নাতি হওয়ার পর কৃষ্ণকান্তর বাইরে যাওয়া একটু কমেছে।
বিকেলে একটা দলীয় মিটিং সেরে একটু তাড়াতাড়িই ফিরে এলেন। বৈঠকখানার মুখেই জগা দাঁড়িয়ে।
কী রে? কিছু বলবি?
একটু কথা ছিল।
দামড়াটাকে নিয়ে নাকি?
হ্যাঁ।
কথাটা কী?
আপনি জামাকাপড় ছেড়ে অবসর হয়ে বসুন। তারপর বলছি। তেমন জরুরি কিছু নয়।
কৃষ্ণকান্ত খুব একটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলেন না। ধ্রুব সম্পর্কে খারাপ খবর পেয়ে পেয়ে এখন ভোতা হয়ে গেছেন।
ওপরে এসে জামাকাপড় বদল করে সাবান দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নাতি দেখতে গেলেন।
হাম হয়েছিল বলে ছেলেটা একটু রোগা হয়ে গেছে। পিট পিট করে তাকিয়ে আছে ঝিয়ের কোল থেকে।
কৃষ্ণকান্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, সবসময়ে কোলে রাখিস কেন? বিছানায় ছেড়ে দিয়ে নজর রাখবি শুধু। ওই হাত-পা ছুড়বে, চেঁচাবে, ওইতে ব্যায়াম হয়। বউমা কোথায়?
একটু বেরোলেন।
সঙ্গে কেউ গেছে?
গেছে। মোক্ষদা।
বেশিদূর যায়নি তো!
না, বোধহয় কাটারা অবধি।
কাটারা! সেখানে কেন?
জানি না।
বউমা এলে আমাকে একটা খবর দিবি তো!
নিজের ঘরে এসে চুপচাপ বসে কিছু কাগজপত্র দেখতে লাগলেন কৃষ্ণকান্ত।
০৯৭. আজ এই দিনপঞ্জীতে যাহা লিখিতেছি
“আজ এই দিনপঞ্জীতে যাহা লিখিতেছি তাহা লিখিতে আমার কলম সরিতে চাহিতেছে না। আজ জীবন-সায়াহ্নে আসিয়া আমি দার পরিগ্রহ করিয়া যদি ভুলই করিয়া থাকি, তাহা হইলেও তাহা এমন বিকট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির উপযোগী ঘটনা ছিল কী? ইহারা অর্থাৎ আমার আত্মীয় পরিজনেরা যে আমার এত বড় হিতাকাঙক্ষী তাহা জানিতাম না। সম্ভবত অহরহ আমার ইষ্ট চিন্তা করিয়া ইহাদের ভাল ঘুম হইতেছে না।
“ঘটনাটা ঘটিল সকালে। বিবাহ উপলক্ষে বাড়িটা মেরামত হইতেছে, শামিয়ানা খাটানোর জন্য গাড়ি গাড়ি বাঁশ আসিয়া নামিতেছে, স্যাকরা, কাপড়ওয়ালা, আতরওয়ালা প্রভৃতি নানা রকম লোকজনের সমাগমে বাড়ি মুখর। সকলেই তদারকে ব্যস্ত। আমিও পূর্ব দিকটার একটা জানালার খড়খড়ি মেরামত করাইতেছিলাম।
“ভিতরবাড়িতে একটা শোরগোল শোনা গেল, বেরোও, বেরোও বাড়ি থেকে! নইলে আঁটা মেরে তাড়াব।
“গলাটা আমার কন্যার। ললিতা। এত চিৎকার করিতে তাহাকে কখনও শুনি নাই। তাড়াতাড়ি ভিতরবাড়িতে আসিয়া দরদালানে উঠিতেই ললিতা ছুটিয়া আমার সম্মুখে আসিয়া এক বিকারগ্রস্ত মুখে অনুরূপ বিকট কণ্ঠে বলিল, আপনি কি চান আমরা মুখে চুনকালি মেখে ফিরে যাব? কোন আকেলে আপনি ওই ডাইনিকে বউ বলে ঘরে ঠাই দিয়েছেন? কোন মন্ত্রে আপনি এমন ভেড়া হয়ে গেলেন?
“হেমকান্ত চৌধুরী শান্ত প্রকৃতির লোক, সন্দেহ নাই। কিন্তু তা বলিয়া আজ অবধি তাহার মুখের উপর এত বড় কথা বলিবার মতো বুকের পাটা তাহার পুত্র কন্যাদের ছিল না। তাহা হইলে?
“প্রথমত বিস্ময়ে আমি কোনও জবাবই দিতে পারিলাম না। ললিতা আরও অনেক কিছু কহিতেছিল। অরুদ্ধ লালাসিক্ত, উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে সব কথা ভাল করিয়া স্পষ্ট হইল না। কিন্তু কথার দরকারই বা কী? মনোভাব তো বুঝাই যাইতেছে।
“আমি লজ্জায় রক্তিম বর্ণ ধারণ করিলাম। দরদালানে অনেকেই আছে। মেয়ে বউ, নাতি নাতনি লইয়া জনা দশ বারো। ইহার উপর আত্মীয়স্বজন কুটুম জ্ঞাতি লইয়া সংখ্যাটা বড় কম হইবে না। কী একটা গুঞ্জন চলিতেছিল।
“আমি ললিতাকে বলিলাম, কী হয়েছে?
“ললিতা প্রায় লাফাইয়া উঠিয়া বলিল, কী হয়নি তাই বলুন! মায়ের গয়নার বাক্স কোন সাহসে ওই ডাইনি নিজে আগলে বসে আছে? ওর কী অধিকার? কোন সাহসে ও বলে যে সিন্দুকের চাবি আমাদের হাতে দেবে না?
“বুঝিলাম রোগ গুরুতর। আত্মীয়স্বজন আসিবার পূর্বেই মনু সিন্দুক ও আলমারি খুলিয়া তাহার স্বৰ্গতা সতীনের সব গহনাপত্র বাহির করিয়াছিল। ইতিপূর্বে এই গহনার বাক্স কিছু লুট হইয়াছে। আমার দুই বিবাহিতা কন্যা ও পুত্রবধূরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছুতায় উপঢৌকন লইয়াছে, কিছু লইয়াছে কাহাকেও না বলিয়া। তবু সুনয়নীর অবশিষ্ট গহনাও বড় কম নাই। যাহা আছে তাহা গড়িয়া পিটিয়া কোনওক্রমে বিশাখার বিবাহটা পার করা যাইবে। কিন্তু বুঝিতেছি, ইহাদের অপরিমিত লোভ এখনও ওই গহনার বাক্সে থাবা দিবার জন্য উদ্যত হইয়া আছে।
“আমি বলিলাম, গয়নার বাক্স দিয়ে তুই কী করবি?
“সে সতেজে বলিল, সে আমি বুঝব। আমার মায়ের গয়নার বাক্স ওর হেফাজতে থাকবে কেন?
“এবার একটু কঠোর হওয়া আবশ্যক মনে করিয়া কহিলাম, ওর হেফাজতে নেই। আছে আমার হেফাজতে। গয়না ভেঙে নতুন গয়না গড়ানো-হবে বিশাখার জন্য।
“ললিতা প্রায় লাফাইয়া উঠিয়া কহিল, বিশাখা! শুধু বিশাখার হলেই হবে? আমরা কি ভেসে এসেছি? ও গয়নায় আমাদের ভাগ নেই?
“ভাগ আছে কি না জানি না। গহনা সুনয়নীর, তাহার মৃত্যুর পর ভাগ বাটোয়ারা যথেষ্ট হইয়াছে। এবং মনু ও বিশাখার মতে কন্যা ও পুত্রবধূরা প্রাপ্যের অধিই জোর করিয়া গ্রহণ করিয়াছে। ইহার পরেও ভাগ থাকে কী প্রকারে তাহা জানি না। বলিলাম, এখন এ নিয়ে চেঁচামেচি কোরো না। ঘরে। গিয়ে মাথা ঠান্ডা করো। পরে ভেবে দেখা যাবে।
“সে বিকট স্বরে বলিল, পরে? পরে ও গয়না থাকবে? স্যাকরা এসে বসে আছে না!
“বিরক্তির স্বরে কহিলাম, তোমার স্পর্ধা সীমাহীন। গুরুজনের সঙ্গে কী করে কথা বলতে হয় তাও শেখোনি। তোমার এই বেয়াদবির দরুন সকলের সামনে আমাদের মাথা হেঁট হচ্ছে। যাও ঘরে যাও।
“ললিতা একথায় একটু দমিল। কিন্তু দরদালানের ধূমায়িত গুঞ্জনটি এই ফাঁকে উসকাইয়া উঠিল। আমাদের বয়স্কা এক আত্মীয়া–সম্পর্কে আমার কাকিমা–হঠাৎ ফোড়ন কাটিলেন, বুড়ো বয়সের বে তো, বউকে একটু সাজাবে গোজাবে। এখন তোরা কোথাকার কে লো?
