তোর মতলবটা কী বল তো ফ্যাতন?
ফ্যাতন হাসল। প্রশান্ত হাসি। তার বেঁটেখাটো মজবুত চেহারাটা এবং চোখের দৃষ্টিতেই পরিষ্কার ছাপ আছে মানুষটার। গুন্ডামি, লোচ্চামি, খচরামি সবই ফুটে আছে চোখে আর চেহারায়।
ধ্রুব একটু চেয়ে রইল। তারপর চাপা গলায় বলল, মেয়েটাকে ট্রাবল দিস না। ও কিছু করেনি।
কে বলল ট্রাবল দেব?
তোর মতলব ভাল মনে হচ্ছে না।
ফ্যাতন মাথা নেড়ে বলল, ওসব নয়। জগাদা এসেছিল।
জগাদা! কবে?
পরশু। বলে গেল নজর রাখতে।
জানে নাকি কিছু?
সব জানে।
কী বলে গেছে? —উদ্বিগ্ন ধ্রুব জিজ্ঞেস করে।
বলে গেছে, নজর রাখতে। মেয়েটা সুবিধের নয়। তোমাকে বিপদে ফেলতে পারে।
বাবার কানে গেছে?
তা আমি জানি না। আমার কাজ আমি করছি।
তোকে কিছু করতে হবে না। লিভ হার অ্যালোন। মেয়েটা এমনিতে যা-ই করে বেড়াক, আসলে দুঃখী। ওকে ছেড়ে দে।
ধরবার কথাও তো কিছু হয়নি, বস। আমি কিছু করব না। ভয় নেই।
তা হলে আজ তুই এখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলি কেন?
ফ্যাতন হেসে বলল, তোমাকে অভয় দেওয়ার জন্য।
তার মানে?
তার মানে, চালিয়ে যাও বস, লাইন ক্লিয়ার।
জগাদা কি তোকে এই কথা বলে গেছে?
ফ্যাতন মাথা নাড়ল। বলল, জগাদা বলে গেছে, দাদাবাবু এখানে নোটন নামে একটা মেয়ের কাছে আসে। তুই একটু নজর রাখিস।
ব্যস! আর কিছু বলেনি?
না।
তীব্র একটা ঘেন্না হচ্ছিল ধ্রুবর। নিজের ওপর। নিজের চারপাশটার ওপর। ফ্যাতন তার সঙ্গে বাইরে এল। একটা ট্যাকসি ধরে দিয়ে বলল, যখন খুশি চলে এসো। লাইন ক্লিয়ার থাকবে। কেউ হুজ্জোতি করবে না।
কথাটার জবাব দিল না ধ্রুব। ট্যাকসিতে পাথরের মতো বসে রইল।
বাড়ি ফিরেই সে জগাকে ডাকল নিজের ঘরে।
কী ব্যাপার বলে তো জগাদা?
জগা একটু তটস্থ হয়ে বলে, কীসের ব্যাপার?
তুমি নোটনের খবর পেলে কী করে?
জগা কঠিন মুখ করে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, কেন?
জানলে কী করে বলল আগে।
সেটা জেনে কী হবে?
নোটনের কথা তুমি বাবাকে বলেছ?
বলেছি।
সব?
সব আমি জানি না। যেটুকু জানি বলেছি।
বাবা কী বলল?
কিছুই না।
তার মানে?
কর্তাবাবু তোমাকে ধর্মের নামে ছেড়ে দিয়েছে।
বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল জগা।
ধ্রুব বলল, আমার ওপর এখনও তোমরা নজর রাখো?
রাখতে হয়। না রাখলে তুমি বিপদে পড়বে।
আমার বিপদ নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে কে বলেছে?
জগা এবার ধ্রুবর দিকে তাকায়। চোখে আগুন। চাপা কিন্তু সাংঘাতিক আক্রোশের গলায় বলে, তোমার বংশে এরকম বেলেল্লাপনা কেউ কখনও করেনি, দাদাবাবু। বুঝলে! আমাদের মতো ছোট ঘরে যদি জন্মাতে আর এসব করে বেড়াতে তবে কবে তোমার গলা টিপে ভূত ছাড়িয়ে দিতাম।
ধ্রুব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, সাব্বাস জগাদা। আর তুমি তোমার কর্তাবাবুর। হয়ে যা সব করে বেড়াও সেগুলো সব পুণ্যের কাজ, না?
পলিটিকসে ওসব লাগে। কিন্তু বলল তো কর্তাবাবুর কখনও কোনও চরিত্রের দোষ ছিল?
ধ্রুব হেসে ফেলল। তারপর বড় একটা খাস ছেড়ে বলল, মদ আর মেয়েমানুষ বাদ দিলে আর কোনও কাজেই বোধহয় চরিত্র নষ্ট হয় না, না!
কর্তাবাবু পলিটিকস করেন, আর কিছু নয়। ওরকম মানুষ বেশি নেই বুঝলে দাদাবাবু।
ধ্রুব অপলক চোখে এই সম্মোহিত লোকটিকে দেখছিল। কৃষ্ণকান্ত একে যে গভীর হিপনোটিজমে আচ্ছন্ন করে রেখেছে তা থেকে এর মুক্তি নেই। এর পাপ-পুণ্যের ধারণাও রাহুগ্রস্ত। একে কিছুই বোঝানো যাবে না।
ধ্রুব বলল, নোটনকে কী করতে চাও তোমরা?
জগা একটা চাপা গর্জনের স্বরে বলল, কিছুই না।
কেন? ওর ওপর এত দয়া কেন?
কর্তাবাবু চাইলে ওর লাশ আদি গঙ্গায় ভাসত। কিন্তু—
কিন্তু কী জগাদা?
কর্তাবাবু তোমাকে ধর্মের নামে ছেড়ে দিয়েছেন, বললাম তো!
আমিও তো তাই জানতে চাই, হঠাৎ তোমাদের নোটনের ওপর এত দয়া কেন?
শুনবে?
শুনি।
কর্তাবাবু প্রথম দিন শুনে রেগে গিয়েছিলেন। পরদিন সকালে আমাকে ডেকে বললেন, ধ্রুবর তো কখনও মেয়েমানুষের দোষ ছিল না। এ মেয়েটার সঙ্গে যদি তেমন মেলামেশা করেই থাকে তো করতে দে। পুরুষমানুষের বোধহয় একটু স্বাধীনতা দরকার। বেশি আঁটবাঁধ দিলে বিগড়ে যায়।
ধ্রুবর চোখ থেকে যেন একটা ঠুলি খুলে পড়ল। কৃষ্ণকান্ত একথা বলেছেন! কৃষ্ণকান্ত!
তুমি যাও, জগাদা।
বলে ধ্রুব বিছানায় এলিয়ে চোখ বুজে রইল। এর চেয়ে বড় পরাজয় জীবনে তাকে ভোগ করতে হয়নি। অবসাদ ছিলই। এখন যেন এক জড়তা তাকে পাকে পাকে জড়িয়ে ধরল। সবাই সব জানে। সবাই সব খবর রাখে। শুধু তাই নয়, নোটনের সঙ্গে যাতে সে নিরাপদে মেলামেশা চালিয়ে যেতে পারে তারও সুষ্ঠু ব্যবস্থা হয়ে আছে।
এর চেয়ে মৃত্যু কি ভাল ছিল না?
কতক্ষণ শুয়ে ছিল ধ্রুব তার হিসেব নেই। দরজায় ঠুকঠুক শব্দ শুনে উঠে বসল।
কে?
আমি।–বলে রেমি এসে ঘরে ঢোকে। কেমন অস্বাভাবিক ঝলমল করছে মুখ। লালচে একটু আভা। ঠোঁটে অস্বাভাবিক হাসি।
তুমি! —ধ্রুব একটু নির্জীব হয়ে যায়।
কখন এলে?
অনেকক্ষণ।
আমি তোমার কাছে একটু বসব?
বোসো।
রেমি কাছে এসে বসল। পা গুটিয়ে, জড়োসড়ো হয়ে।
কী চাও, রেমি?
কী যে চাই কিছু বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ গো, আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?
০৯৯. নীল আকাশের প্রতিবিম্বে নীলাভ জল
নীল আকাশের প্রতিবিম্বে নীলাভ জল, তাতে ছলাৎ ছল ঢেউ ভাঙছে। পচা পাট আর বাঁশের একটু কটু গন্ধ। পিছল পাড় ঢালু হয়ে নেমে গেছে। দণ্ডকলস আর কাঁটাঝোপে আকীর্ণ এই জায়গাটা আসলে আঘাটা। মানুষের মল শুকিয়ে আছে এখানে সেখানে। জলে ছোট্ট একটা ছই-তোলা নৌকো। একটু দূরে নোঙর করেছে। কাউকে দেখা যায় না।
