উঁচু পাড়ের ওপর হেমকান্ত দাঁড়ালেন। সতর্কভাবে চারদিক দেখে নিলেন। কেউ ধারেকাছে নেই। দ্রুত পায়ে তিনি নামতে লাগলেন। শেয়ালের গর্ত, উঁচু-নিচু জমি, মাটির ঢেলা–চলা বড় শক্ত। তবু হেমকান্ত দ্রুতবেগ বজায় রাখলেন। ধুতি কাটাঝোপে লেগে ফড়ফড় করে ছিঁড়ে গেল। চামড়ায় চিড় ধরল কয়েক জায়গায়। জুতো কাদায় মাটিতে মাখামাখি। শেষ কয়েক পা ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে গেলেন। উঠলেন, আবার পড়লেন। অবশেষে খানিকটা দমফোট অবস্থায় জলের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন। নিজের শারীরিক অবস্থার দিকে খেয়াল নেই। কিছু টেরও পাচ্ছেন না।আকুল, তৃষ্ণার্ত দুই চোখে চেয়ে রইলেন অদূরে বাঁশের লগিতে বাঁধা নৌকোর ছইয়ের অন্ধকার মুখটির দিকে।
পরে ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “…শরীর বলিয়া যে একটা ছাইবস্তু আছে তাহা তো টেরই পাই নাই। কাটাঝোপ, খানাখন্দ, পিছল মাটির সেই নাবালকে যেন রাজপথ মনে হইতেছিল। কাঁটায় কাটিয়া ছিড়িয়া গিয়াছে অনেক, পতনে কালশিটাও পড়িয়াছে, তদপেক্ষা গুরুতর নদীতটের ওই অংশে বিষধর সর্পের অভাব নাই, তাহার একটা অনায়াসে দংশন করিতে পারিত। কিন্তু আমি জানি ব্যথা-বেদনা সর্পদংশন কিছুই তখন আমি টের পাইতাম না। শরীরী হইয়াও সেই মুহূর্তে আমি শরীরের অনেক উর্ধ্বে বিরাজ করিতে ছিলাম। এক বাধাবন্ধনহারা আকর্ষণ, এক নাড়িছেড়া টান আমাকে যেন আছাড়ি-পিছাড়ি করিয়া লইয়া যাইতেছিল।
“ঘটনার কথা পরে লিখিতেছি। তাহার আগে আমার এই শরীর-চেতনার কথা বলিয়া লই। নদীতটে সেই দিনের সেই অভিজ্ঞতা লইয়া যতই ভাবিতেছি ততই যেন এক ঘন কুয়াশায় ঢাকা রহস্যের যবনিকা থিরথির করিয়া কাপিয়ে উঠিতেছে। যেন কী একটা সত্য ধরা পড়িবে পড়িবে করিতেছে। অনেক ভাবিয়া ভাবিয়া ঘুরিয়া ফিরিয়া কেবল মনে হইতেছে, স্নেহের টান যদি শরীর ভুলাইতে পারে তবে বৃহত্তর স্নেহ, আরও প্রগাঢ় স্নেহ হয়তোবাশরীরের মোহ চিরদিনের মতো ঘুচাইতে সক্ষম।
“মানুষ মরিতে ভয় পায়। মৃত্যুকে জয় করাই তাহার জৈবিক চাহিদা। বাঁচিব, মরিব কেন, এই বার্তাই তাহার অন্তস্তল হইতে নিয়ত প্রবাহিত হইতেছে। আমিও জীব। কিন্তু প্রিয় পুত্রের দর্শনাভিলাষে সেদিন ওই দুর্গম পথে মৃত্যু ঘটিলে বা ঘটিবার উপক্রম করিলে তো বিন্দুমাত্র বিচলিত বোধ করিতাম না! কেন? তাহার কারণ ওই স্নেহ। স্নেহ যে কী প্রগাঢ় বস্তু, ইহা যে কত মূল্যবান এবং যুগে যুগে যে কেন স্নেহ, প্রেম, ভালবাসার এত জয়গান করা হইয়াছে তাহাও অল্পসল্প বুঝিতে পারিতেছি। প্রেম মৃত্যু উপশমকারী, ইহার মতো নিদান আর নাই।
“ঈশ্বরকে আমি তেমন ভালবাসিতে পারি নাই। যাঁহারা পারিয়াছেন তাঁহারা ভাগ্যবান। ভালবাসিবার পূর্বে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসটা পোক্ত হওয়া দরকার। তাহার সৃষ্ট জগতের সবকিছুরই অস্তিত্ব প্রকাশমান, কেবল তাহার অস্তিত্বই প্রমাণের অপেক্ষা রাখে–ইহা কি সৃষ্টিকর্তার এক প্রচণ্ড রসিকতা! সমস্যাও সেখানেই। যাহাকে দেখি নাই, যাহার অস্তিত্বের তেমন কোনও প্রকট প্রমাণ নাই, কেবল কতকগুলো শাস্ত্রগোলা কথা আছে, তাহাকে যুক্তির খাতিরে এবং পুরোহিতদের ভয়ে না হয় মানিয়া লওয়া গেল। কিন্তু ভালবাসা তো সেই পথে আসিবে না!
“সত্য বটে, সেই বিরাট বিপুল নিরাকারকে ভজিবার জন্য আবহমানকাল হইতে মানুষ নানা প্রতীক খাড়া করিয়া আসিয়াছে। আমাদের তো তেত্রিশ কোটি প্রতীক। কালী, দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, শিব, কৃষ্ণ অভাব নাই। কিন্তু এই প্রতিমা পূজার ব্যাপারটি মানিয়া লইলেও আমি কী জানি কেন ইহার মধ্যে একটি ছেলেমানুষি দেখিতে পাই। মাটি, সোনা বা রূপা যাহা দিয়াই গড়িয়া লও না কেন উহা তো মানুষেরই নির্মাণ। তাহাকে দেবতা ভাবিয়া হৃদয় উদ্বেল হইবে কী করিয়া?
“উপরন্তু আর একটি কথাও আছে। এই পুতুল পূজা করিয়া একটি আত্মসন্তুষ্টি পাওয়া যায় বটে, কিন্তু ইহাতে প্রবৃত্তির গায়ে হাত পড়ে না, ফলে বিগ্রহ-পূজারির মধ্যেও চৌর্যবৃত্তি, হীনমন্যতা এবং ঈর্ষা প্রবল। ধর্মের নানা দিক। কিন্তু লৌকিক পূজা-পার্বণের ভিতর আমি কোনও অবলম্বন আজিও খুঁজিয়া পাই নাই।
“নলিনী বাচিয়া থাকিতে একদা আমাকে বলিয়াছিল, দাদা, পুরোহিতের কাছে ধর্ম ব্যাখ্যা শোনার চেয়ে নাস্তিক হওয়া ভাল। কুলগুরু বা পুরোহিত সে দুই চোখে দেখিতে পারিত না। সে প্রায়ই বলিত, তিনি রূপ ধরে আসেন, তাকে জন্মাতেই হয় বারবার, নইলে চলবে কী করে?
নলিনী তাহার ঠাকুরের মধ্যে তাঁহাকে পাইয়াছিল। সে যে সঠিক পথেরই সন্ধান পাইয়াছিল তাহা তাহার চোখ-মুখের দীপ্তিতেই প্রতিভাত হইত। অকালমৃত্যু তাহাকে সংসারের বন্ধন হইতে মুক্তি দিয়াছে, কিন্তু সেই ঘটনার ব্যাখ্যা কীরূপে করিব? কতবার ভাবিয়াছি, এই তো কাছেই পাবনা। যাই ঠাকুরকে একবার দেখিয়া আসি। কিন্তু গড়িমসি করিয়া যাওয়া হয় নাই। গিয়া পড়িলে হয়তো এই জন্মেই জন্মের রহস্য ভেদ করিতে পারিতাম। হয়তো সেই শাশ্বতকে পাইতাম, যাহা নলিনী পাইয়াছিল, যাহা কালক্রমে কৃষ্ণও পাইবে।
“হ্যাঁ, কৃষ্ণর কথা। তাহার কথাই তো বলিতে বসিয়াছি, আজ আমার কত আনন্দ। ডায়েরি লিখিবার পূর্বে বার বার অঙ্গ শিহরিত হইয়াছে। তাহার মুখোনি দেখিয়াছি। প্রাণ ভরিয়া দেখিয়াছি। কতদিন বাঁচিব কে জানে! হয়তো এই আয়ুতে আর বেড় পাইব না। কর্মচক্রে সে কতদুর ভাসিয়া যাইবে, আমিও বা গিয়া কাশীর কোন গলিতে খাবি খাইতে খাইতে মরিব!
