“ছই সহ নৌকা নীল জলে দুলিতেছে, ভাসিতেছে। উপরে অখণ্ড আকাশ, জলে তাহারই শতধা ভঙ্গুর ছায়া। ঠিক এই জীবনের মতো। একটি শাশ্বত, একটি মায়া। তবে মায়ার ভিতরেও ওই শাশ্বতেরই খণ্ড খণ্ড ছায়া আছে। যে ছায়া লইয়া থাকে সে তা-ই থাক। যে আরও কিছু চায় সে উপরে দিকে চাহিবেই।
“আবার দর্শন। বড় জ্বালা হইল। বুড়া বয়সে কেবল কথা আসে, টিকা-টিপ্পনী আসে৷ রাজেনবাবু বলেন, মনুও বলে, আমি নাকি বুড়া নই। ভাল কথা। কিন্তু এই বকবগানি কীসের লক্ষণ তাহাও কি বলিয়া দিতে হইবে?
“যাহা বলিতে ছিলাম। নৌকা দুলিতেছে, ভাসিতেছে, আমার বক্ষদেশ আন্দোলিত হইতেছে। খাস গাঢ় হইয়া আসিতেছে। চোখের পলক পড়িতেছে না। খবর সত্য তো! সে আসিয়াছে তো! তাহার কোনও বিপদ ঘটিবে না তো!
“আচমকা ছইয়ের ভিতর হইতে একজন সুঠাম মাঝি বাহির হইয়া আসিল। লগিটা অবহেলায় তুলিয়া লইল। তাহার পর একটি ঝাঁকুনিতে নৌকাটিকে একেবারে তীরবর্তী করিয়া সংক্ষিপ্ত একটা হক মারিল, আসুন কর্তা।
“কম্পিত পদে ও বক্ষে তাড়াতাড়ি গিয়া নৌকায় উঠিলাম। লোকটা নিম্নস্বরে কহিল, ভিতরে যান।
“ভিতরে ঢুকিলাম। একদম শেষ প্রান্তে একটি সবল চেহারার কিশোের বসিয়া আছে। বেশভূষা মলিন। কিন্তু অমলিন তাহার হাসিটি। আমি বজ্রাহতের মতো দাঁড়াইয়া পড়িলাম। মাত্র এই কয়েক মাসের মধ্যে কৃষ্ণর কি এত পরিবর্তন হইয়াছে? এ যে সেই বালক নহে। এ যে রীতিমতো যৌবনোদ্যত পুরুষ! মুখের সেই কমনীয়তা কোথায় গেল? ছইয়ের ভিতরকার প্রদোষবৎ স্বল্প আলোকেও তাহার মুখের রেখাগুলির কাঠিন্য ও কর্কশভাব চোখে পড়ে।
“সে উঠিল। বলিল, বাবা, আপনি কেমন আছেন?
“আমি জবাব দিতে পারিলাম না। দীর্ঘকাল পরে সেই বিস্মৃত কণ্ঠে বাবা ডাক শুনিয়া আবেগে আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হইল, সর্বাঙ্গ কপিতে লাগিল। আমি তার দিকে কম্পিত একখানি হাত বাড়াইয়া দিলাম।
“সে সবল দুই বাহুতে আমাকে ধরিল। ধীরে ধীরে পাটাতনে বসাইয়া দিল। তারপর কোমল কণ্ঠে বলিল, আপনার শরীর ভাল আছে তো বাবা?
“তাহার কণ্ঠে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। নিজের পুত্র-কন্যাদের নিকট আমি যথার্থ ভালবাসা পাই নাই, তাহাদেরও আমি যথাযথ ভালবাসি নাই। ব্যতিক্রম শুধু এই কৃষ্ণ। আমার পিতৃহৃদয় কেবল কেন যেন তাহাকে কেন্দ্র করিয়াই মথিত হয়। আর সেও বিশ্বসংসারে সকলের নিকট অপদার্থ বলিয়া চিহ্নিত তাহার এই বাপটিকে কেন যেন বুক ভরিয়া ভালবাসে।
“আমি কিছুক্ষণ নীরবে অশ্রুবিসর্জন করিলাম। আবেগ কিছু প্রশমিত হইল। সেও অশ্রুসিক্ত দুখানি চোখ বারংবার মার্জনা করিল।
“আমি প্রশ্ন করিলাম, তুমি কেমন আছ?
“ভাল আছি. বাবা। আপনি অকারণ ভাববেন না।
কোথায় আছ, কী খাও, কী পরো কিছুই তো জানি না।
“সে হাসিয়া কহিল, তার তো কিছু ঠিক থাকে না, বাবা। আমাদের দলটা পুলিশের সঙ্গে লড়াইতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কে মরেছে, কে ধরা পড়েছে তা জানি না। একা একা কিছুদিন পালিয়ে বেড়াই। তারপর একদিন হঠাৎ পাবনার ঠাকুরের আশ্রমে হাজির হয়ে যাই। কাকার ঠাকুর তো, তাই সেখানেই আশ্রয় নিলাম।
“একটা নিশ্চিন্তের দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কহিলাম, নিলে! যাক বাঁচা গেল।
“সে ভ্রু কুঞ্চিত করিয়া কহিল, নিলাম, কিন্তু সব কথা ঠাকুরকে বলিনি। কেমন সংকোচ আর ভয় হল।
“আমি মৃদুস্বরে কহিলাম, যাঁকে গুরু বলে মানবে তাঁর কাছে কোনও কথা গোপন করতে নেই।
“সে হাসিয়া কহিল, আমি অগ্নিমন্ত্রে আগেই দীক্ষা নিয়েছি। আমাদের কর্মধারার সঙ্গে ঠাকুরের কিছু অমিল আছে। উনি বোধহয় আমাদের কর্মধারার সমর্থক নন। আমাকে উনি হঠাৎ এক রাত্রে বাঁধের ধারের তালুতে ডেকে পাঠালেন। তারপর খুব স্নেহের সঙ্গে বললেন, ঢাকায় চলে যাও, সেখানে গিয়ে সারেন্ডার করো।
উনি বললেন?
হ্যাঁ। শুনে আমি চমকে উঠলাম। আমি কে বা কোথা থেকে এসেছি তা তো ওঁকে বলিনি। একটা ছদ্মনাম আর ঠিকানা দিয়েছি মাত্র। কিন্তু উনি দিনরাত মানুষ ঘাঁটেন, কাজেই অনুমানশক্তি তীব্র এবং তীক্ষ। অনুভূতি ভীষণ প্রখর।
তুমি কী বললে?
আমি কিছু বলিনি। মাথা নিচু করে ছিলাম। উনিই বললেন, এভাবে পালিয়ে বেড়িয়ে কোনও লাভ হবে না। বরং সারেন্ডার করলে পথ পাবে। তখন আমি বললাম, আমার বিরুদ্ধে খুনের চার্জ আছে। ধরলে ফাঁসি দেবে। উনি তবু বললেন, যা বলছি তা করলে ভালই হবে। এখানে নয়, ঢাকায় চলে যাও। সেখানে সারেন্ডার করো।
তুমি কি তাকে বিশ্বাস করতে পারছ না?
“কৃষ্ণ কিছুক্ষণ–কুঞ্চন করিয়া কী ভাবিয়া কহিল, তাকে আমার খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়। মানুষের প্রতি ওরকম অগাধ ভালবাসা আর কারও মধ্যে কখনও দেখিনি। অদ্ভুত মানুষ। কিন্তু সারেন্ডার করার ব্যাপারে আমার দ্বিধা আছে।
তুমি বুদ্ধিমান, বিবেচক। আমি আর তোমাকে কী বলতে পারি? যা ভাল বুঝবে করবে।
না বাবা, আমি আপনার পরামর্শও চাই। সাত দিন আগে আমি ঢাকায় যাচ্ছি বলে আশ্রম থেকে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু ঢাকায় যেতে মন সরেনি। এখানে গত চারদিন ধরে এই নৌকোয় বাস করছি। ছোড়দির বিয়ের খবর পেয়েছি।
“আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিলাম। কহিলাম, আরও একটা খবর তোমার জানা দরকার। তোমার কাছে সত্য গোপন করতে পারব না, তাতে তুমি আমাকে ঘৃণা করলেও না।
“সে মৃদু হাসিয়া কুণ্ঠিত স্বরে বলিল, আপনাকে বলতে হবে না। আমি জানি। মনুপিসি আমাদের নতুন মা হয়েছেন।
