সে তো ঠিকই।
আমাদের পরিবার বেড়ে যাওয়ায় হাঁড়ি আলাদা হয়েছে ঠিকই কিন্তু কোনও পারিবারিক কোন্দলের কথা কেউ জানে না। আপনার ছেলেরা যদি অবজেকশন দেয় তবে চৌধুরী পরিবারের ভিতরকার সম্পর্কের কথা সবাই জানবে।
জীমূতকান্তি মাথা নেড়ে বললেন, সে তত ঠিকই। তুই আমাকে কী করতে বলিস?
আমি জানি আপনার বাড়িতে এবং বড়দার বাড়িতে আমার ভাইপোরা প্রায়ই মিটিং করে। তাতে বোধহয় আমার মুণ্ডুপাত হয়। তা হোক। আপনাকে বলি, এইসব অস্বাস্থ্যকর মিটিং আপনি ওদের বন্ধ করতে বলুন।
জীমূতকান্তি অন্যদিকে চেয়ে দুর্বল গলায় বললেন, মিটিং ঠিক নয়। একদিন বুঝি ছেলেরা বসে কী সব কথা বলেছে।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে দৃঃ গলায় বললেন, মিটিং হয়েছে এই ঘরে এবং তাতে আপনিও পার্টিসিপেট করেছিলেন। আমি সব খবরই রাখি।
জীমূতকান্তির মুখটা একটু রাঙা হল উত্তেজনায়। কিন্তু নিজের কনিষ্ঠ ভাইটিকে তিনি চেনেন। এর সঙ্গে ঝগড়া করা যায় না, একে অপমান করা বিপজ্জনক। শুধু কৃষ্ণকান্তর সামাজিক মর্যাদা ও মেজাজের জন্যই নয়, আসল কথা হল তারা সবাই কৃষ্ণকান্তর দ্বারা নানাভাবে উপকৃত। তাই এর চোখের দিকে তাকালে একটু অস্বস্তি সকলেরই হয়। জীমূতকান্তি রাগলেও সেই ভাব গোপন করে বলেন, তোর ডিসিশনটা কী?
আমার ডিসিশন জানাতেই আজ আসা। আপনার বা বড়দার ছেলেরা যদি মেনে নেয় তত ভাল, সেক্ষেত্রে এনিমি প্রপার্টির টাকা থেকে ওদের কিছু আমি দেব। অবশ্যই সেটা সমান-সমান ভাগ হবে না। আর যদি অবজেকশন দেয় তা হলে কেউ একটাও পয়সা পাবে না।
জীমূতকান্তির মুখটায় একটু ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দেখা দিল। শুধু বললেন, কিছু বলতে কত দিবি?
সেটা নির্ভর করছে কত টাকা ক্ষতিপূরণ ওরা দেয় তার ওপর। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। আপনার ছেলেরা টাকাটা সমান তিন ভাগে ভাগ করে হিস্যা নিতে চায়। সেটা অন্যায্য আবদার।
কথাটা শেষ হতেই লালটুর বউ কৃষ্ণা এসে ঘরে ঢুকল। বেশ লম্বা, সুশ্রী চেহারা। খুব সাহেবি কেতার মেয়ে। বয়কাট চুল রাখে, দারুণ সব মড পোশাক পরে এবং সিগারেট মদও নাকি খায়। বলে কৃষ্ণকান্ত শুনেছেন। এখন অবশ্য মাথায় বেশ বড় ঘোমটা, ভারী লাজুক ভাব। হাতে চা, প্লেটে খাবার। সেগুলো টেবিলে রেখে একটা প্রণাম করল কৃষ্ণকান্তকে, তারপর নিজের শশুরকেও।
কৃষ্ণকান্ত সবই লক্ষ করলেন। মেয়েটা সহবত জানে।
কৃষ্ণা মিষ্টি গলায় জিজ্ঞেস করল, ভাল আছেন, কাকা?
তুমি কেমন আছো, মা?
ভাল। চায়ে চিনি দিয়েছি কিন্তু।
দেবে না কেন? আমার চিনি বারণ নয়। তবে ওসব খাবার-টাবার নিয়ে যাও। আমি যখন-তখন খাই না।
একটুও না?
না, মা। যখন-তখন খাই না বলেই এখনও ভাল আছি। তা আজ ছুটির দিন লালটুটা কোথায় গেল?
কোথায় বেরিয়েছে।
কৃষ্ণা সম্ৰমসূচক দূরত্বে ঘোমটা মাথায় দাঁড়িয়ে রইল। দৃশ্যটা জীমূতকান্তি অবাক হয়ে দেখলেন। তিনি নিজে তার পুত্রবধূর কাছ থেকে বিশেষ সমীহ পান না। আজকালকার স্বাধীনচেতা মেয়েরা মানবেই বা কেন? কিন্তু প্রশ্ন হল, তা হলে কৃষ্ণকে মানে কেন?
চায়ের কাপ নিয়ে কৃষ্ণা চলে যাওয়ার পর জীমূতকান্তি বললেন, তোর ওপর তো কথা বলার সাহস কারও নেই। তাই আমি বলি, তুই নিজেই ভাইপোদের সঙ্গে কথা বললে পারিস। তোর কথা ওরা ঠিক মেনে নেবে।
আপনি আমাকে বার বার একথাটা বলছেন। আমার আত্মমর্যাদাজ্ঞান একটু বেশি। ছোটদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলাতে আমার রুচিতে বাধে।
তা হলে আমি এক কাজ করি। ওদের বলি, তুই এই চাস।
বলবেন। একটা কথা। কারও জন্য কিছু করে সে বিষয়ে পরে উল্লেখ করতে বা তার জন্য উলটো কিছু দাবি করতে আমি ঘৃণা বোধ করি।
তোকে আমরা জানি।
ওদের একথাটা বুঝিয়ে দেবেন যে, ছোটকাকা নিজের পরিবারের, নিজের বংশের ভাল ছাড়া মন্দ কখনও দেখেনি। এটা যদি সত্য হয় তবে ভবিষ্যতেও তাই করব। কিন্তু আমি যদি দেখি আমার বংশের ছেলেরা, আমার নিজের ভাইপোরা পিছন থেকে নানা ষড়যন্ত্র করছে তা হলে বাধ্য হয়েই তাদের সংশ্রব আমাকে বর্জন করতে হবে। সেটা ওদের পক্ষে ভাল হবে না মন্দ হবে তা ওদের ভেবে দেখতে বলবেন।
জীমূতকান্তি আবার রক্তাভ হলেন। কৃষ্ণকান্ত যে স্পষ্টই হুমকি দিচ্ছেন সেটা বুঝতে অসুবিধে নেই। তিনি এও জানেন, কৃষ্ণকান্ত কখনও ফাঁকা আওয়াজ করেন না। জীমূতকান্তি তাই বললেন, না, তুই অত বাড়িয়ে ভাবছিস কেন? ওদের কার ঘাড়ে কটা মাথা যে তোর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়? কৃষ্ণকান্ত উঠলেন। চিন্তিত বিরক্ত মুখভাব। জীমূতকান্তিকে একটা প্রণাম করলেন।
জীমূতকান্তি বললেন, ধ্রুবর ছেলেকে নিয়ে একদিন ওরা যেন আসে। আমি তো কোথাও যেতে পারি না।
আসবেখন। বউমার শরীরটা ভাল নেই।
কী হয়েছে?
মাঝে মাঝে স্মৃতিভ্রংশের মতো হচ্ছে। অনেকদিন রোগটা লুকিয়ে রেখেছিল। এখন গড়িয়ে গেছে খানিকটা।
সেটা কীরকম রোগ? পাগলামি নাকি?
না। মনে হয় সাময়িক।
ডাক্তার দেখছে তো!
রোজ।
কৃষ্ণকান্ত বেরিয়ে এলেন। দরজার বাইরে ছোট বউমা আর বাচ্চারা বশংবদ দাঁড়িয়ে ছিল। কৃষ্ণকান্ত বেরোতেই ঢিব ঢিব প্রণাম। কৃষ্ণকান্ত বাচ্চাদের কারও মাথায় হাত রাখলেন, কারও গালটা টিপে দিলেন একটু। মায়াভরে একটু তাকিয়ে রইলেন। চৌধুরীদের রক্তবীজ। বাড়ছে। ছড়িয়ে পড়ছে। নিজের বংশ, নিজের গোষ্ঠীর প্রতি তার অসীম মমতা। অসীম স্নেহ। শুধু বেয়াদবি আর বিশ্বাসঘাতকতা তার সহ্য হয় না।
