“দাঁড়াইয়া এইসব শুনিতে ঘৃণা হইতেছিল। নিঃশব্দে সিঁড়ি বাহিয়া উপরে আসিলাম, সামনেই মনু দাঁড়াইয়া ধোপার হিসাব লইতেছে, সে যেখানে দাঁড়াইয়া আছে সেখান হইতে দরদালানের কথা সবই শোনা যায়। তবু তাহার মুখে বৈলক্ষণ্য নাই।
“আমি ক্রুদ্ধ স্বরে তাহাকে বলিলাম, গয়নার বাক্সটা ওদের মুখের ওপর ছুড়ে ফেলে দাও।
“রঙ্গময়ি লঘু স্বরে কহিল, তাতে ওদের নাক ভাঙবে? কিন্তু তুমি অত রেগে যাচ্ছ কেন? বলছে বলুক না। গয়না দিলে আমাদের চলবে না।
কেন চলবে না?
মোট একশ বাইশ ভরি সোনা আছে। পান বাদ দিলে অনেক কমে যাবে। কর্মকার মশাইয়ের সঙ্গে কথা হল তো সেদিন।
ঠিক আছে। আমি গয়না নতুন গড়িয়েই বিশাখার বিয়ে দেব।
তা না হয় দিলে। কিন্তু জড়োয়ার যে সেট সুনয়নীর আছে তার পাথরগুলো কী জানো তো? ত্রিশখানা হীরে, আশিটা মুক্তো, পান্না— এসব কি গাছ থেকে পাড়বে? অত টাকা তোমার কই?
না হলে হবে না।
“মনু ফুঁসিয়া উঠিয়া কহিল, কেন হবে না? বড় দুই মেয়ের বেলা হতে পেরেছে আর বিশাখার বেলাতেই বা হবে না কেন?
“আমি বিরক্তির সঙ্গে কহিলাম, সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল, মনু। ওরা গয়না নিয়ে খানিকক্ষণ কামড়াকামড়ি করুক। সেই ফাঁকে বিয়েটা শান্তিমতো চোকাই।
“রঙ্গময়ি রহস্যময় হাসি হাসিয়া মাথা নাড়িয়া কহিল, আমি আর সেই আগের মনু নেই গো যে, যা বলবে তাই শুনব। এখন আমি তোমার বউ, এ বাড়ির ভালমন্দ আমাকেও ভাবতে হবে, মতামত দিতে হবে।
ওরা যদি তোমাকে সন্দেহ করতে শুরু করে, মনু?
“মনু হাসিল, সন্দেহ আবার কী? গয়না যদি আমি নিজেই নিই তা হলেও তো চুরির দায় অর্শায় না গো। বড়বউয়ের গয়না ন্যায়ত ধৰ্মত ছোটবউয়েরই প্রাপ্য।
“কথাটা সঙ্গত। তবু আমি উত্তেজিত হইয়া কহিলাম, তা বলে এখন অশান্তি করাটা কি ঠিক হবে, মনু?
হবে। কারণ গয়নার বাক্স দিলেও অশান্তি মিটবে না। ওরা বিশাখার জন্য প্রায় কিছুই রাখেনি। আমার হিসেব মতো সুনয়নীর সাতশো ভরির ওপর সোনা ছিল। আছে মোটে একশো বাইশ ভরি। আমি এ থেকে কাউকে এক বতিও নিতে দেব না।
“আমি জানি রঙ্গময়ির জীবনে গহনার প্রয়োজন নাই। হাতে মোট চারিগাছা করিয়া সোনার চুড়ি, দুটি বালা, শাঁখা ও নোয়া এই সে ধারণ করিয়াছে। গলায় সরু চেন। কানে দুটি বেলকুঁড়ি। এ ছাড়া আর কিছুই সে লয় নাই, লইবেও না। নিজের অভাবী পরিজনদের জন্যও সে এ বাড়ি হইতে কখনও কিছু পাচার করে নাই বা করিবেও না। সে অন্য ধাতুতে গড়া। কিন্তু তবু তাহার এই দৃঢ়তার অন্য একটা অর্থ করিবে আমার দুই বড় কন্যা এবং অন্যান্য আত্মীয়রা।
“দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া পোশাক পরিয়া বাহির হইয়া পড়িলাম। মনটা বিরস, ভগ্ন, হতোদ্যম।
“দ্বিপ্রহরে যখন ফিরিলাম তখন দরদালানে খণ্ডযুদ্ধ চলিতেছে। চেঁচামেচি শাপশাপান্তে ঝাপাইয়া পড়িয়াছে আত্মীয় পরিজনেরা। আমি যে বুড়া বয়সে মদনানলে ভস্মীভূত হইয়াছি, একটি ডাকিনী আসিয়া যে সুখের সংসার ছারেখারে দিতেছে ইহাই বক্তব্য। তবে সকলে একমত নয়। বিশাখা রঙ্গময়ির পক্ষ লইয়াছে এবং তাহাকে সাধ্যমতো সাহায্য করিতেছে কয়েকজন অমিততেজা আত্মীয়রা। তবে রঙ্গভূমিতে রঙ্গময়ি নাই। সে বিলক্ষণ প্রশান্তমুখে চাবির গোছাটি আঁচলে বাঁধিয়া রান্নার তদারকি করিতেছে।
“সেই দ্বিপ্রহরে অনেকগুলি পেট উপবাসী রহিল। অনেক অশ্রু বিসর্জিত হইল। পুরুষেরা গম্ভীর রহিল।
“সন্ধ্যায় আবার লাগিল ধুন্ধুমার।
“বিশাখার বিবাহের পূর্বদিন পর্যন্ত এইরূপ চলিল। আর ইহার মধ্যেই রঙ্গময়ি গোপনে স্যাকরার দোকানে গহনা চালান দিল। নূতন গহনা আসিয়া পোঁছাইতেই তাহা সিন্দুকজাত করিয়া চাবি আগলাইয়া রহিল। আমি তাহার সাহস দেখিয়া অবাক হইয়া কহিলাম, তুমিও কুঁদুলি কম নও।
“সে গর্জিয়া উঠিয়া কহিল, কবে কেঁদল করতে দেখলে!
এটাও তো এক ধরনের নীরব কোন্দল। কিছু বলছ না, কিন্তু উসকে দিচ্ছ।
ওদের ভিতরে অনেক স্টিম জমেছে। সেগুলো বেরোক। বেরোলে ঠান্ডা হবে।
এরপর তোমাকে মারতে আসবে যে!
এসেছিল।
“চমকাইয়া কহিলাম, কে এসেছিল?
তোমার শুনে কাজ নেই।
মেয়েদের কেউ?
মেয়ে বউ সবাই।
তারপর কী হল?
আমি পরিষ্কার বলে দিলাম, তোমরা মানো বা না মানো আমি এখন এ বাড়ির কর্তী। গয়না আমার। যা খুশি করব।
পারলে বলতে?
পারলাম। কারণ ওদের আমি এইটুকু বেলা থেকে দেখছি। প্রত্যেকের নাড়িনক্ষত্র জানি।
ওরা কী বলল?
ঝগড়া অনেকদূর গড়াত। আমি তখন এক-একজনের নাম করে কে কোন গয়না হাতিয়েছে তার হিসেব দিতে লাগলাম। সব আমার মুখস্থ। ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সবাই চুপ। তারপর নিজেদের মধ্যে লেগে গেল। আমি বললাম, গয়না আমি নিজে তো নিচ্ছি না। বিশাখা পাবে। আর বিশাখাই যাতে পায় তা আমি শেষ অবধি দেখব।
তোমার সাহস আছে।
“রঙ্গময়ি মাথা নাড়িয়া কহিল, সাহস নয় গো, কর্তব্য। জানি এ গয়না হাতছাড়া করলে তোমাকে অনেক দেনা করতে হবে। বিয়ের জন্য এমনিতেই একটা মহাল চলে গেল। খরচ তত কম নয়। তা ছাড়া আমরা তো কাশী চলেই যাচ্ছি, এদের সংশ্রবে আর আসতে হবে না।
“আমি কহিলাম, সেই ভাল, মনু। কাশীই ভাল। এরা বড় নীচ! এরা বোধহয় তোমাকে আমার উপপত্নী ভাবছে।
তার চেয়েও খারাপ। বলছে বিয়ে নাকি হয়ইনি। আমি নাকি এসে জোর করে তোমার ঘরে ঢুকে পড়েছি।
“শুনিলাম। স্বকর্ণেই সব শুনিলাম। নিজের আত্মীয়দের প্রতি অপ্রসন্নতায় মনটা তিক্ত হইয়া গেল। আমার উজ্জ্বলতম সন্তানটি আজ কাছে নাই। সেই বিবেচক, বুদ্ধিমান, হৃদয়বান ও বিবেকসম্পন্ন কিশোর কোথায় কী করিতেছে কে জানে!
