বলো তো? মরতে চাও মানে কি সুইসাইডের কথা ভাবছ?
মাঝে মাঝে ভাবি। কিন্তু আমার মনে হয় তার দরকার নেই। মানুষের যখন বাঁচার ইচ্ছেটা একদম নিবে যায় তখন তার শরীরও আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ে। তুমি ইচ্ছাশক্তিতে বিশ্বাস করো?
জানি না।
আমার হল নেতিবাচক ইচ্ছাশক্তি। বাঁচার ইচ্ছেটা নিবে গিয়ে একটা মৃত্যুপ্রেম দেখা দিচ্ছে। কেবল মনে হচ্ছে, আর নয়, আর নয়া বহুদিন হয়ে গেল এইখানে।
রেমির বিখ্যাত বড় বড় দুখানি চোখ টসটসে জলে ভরে উঠল। গাল ভাসিয়ে নামল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে।
কাঁদছ কেন? কাঁদলে আমার কী লাভ? আমি তোমাকে আমার প্রবলেমটার কথা বললাম। তোমার কাছে যদি সলিউশন থাকে তো দাও। আমার বাঁচার ইচ্ছেটাকে জাগিয়ে তোেললা, যদি পারো। কেঁদে ভাসিয়ে দিলে তো সমস্যাটা মিটবে না।
আমি বোকা, আমার বুদ্ধি নেই, আমি এসব কথা শুনে আরও পাগল-পাগল হয়ে যাচ্ছি।
ধ্রুব হেসে রেমির নাকটা টিপে দিয়ে বলল, এরকম বন্ধু দিয়ে আমার কী হবে বলো তো! বন্ধু হবে শক্ত সমর্থ, দৃঢ়চেতা, যার ওপর হেলান দেওয়া যায়, যাকে অবলম্বন করে বাঁচার জোর পাওয়া যায়।
রেমি চোখ মুছল। ধ্রুবকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল, মরার কথা ভাবতে পারবে না। কথা দাও।
এসব কি প্রতিজ্ঞা করা যায়, রেমি? ভিতরকার ব্যাপার, নানারকম জটিল কজ অ্যান্ড এফেকটের ওপর নির্ভরশীল।
আমি আজ থেকে তোমার প্রবলেম নিয়ে ভাবব। কিন্তু আমি তো স্লো থিংকার, একটু সময় লাগবে। আমাকে সময় দেবে তো!
দিলাম।
আর শোনো, আজ থেকে আমি এই ঘরে থাকব।
ওয়েলকাম, মন্ত্রীমশাই চটবেন না তো?
না, চটবেন কেন?
ভয় পাচ্ছ একা ঘরে কিছু করে বসি পাছে?
রেমি মাথা নেড়ে বলে, তা নয়। তোমার কাছে কাছেই তো আমার থাকার কথা! ফিরে তাকাও বলেই বাবা আমাকে দোতলায় থাকতে বলেছেন।
