“বিবাহের আগের রাত্রে চারিদিকে নানা হইচই চলিতেছে। হারিকেন ও হ্যাজাক জ্বালাইয়া চারদিকে নানারূপ নির্মাণ ও মেরামত তদারকি ও খবরদারি চলিতেছে। আমি বৈঠকখানায় বসিয়া কনককান্তির সহিত একটি ফর্দ মিলাইতেছিলাম। এমন সময় কানাই মাঝি আসিয়া একটা নমস্কার করিয়া দাঁড়াইল।
কী রে?
একটু কথা আছে, হুজুর।
কী কথা? আড়ালে বলা দরকার।
“উঠিয়া বাহিরে আসিলাম। কানাই খুব নিচু স্বরে কহিল, বেশি দেরি করবেন না। ভিতর বাড়িতে গিয়ে একটা চাদর মুড়ি দিয়ে খিড়কি ধরে বেরিয়ে সদরঘাটে চলে আসুন। কেউ যেন না দেখতে পায়, হুজুর।
কী হয়েছে বলবি তো! তিনি এসেছেন। আমার নৌকোয় আছেন।
কে? কে? কার কথা বলছিস?
“কানাই নিচু স্বরে আমাকে একটু ভর্ৎসনা করিল, হুজুর কি তার বিপদ ডাকতে চান? চুপ মারুন। যা বলছি করুন গে।
“আমার বুক, পা, হাত কাঁপিতে লাগিল। সে আসিয়াছে। আমার পুত্ররত্ন আমার তৃষিত বক্ষের অমৃতধন সে কি আসিয়াছে? এ কি সত্য হইতে পারে? সে বাঁচিয়া আছে। সে ধরা পড়ে নাই!
“ঘরে আসিতেই কনককান্তি উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, কী হয়েছে, বাবা? আপনি এমন করছেন কেন?
“আমি মাথা নাড়িয়া কহিলাম, কিছু নয়। ও লোকটা কে বলুন তো। তুমি চিনবে না। কোনও খারাপ খবর নেই তো!
না, না। চিন্তা কোরো না।
“নিজের মনের ভাব গোপন করিবার কোনও প্রতিক্রিয়াই আমার জানা নাই। এর জন্য বহুবার অপ্রস্তুত হইতে হইয়াছে। কৃষ্ণর আগমন-সংবাদে আরও বেসামাল হইয়া পড়িয়াছি।
“কনককে ফর্দ মিলাইতে বসাইয়া নিজের ঘরে আসিলাম। একটা কালো শাল আলমারি হইতে বাহির করিয়া কাঁধে লইয়া বাহির হইতে যাইব, এমন সময় মনু আসিয়া দাঁড়াইল, কোথায় যাচ্ছ?
একটু ঘুরে আসি।
এত রাতে ঘুরতে যাচ্ছো!
মাথাটা গরম লাগছে, মনু।
সে তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
“মনু খানিকক্ষণ অপলক নেত্রে আমাকে দেখিল। তারপর বুকের উপর হাত রাখিয়া কহিল, ঝগড়াঝাঁটিতে খুব মুষড়ে পড়েছ তো! ওসব মনে রেখো না। মেয়েমানুষ এক নিকৃষ্ট জীব।
“আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলিলাম। আমার সময় নাই। কহিলাম, একটু ঘুরে আসছি, মনু।
তা কালো শাল নিলে কেন?
ইচ্ছে হল।
অমন পুঁটলিই বা পাকিয়েছ কেন? গায়ে দাও।
“তাড়াতাড়ি শাল খুলিয়া গায়ে দিলাম।
“মনু মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, তোমাকে ভারী উত্তেজিত দেখাচ্ছে। মুখটা টকটক করছে লাল। কেন গো?
কিছু হয়নি, মনু। দোহাই।
“মনু পথ ছাড়িল না, হঠাৎ বলিল, দাঁড়াও। বেশি সময় নেব না।
কী করবে?
আমি সঙ্গে যাব।
তুমি? দোহাই মনু, না।
কেন বলো তো!
কারণ আছে। ফিরে আসি, তারপর শুনো।
“মনু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কহিল, দুর্গা দুর্গা। এসো গে। ভাল খবর হলেই ভাল।
“বাহির হইতে যাইতেছি, মনু হঠাৎ ডাকিল, শোনো, খিড়কি দিয়ে বেরোবে তো! “অবাক হইয়া কহিলাম, হ্যাঁ।
না। ওদিকে পুলিশের লোক আছে।
তবে?
কুঞ্জবনে চলে যাও। দাঁড়াও, আমিও যাচ্ছি।
৯৮. কৃষ্ণকান্ত নিজের বাইরের ঘরটায় এসে
কৃষ্ণকান্ত নিজের বাইরের ঘরটায় এসে বসবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিঃশব্দে জগা এসে দাঁড়াল। মুখ গম্ভীর এবং কঠিন।
কৃষ্ণকান্ত একবার তার মুখের দিকে চেয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে বললেন, বল, কী হয়েছে?
দেশের বাড়ির পুরুত বিনোদচন্দ্রের নাতনিকে আপনার মনে আছে?
কে বল তো!
দাদাবাবুর সঙ্গে যার সম্বন্ধ এসেছিল বলে আপনি খুব রাগ করেছিলেন।
তার কী হয়েছে?
সে এখন কলগার্ল। সিনেমা-থিয়েটারও করে বেড়ায়।
বটে!
দাদাবাবু ফের তার খপ্পরে পড়েছে।
ফের বলতে? আগে কিছু ছিল নাকি?
না। তবে বিয়ের একটা কথা হয়েছিল তো! ওর মা খুব হন্যে হয়ে পড়েছিল।
ঘটনাটা কী? দাদাবাবুকে কদিন আগে অফিস থেকে তুলে নিয়ে যায়। সেদিনটার বিশেষ খবর জানি না। অফিসের অনেকেই দেখেছে। একজন বেয়ারা আমাকে খবরটা দেয়।
তারপর?
মেয়েটা টালিগঞ্জের দিকে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে। দাদাবাবুকে মাঝে মাঝে ওখানে নিয়ে যায়।
কৃষ্ণকান্ত ভ্রুকুটিকুটিল মুখে জগার দিকে তাকালেন, এটা নিয়ে কটা হল?
বেশি নয়। কিন্তু দাদাবাবুর আর যাই দোষ থাক মেয়েমানুষের কারবারটা ছিল না।
কৃষ্ণকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ছিল না বলতে কী বোঝাতে চাস? বরাবর মেয়েরা ওর পিছনে ঘুরত। ও পাত্তা দিত না। এই তো!
হ্যাঁ, তাই।
আজকাল দিচ্ছে তো!
মনে হচ্ছে। ধারা নামে সল্টলেকের সেই মেয়েটা তো পুলিশ অবধি ডেকেছিল।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নাড়লেন। তারপর খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। স্বগতোক্তির মতো। বললেন, রুচিটা নেমে যাচ্ছে।
রুচি?
কৃষ্ণকান্ত জগার দিকে কঠিন চোখে চেয়ে বললেন, এসব থার্ড ক্লাস মেয়ে ওর নাগাল পাচ্ছে কী করে?
সব খবর তো পাওয়া যায় না।
এ মেয়েটার নাম কী জানিস?
নোটন ভট্টাচার্য।
খুব খারাপ?
বললাম তো কলগার্ল।
বামুনের মেয়ে হয়ে এত নীচে নামে কী করে?
বামুন কায়েত শুদ্র সব আজকাল আর আলাদা করা যাচ্ছে না, একাক্কার!
ভদ্রলোক ছোটলোকও আজকাল আর আলাদা করা যাচ্ছে না, না?
জগা মাথা নিচু করল।
কৃষ্ণকান্ত সামান্য একটু হাসলেন। বললেন, নোটন না কী যেন নাম বললি!
নোটন।
ওর ফ্ল্যাটে ওর মা ভাই থাকে না?
তারা আলাদা বাসায় থাকে।
মেয়েটা একা?
হ্যাঁ।
মেলামেশাটা কতদূর তা খবর নে।
কিছু করতে হবে?
না। এখন হাত দেওয়ার দরকার নেই।
যদি বলেন তো মেয়েটাকে একটু শাসিয়ে দিতে পারি।
কৃষ্ণকান্ত একটা ধমক দিলেন, নাঃ। একবারের বেশি দুবার বলতে হয় কেন?
ঠিক আছে।
