এখন যা।
জগা চলে গেল।
কৃষ্ণকান্ত কাঁকা ঘরেও ভ্রুকুটি করে বসে রইলেন। কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ আপন মনেই হেসে
উঠলেন।
তোকে কে রেখেছে বল তো!
রেখেছে?–নোটন ভ্রু কুঁচকে ধ্রুবর দিকে তাকায়, তার মানে?
এই যে চকচকে নতুন ফ্ল্যাট, ভাল সব ফার্নিচার, টিভি, তোর নিশ্চয়ই এত রোজগার নয়। কে দিচ্ছে এত?
তার মানেই কি রাখা?
রাখা কথাটা যদি অপছন্দ হয় তবে আধুনিক একটা শব্দ আছে। স্পনসরশিপ। তোকে কে স্পনসর করছে বল তো! বেশ এলেমদার আদমি মনে হচ্ছে।
নোটন হাসল না। ভ্রু কুঁচকে রেখেই বলল, তোমার মন বড্ড নোংরা।
এতদিনে বুঝলি? নোংরা না হলে তোর মতো মেয়ের খপ্পরে এত সহজে পড়ে যাই?
এই রূঢ়তায় নোটন অভ্যস্ত হয়ে গেছে গত কয়েকদিনে। তবু মুখখানায় ক্লিষ্ট একটা ভাব দেখা দিল। তারপর বলল, খুব সহজে হয়নি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে তোমাকে পেয়েছি। আমি কীরকম মেয়ে বলল তো!
ওসব নিয়ে আর কথা তুলিস না। যা বলছি তার জবাব দে। লোকটা কে?
তা জেনে তোমার কী হবে?
ধ্রুব স্থির চোখে নোটনের দিকে চেয়ে রইল। নোটন জানালার কাছে একটা টেবিলের ওপর বসে আছে। মুখ বাইরের দিকে ফেরানো। ধ্রুবর দিকে ইচ্ছে করেই চাইছে না তা ধ্রুব জানে।
একটু আগেই তারা বিছানায় ছিল। বাইরে মরে আসছিল বিকেল। ধ্রুবর সেই শারীরিক যুদ্ধ মোটেই ভাল লাগছিল না। নোটন তাকে জোর করে নামিয়েছে এই যুদ্ধে। অকারণ। সে জানে নোটনের মতো মেয়ের বিশেষ একজনের প্রতি অত টান থাকার কথা নয়। উপরন্তু ধ্রুব এও জানে, এই ফ্ল্যাট, এই বিছানা, এই সাজসজ্জা এত সব আয়োজন অলক্ষে কেউ করেছিল নোটনের সঙ্গে ফুর্তি করবে বলেই। নোটন সম্ভবত তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকছে না। রাখা মেয়েমানুষেরও একটা এথিকস থাকা উচিত।
ধ্রুব বলল, তার নাম জেনে আমার লাভ নেই ঠিকই। কিন্তু কেউ যে একজন তোকে স্পনসর করছে এটা তো ঠিক!
হ্যাঁ।
সে এই ফ্ল্যাটে আসে?
এখনও আসেনি।
আসবে তো?
সে এখন দেশের বাইরে আছে।
বিদেশে?
হ্যাঁ।
আর সেই সুযোগে তুই আমাকে ফাউ জুটিয়েছিস!
নোটন চুপ করে রইল। তারপর স্নান গলায় বলল, ফাউ কেন হবে? তুমি ফাউ একথা কে বলল?
ফাউ নই তো কী?
ওসব কথা থাক। তুমি আজ আমাকে সহ্য করতে পারছ না।
পারছি না তো বটেই। সব কথা তুই কখনও আমাকে খুলে বলিসনি।
নোটন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতেই অস্পষ্ট গলায় বলল, নতুন কোনও কথা তো আর নয়। আমি কেমন তা তো তুমি জানোই।
আমাকে জুটিয়েছিস কেন? আমাকে দিয়ে তোর কী হবে? বিয়ে করে ঘর করতে চাস? সেটা আকাশকুসুম কল্পনা। তোকে আমি কোনওদিনই বিয়ে করব না। তারপর তোর নিজের মক্কেল আছে। বিদেশ থেকে সে একদিন ফিরবে। তখন তাকে রিফিউজ করার মতো জোর তোর থাকবে। তা হলে এসব কেন করছিস? আমি এসব এনজয় করছি না নোটন, আমার ভাল লাগছে না।
এত বকছ কেন গো? একটু চুপ করো না!
চুপ করছি, নোটন। আজ উঠি।
চকিতে নোটন উঠে কাছে আসে। সামনে দাঁড়িয়ে সজল দুখানা চোখ তুলে চোখে রেখে বলে, কাল আসবে না?
না। আমার তোকে আর ভাল লাগে না।
ধ্রুব এই কথা বলে আর দাঁড়াল না। দরজা খুলে বেরিয়ে এল। তীব্র এক পরাজয়ের গ্লানি তার সমস্ত শরীরে অবসাদের মতো জড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে নিজেকে ভীষণ ঘেন্না হয় তার।
আজ অবধি, নোটনের আগে অবধি, কোনও মেয়ের সঙ্গে এতদূর নামেনি ধ্রুব। ইচ্ছে হয়নি। এ ব্যাপারে কোনও শুচিতাবোধ বা সংস্কার নেই তার, কিন্তু মেয়েমানুষের শরীরভিক্ষার মধ্যে পৌরুষের একটা অবনমন ঘটে বলে তার ধারণা। তার বোধ তাকে অহরহ মেয়েমানুষ থেকে দূরে রেখেছে। কিন্তু পা কাটল পচা শামুকে। নোটন। হায় নোটনের মতো সহজলভ্যার কাছে তাকে হার মানতে হল!
কেন? এ প্রশ্নের জবাব সে নিজের মধ্যে খুঁজে পায় না। সম্ভবত নোটনের মধ্যে একটা করুণ আত্মসমর্পণ তাকে নরম করে ফেলেছিল। কিংবা ওদের যে একসময়ে খুব অপমান করা হয়েছিল তার প্রতিক্রিয়া কাজ করেছে ভিতরে ভিতরে। যাই হোক, পরাজয় ঘটেছে। আর ঘটেছে বলেই নোটনকে আর-একটুও সহ্য করতে পারছে না ধ্রুব।
তিনতলা থেকে ঝড়ের বেগে নীচে নামছিল ধ্রুব। সিঁড়ির নীচে একটা লোক দারোয়ানের টুলের পাশে দাঁড়ানো। উধ্বমুখ।
ধ্রুব থমকাল। ফ্যাতন না!
ফ্যাতনই। ধ্রুবকে দেখে একটু হাসল, কী গুরু, এখানে?
ধ্রুব একটু হাফাচ্ছিল। উত্তেজনায়, পরিশ্রমে। মুখোমুখি হয়ে বলল, তুই এখানে কেন?
এ বাড়িতে কার কাছে, গুরু?
আছে একজন।
এটা আমার এলাকা, জানো তো!
না জানার কী?
সব দিকে নজর রাখতে হয়। তোমার চিড়িয়াটা কে?
বললাম তো চিনবি না।
নোটন নাকি?
ধ্রুব একটু রোষ কষায়িত চোখে চেয়ে বলল, তাতে তোর কী?
কিছু নয়, বস। রাগছ কেন? শুনলাম মাল খাওয়া ছেড়ে বৈরাগী হওয়ার ফিকির খুঁজছ!
কে বলছে এসব কথা?
তোমার দোস্ত প্রশান্ত।
না, মাল খাচ্ছি না। পেটে ব্যথা হয়।
ব্যথা ফের কমেও যায়। চলল, আজ আমি খাওয়াব।
না, ফ্যাতন। আমার তাড়া আছে।
নোটনের সঙ্গে তোমার কবে থেকে?
তুই ওকে চিনিস?
বহুত খুব। মালটা ভাল।
তোর সার্টিফিকেটের দরকার নেই।
আছে গুরু, আছে।
ধ্রুব বিরক্ত হয়। কিন্তু সেটা তেমন ঝঝের সঙ্গে প্রকাশ করতে পারে না। ভিতরে ভিতরে একটা অবসাদ, একটা অপরাধবোধ কুরে কুরে খাচ্ছে। একটা শ্বাস ফেলে বলল, ফ্যাতন, আমাকে বেশি বকাস না। আজ মেজাজ ভাল নেই।
কেন? নোটনের সঙ্গে কিচাইন হয়েছে নাকি?
না।
হলে বোলো, মাল ফিট করে দেব।
