জানো তা হলে!
জানি, বাবা।
আমাকে তোমার ঘৃণা হয় না?
আপনার জন্য আমার ভারী দুশ্চিন্তা ছিল। আমি বেরিয়ে এসেছি, ছোড়দির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, আপনি একা। দেখাশোনার কেউ নেই। মনুপিসি আপনার ভার নেওয়ায় আমার দুশ্চিন্তা গেছে।
সত্যি বলছ?
“কৃষ্ণকান্ত দুটি অকপট চোখে আমার দিকে চাহিয়া বলিল, বাবা, আমি তো নিজের মাকে দেখিনি। মনুপিসিকেই মা বলে জানি। মনুপিসির মতো আপনজন আমাদের আর কে আছে?
“বুক হইতে এক পাষাণভার নামিয়া গেল। মনে হইল, আমার অন্য পুত্রকন্যা জামাতা ও বধুমাতারা আমার যতই নিন্দামন্দ করুন আর যতই কলঙ্ক নিক্ষেপ করুন, আমার আর তাহাতে কিছু আসিয়া যায় না। বড় নিশ্চিন্ত, বড় সুখী বোধ করিলাম। তারপর প্রসঙ্গান্তরে গিয়া প্রশ্ন করিলাম, এখন তা হলে কী করবে?
সেটা জানতেই আপনার কাছে আসা। আপনি বলে দিন কী করব।
“আমি সামান্য হাসিলাম। সংসারী অদুরদশী মানুষ আমরা, আমাদের সাধ্য কী যে কাহাকেও সৎ পরামর্শ দেই? কীসে ভাল হইবে, কীসে মন্দ হইবে সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা করিবার মতো জ্ঞান ও বিচারবোধ কয়টি লোকের থাকে? কয়জনই বা অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা করিয়া কাজ করিতে পারে? মাথা নাড়িয়া কহিলাম, যার আশ্রয়ে গেছ তার পরামর্শই মেনে চলো৷ তাতেই ভাল হবে।
আপনি বলছেন?
বলছি। তার ওপর নলিনীর বড় বিশ্বাস ছিল। তিনি যা বলবেন তাই করো। অগ্র পশ্চাৎ তিনি যত দেখতে পান আমরা তা পাই না।
“একথায় হঠাৎ কৃষ্ণর মুখ উদ্ভাসিত হইয়া গেল। কিছুক্ষণ স্মিত মুখে বসিয়া থাকিয়া সে হঠাৎ নত হইয়া আমার পদধূলি গ্রহণ করিয়া বলিল, আমার দ্বিধার ভাবটা কেটে গেছে।
“আমি মাথা নাড়িলাম। বলিলাম, ফেরারি জীবনে বিপদ অনেক। তা ছাড়া তুমি এখন বিচ্ছিন্ন, একা। এর চেয়ে সারেন্ডার করাই ভাল।
“কৃষ্ণ ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া কহিল, আশ্রমে অনেক রাজনৈতিক নেতা আসেন। ঠাকুর রাজনীতি বিষয়ে ভালই খোঁজখবর রাখেন। তিনি যখন সারেন্ডার করতে বলছেন তখন তার পিছনে নিশ্চয়ই কারণ আছে। গত কদিন ধরে সেই কারণটা অনেক ভেবেও ধরতে পারিনি।
“আমি কাঙালের মতো তাহার মুখোনি আমার দুই চক্ষু দিয়া পান করিতেছিলাম। কহিলাম, যখন একটা খুঁটি পেয়েছ তখন সেইটেই ধরে থাকো। জীবনের সব ক্ষেত্রেই একটি কেন্দ্রবিন্দু থাকা দরকার, একটা বিশ্বাসের স্থল। আমার তেমন কিছু ছিল না বলেই জীবন থেকে অনেকটা বিচ্যুত হয়েছি। নলিনী খানিকটা তাকে অবলম্বন করেছিল। কিন্তু যতদূর জানি, ঠাকুর তাকে পাকাঁপাকিভাবে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন। নলিনী হবে হচ্ছে করে বিলম্ব করছিল। না করলে হয়তো তার অপঘাত হত না।
“কৃষ্ণ আমার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া ছিল। কহিল, আপনি যা বললেন তাতে আমার দ্বিধা আরও কেটে গেল। আমি আজই তা হলে ঢাকা রওনা হই?
আজই? বিশাখার বিয়েটা…?
“সে মাথা নাড়িল। বলিল, আমার কথা বাড়িতে উচ্চারণও করবেন না, বাবা। শুভকাজে মানুষের মন ভারাক্রান্ত হবে। শুধু আপনি জানলেন, আর মনুপিসি যেন জানেন। আর কেউ না।
“নৌকা ইতিমধ্যে মাঝগাঙে আসিয়া পড়িয়াছে এবং মাঝি মহা উৎসাহে জাল ফেলিতেছে। পকেটে কিছু টাকা আনিয়াছিলাম! বাহির করিয়া কৃষ্ণর হাতে দিয়া কহিলাম, তোমার কাজে লাগবে।
“সে ঈষৎ শিহরিয়া বলিল, এত টাকা কোন কাজে লাগবে? অল্প কিছু দিন।
“আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কহিলাম, বিষয়সম্পত্তি সব তোমারই থাকবে। ফিরে এসে নিয়ো।
১০০. ধ্রুব খুবই মনোযোগ দিয়ে
ধ্রুব খুবই মনোযোগ দিয়ে রেমিকে লক্ষ করছিল। বিশেষ করে ওর চোখ, দৃষ্টিতে কিছু অনিশ্চয়তা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে, কিন্তু পাগলামি নেই। তবে কিছুই বলা যায় না। মানসিক ভারসাম্য এমন একটা জায়গায় হয়তো পৌঁছে গেছে যেখান থেকে এক পা এগোলেই পাগলামির অথৈ খাদ।
এর জন্য কি আমিই দায়ি? মনে মনে আজ এই প্রশ্ন উদ্যত হল তার নিজের দিকে। ধ্রুব রেমিকে নিজের খুব কাছে টেনে আনল। একটা হাত দিয়ে তার কোমর জড়িয়ে নিজের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে রেখে বলল, তোমার কিছুই হয়নি। কেন ভাবছ?
রেমি দীনভাবে তার মুখখানা তুলে ধরল ধ্রুবর মুখের দিকে। এত কাছাকাছি দুজনের মুখ যে পরস্পরের খাস পরস্পরের মুখে পড়ছে। রেমি অনেকক্ষণ ধ্রুবর চোখে তার দুটি চোখ পেতে রাখল। তারপর বলল, তুমি বলছ? তুমি যদি আরও জোর দিয়ে বলল যে সত্যিই আমার কিছু হয়নি তা হলে বোধহয় আমার কিছু হবে না।
ধ্রুব কিছু বলল না, শুধু আরও ঘন করে, শক্ত করে ধরে রইল রেমিকে।
রেমি ভ্রু কুঁচকে ধ্রুবর মুখের দিকে চেয়ে সন্দিহান গলায় বলে, হঠাৎ এত আদর করছ কেন বলল তো! পাগল হয়ে যাচ্ছি বলে ভয় পাচ্ছ?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, না। তুমি পাগল হবে না, রেমি। পাগলামির লক্ষণ তোমার মধ্যে নেই।
তুমি তো আর ডাক্তার নও।
না হলেই বা! পাগলামির লক্ষণ চেনা যায়। বিশেষ করে নিজের বউয়ের।
আমি তোমার বউ তো কেবল নামে।
ধ্রুব মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। বলল, সেটাই ভাবছিলাম। যদি তুমি পাগল হও তা হলে হয়তো আমার জন্যই হবে। আমি তোমার মাথায় এতদিন ধরে নানা উলটো-পালটা আইডিয়ার বীজ বুনেছি। কাজটা হয়তো ঠিক হয়নি।
রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, যা বিশ্বাস করো তাই বলেছ। সেটা তো অন্যায় নয়। কিন্তু আমি একটা জিনিস একদম সইতে পারি না, সেটা হল আমাকে তোমার ত্যাগ করার কথা। তোমার ওই ত্যাগ করার কথা আমাকে দিনরাত কুরে কুরে খেয়েছে। ভিতরে ভিতরে কেবল ভয়, কেবল অনিশ্চয়তা, পায়ের তলা থেকে যেন কেবলই মাটি সরে যায়। আমি কোথায় দাঁড়াব বলো তো!
