কনককান্তি কলকাতায় যে ব্যাবসা করতেন তা শেষ অবধি ডোবে। পয়সাকড়ি টানাটানির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। কৃষ্ণকান্ত যখন শেষ অবধি বিষয়সম্পত্তির দখল নিলেন তখন বড়দার অবস্থা বেশ খারাপ। কলকাতার বাড়িতেও তিনি থাকতে চাইছিলেন না, প্রেস্টিজে লাগছিল। কৃষ্ণকান্ত তখন কনককান্তিকে বালিগঞ্জে একখানা ঘোট বাড়ি করে দেন।
জীমূতকান্তি চাকরি করতেন। তার অভাব ছিল না, প্রাচুর্য না থাক। অবসর নেওয়ার পর কলকাতায় ফিরে এসে কিন্তু তিনি সরাসরি কৃষ্ণকান্তকে বললেন, বাবার বিষয়সম্পত্তি থেকে আমরা অন্যায়ভাবে বঞ্চিত। তুই দাদাকে যেমন বাড়ি করে দিয়েছিস তেমন আমাকেও দে।
কৃষ্ণকান্ত সেই দাবি মেনে নিয়ে জীমূতকান্তিকেও এই বাড়িখানা করে দেন টালিগঞ্জে।
এক সময় বিষয়সম্পত্তি সম্পর্কে নির্লোভ ও উদাসীন ছিলেন কৃষ্ণকান্ত। তারপর বিষয়সম্পত্তি হাতে পাওয়ার পর তিনি উদার হাতে দানধ্যান করেছেন। বহু বিপ্লবীর সংসার টেনেছেন তিনি। দেশভাগের সময় নগদে, গয়নায় তিনি প্রচুর টাকা নিয়ে চলে আসেন। এ ব্যাপারে তাকে অত্যন্ত সুচিন্তিত পরামর্শ দিয়েছিল তার ছোট জামাইবাবু শচীন।
কিন্তু এখন কৃষ্ণকান্ত বিষয়সম্পত্তি সম্পর্কে তেমন উদাসীন নন! তার তিন ছেলের মধ্যে বড়টি প্রায় ত্যাজ্যপুত্র, ছোটটি এখনও পড়াশুনো করছে। মেজোটি অদ্ভুত এবং কিস্তৃত। তিনি জানেন তার কোনও পুত্ৰই বৈষয়িক ব্যাপারে তেমন দড় নয়। বিশেষ করে ধ্রুব। এদের জন্য একটা পাকা ব্যবস্থা তিনি করে যেতে চান। সেই জন্যই এনিমি প্রপার্টির ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
মুশকিল হল, মানুষ স্বভাবত অকৃতজ্ঞ। কনককান্তি মারা গেছেন, কিন্তু তার ছেলেরা লায়েক হয়েছে। জীমূতকান্তির ছেলেরাও কম যায় না। এখন সকলেই বলতে চায়, হেমকান্তর উইল সিদ্ধ নয়, তা বে-আইনি। তারা এখন এনিমি প্রপার্টির টাকার ভাগ চাইছে।
কৃষ্ণকান্ত তাই চিন্তিত। উদ্বিগ্ন। ভাগ চাইলেই পাবে, এমন নয়, কিন্তু কেউ একটা অবজেকশন দিয়ে বসলে টাকা পেতে গণ্ডগোল হবে।
কৃষ্ণকান্ত এ বাড়িতে ঢোকার পরই চারদিকে একটা তটস্থ, সম্রমাত্মক এবং সম্ভবত খানিকটা ভীত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। বউমারা সামনে আসছে না, বাচ্চারা চেঁচামেচি করছে না।
কৃষ্ণকান্ত জানেন, এখনও তাকে এরা সবাই ভয় পায়, সম্রম করে। এখনও মুখের সামনে দাঁড়িয়ে কোনও প্রতিবাদ করার মতো বুকের পাটা কারও নেই। কিন্তু এরকম চিরদিন থাকবে না। তিনি বুড়ো হয়েছেন, আগের দাপুটে ভাবটা একটু মিইয়ে গেছে। রাজনীতিতেও প্রভাব কমেছে। এখন হয়তো এরা ক্রমে ক্রমে সাহসী হয়ে উঠবে। অবাধ্যতা করবে। আর তার মৃত্যুর পর যে কী হবে তা বেশ ভানার বিষয়।
কৃষ্ণকান্ত আত্মীয়স্বজনদের প্রতি অত্যধিক স্নেহশীল। তাদের দায়ে-দফায় বরাবর গিয়ে পড়েছেন। নিজের গোষ্ঠীর প্রতি তাঁর সীমাহীন আসক্তির ফলেই দাদাদের এবং দিদিদের ছেলেরা ভাল চাকরি পেয়েছে, মেয়েদের বিয়েও হয়েছে চমৎকার সব ঘরে-বরে। কিন্তু তবু তার আত্মীয়েরা এতে খুশি নয়। তারা আরও কিছু চায়। কৃষ্ণকান্ত তাদের দোষ দেন না। মানুষের তো চাওয়ার শেষ নেই। কিন্তু এনিমি প্রপার্টির টাকা তাদের পাওনা হয় না।
কৃষ্ণকান্ত মেজদাদার দিকে চেয়ে ছিলেন। বুঝবার চেষ্টা করছিলেন, ওঁর মনোভাবটা কী। তাকে দেখে কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছে। লক্ষ করে বুঝলেন, মেজদা অস্বস্তিতে পড়েছেন। মানুষটা কোনওদিনই শক্তপোক্ত ছিলেন না।
কৃষ্ণকান্ত খুব শান্ত গলায় হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, মেজদা, আমি শুনতে পাচ্ছি আপনি এনিমি প্রপার্টি ক্লেম করবেন!
জীমূতকান্তি এত সরাসরি প্রশ্নটা আশা করেননি। ভারী অস্বস্তি বোধ করে বললেন, আমি তো এসব কিছু জানি না। তবে ছেলেরা কী সব যেন বলে।
কী বলে?
ওদের সঙ্গে একটু কথাটথা বলে দেখ।
কৃষ্ণকান্ত ভ্রুকুটিগম্ভীর মুখে বললেন, আপনি বেঁচে থাকতে আমি ওদের সঙ্গে কথা বলব কেন?
জীমূতকান্তি ফরসা গালে অসহায় হাতখানা বুলিয়ে বললেন, উইলের কথা আমরা কেউ জানি। বাবা আমাদের জানাননি। শচীনের কাছে গচ্ছিত ছিল।
তাতে কী হল? উইলটা কি সিদ্ধ নয়?
তা বলছি না।
আর কথাটা এতকাল পরেই বা উঠছে কেন?
আমি বুড়ো হয়েছি, যে-কোনওদিন রওনা দেব। আমার ওসব দিয়ে কী হবে? ছেলেরা এখন সাবালক হয়েছে, ওদের নিজস্ব মতামত হয়েছে।
নিজস্ব মতামতের কোনও দাম নেই, যদি তা অন্যায্য হয়।
তুই বরং ওদের সঙ্গে কথা বল।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নাড়লেন, ওরা আমার সমান-সমান নয়, ওদের সঙ্গে বিষয়সম্পত্তি নিয়ে কথা বলা সম্ভব হবে না। আর আপনি বেঁচে থাকতে ওদের কোনও দাবি দাওয়া থাকতে পারে না।
আমি কী করব বল।
আপনি ওদের বলুন, দেশের বিষয়সম্পত্তিতে ওদের কোনও হিস্যা নেই। ওরা সেটা বুঝুক।
যদি বুঝতে না চায়?
তা হলেই বা সুবিধে হবে কীসের? অবজেকশন দিলে ক্লেম পেতে একটু দেরি হবে ঠিকই। কিন্তু আইন মোতাবেক আমিই তা পাব। তখন?
ওরা তো অবজেকশন এখনও দেয়নি!
না। তবে দেওয়ার তোেড়জোড় করছে। কিন্তু আমি পলিটিকসের লোক, ক্লেম পেতে আমার অসুবিধে হবে না। তবু অবজেকশন দিতে বারণ করছি একটা কথা ভেবে।
জীমূতকান্তি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমার আর এসব ভাল লাগে না রে, কৃষ্ণ।
তা হলেও বিষয়টা আপনার জানা উচিত। আজকাল যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, পারিবারিক ঝগড়াঝাটি প্রায় প্রত্যেক পরিবারে।
