“আমরা একই শয্যায় পাশাপাশি শয়ন করিলাম। কিন্তু কেহই দেহের সীমানা লঙঘন করিলাম। এমনকী একটি চুম্বনও নহে। বড় লজ্জা ও সংকোচ হইতেছিল।
“পরদিন সকাল হইতে না হইতেই মনু সংসারের চারদিক সামাল দিতে ঝাপাইয়া পড়িল। এখন সে আর নিতান্ত পুরোহিকন্যা নহে, সে এ বাড়ির গৃহিণী। তাহার গৃহিণীপনা দেখিবার মতোই। এমন সুচারুভাবে সে সবকিছু গোছগাছ করিতে লাগিল যে আমি ভরসা পাইলাম।
“দ্বিপ্রহরে একান্তে সে আমাকে বলিল, শোনো, আমরা কিন্তু এখানে থাকব না।
কোথায় থাকবে?
কাশীতে লোক পাঠাও।
কাশী!
হ্যাঁ। আমাদের বাড়িটা সেখানে ফাঁকা পড়ে আছে। লোক গিয়ে সেটা মেরামত করতে থাকুক। বিশাখার বিয়ের পরই আমরা চলে যাব।
সেটাই কি ঠিক হবে?
হবে। এস্টেট শচীন দেখবে। তোমাকে ভাবতে হবে না।
“চুপ করিয়া গেলাম। মনু যাহা বলে তাহা ঠিকই বলে। তাহার পরামর্শ শুনিয়া আমার কখনও ক্ষতি হয় নাই।
“কালরাত্রি কাটিয়া ফুলশয্যা আসিল। কীরূপে সেই রাত্রির বর্ণনা করিব? আমার ভিতরে যে পুরুষ এতকাল নিদ্রিত ছিল, সুনয়নীর সংস্পর্শেও যাহার ঘুম পুরাপুরি ভাঙে নাই, সেই পুরুষটিকেই যেন মনু আজ জাগাইয়া তুলিল। কাম ও প্রেমের মধ্যে পার্থক্য যোজনবিস্তার। কাম তত যে কোনও নারী-পুরুষেই সংঘটিত হইতে পারে। কিন্তু দুটি নরনারী যখন যুগক্ষয়ি প্রতীক্ষার ভিতর দিয়া পরস্পরকে প্রার্থনা করে এবং কালের সকল নিয়মকে উপেক্ষা করিয়া অনুরাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তখন তাহাদের মিলনে অবশ্যই দেবলোকের স্পর্শ, গন্ধ, শব্দ নামিয়া আসে।
“আমি দুঃখী, ক্লিষ্ট, বিগতপ্রায়-যৌবন পুরুষ। মনুও বালিকা নহে। তাহারও জীবন প্রাপ্তিশূন্য। দুই ক্ষতবিক্ষত হৃদয় এবং বয়স্ক শরীরের সেই মিলন ভাষায় বর্ণনার অতীত। আমরা কেবল পরস্পরের মধ্যে পরস্পর বিলীন হইয়া যাইতে লাগিলাম। কদিলাম, হাসিলাম, কত স্মৃতি রোমন্থন করিলাম। অবশেষে পরস্পরকে সুদৃঢ় বাহুপাশে কাঙালের মতো আঁকড়াইয়া ধরিয়া কখন যেন ঘুমাইয়া পড়িলাম।
“মাত্র একটি মাস পরেই বিশাখার বিবাহ। সুতরাং আর সময় নাই। পরদিন হইতেই বাড়িতে মনু রাজমিস্ত্রি লাগাইল। বিবাহের খরচের জন্য শচীন এস্টেটে ঘুরিতে বাহির হইল। আমাকেও নানা মহালে যাইতে হইল।
“কাশীতে লোক পাঠানো হইয়াছে। বাড়ি মেরামতের কাজ সেখানে চলিতেছে। সুতরাং নানা বিষয়কর্মে আমাকে বিশেষরকম ব্যস্ত হইয়া পড়িতে হইল। মোটামুটি দাম পাইয়া একটি মহাল বিক্রি করিয়া দেওয়া গেল। বড় এস্টেটের ঝামেলা অনেক।
“সুখেই কয়েকটা দিন কাটিল। তাহার পরই সংসারের একটা কুৎসিত দিক অকস্মাৎ ভদ্রতা ও সৌজন্যের মুখোশ খুলিয়া সম্মুখে দাঁড়াইল।
“বিশাখার বিবাহ উপলক্ষে আমার ছেলেমেয়েরা আসিয়া উপস্থিত হইতে শুরু করিয়াছে। বউমা, ছেলেমেয়ে সকলেই আসিতেছে। সকলেরই মুখ গম্ভীর। ভ্রুকুটি, বাক্যহীনতা।
“ঘরে মনু গৃহিণীর আসনে আসীনা, এই দৃশ্য কেহই সহ্য করিতে পারিতেছে না। প্রত্যেকের মুখেই মূক প্রশ্ন, এ কে? এ এখানে কেন? কে ইহাকে অন্দরমহলে স্থান দিয়াছে?
“জানি প্রশ্নগুলি সঙ্গত। কারণ মনুর ভূমিকার এই পরিবর্তন তাহাদের কাছে অপ্রত্যাশিত, অভিনব। মনে মনে এই সকল সম্ভাব্য প্রশ্নের কী জবাব দিব তাহা অনেক মহড়া দিয়াছি। কিন্তু কার্যকালে নীরবতা ছাড়া আর কিছুই অবলম্বন করার ছিল না। কারণ আমাকে কেহ কোনও প্রশ্ন করে নাই।
“বিশাখার বিবাহের তিন দিন আগে অকস্মাৎ বোমাটি ফাটিল। তাহার বিস্ফোরণ আমাকে আমৃত্যু তাড়া করিবে। সংসার যে কীরূপ কঠিন ঠাই তাহা আর-একবার আমার কাছে উদঘাটিত হইল।”
০৯৬. কৃষ্ণকান্তকে দেখে জীমূতকান্তি
কৃষ্ণকান্তকে দেখে জীমূতকান্তি বিছানায় উঠে বসলেন। প্রকাণ্ড পালঙ্ক, পুরনো আমলের ফুল লতাপাতার নকশা। তাতে পুরু গদির বিছানা। জীমূতকান্তির চেহারায় প্রাচীনতার ছাপ থাকলেও বার্ধক্য নেই। এখনও টকটকে ফরসা রং, অসাধারণ মুখশ্রী, শরীরের গঠনও চমৎকার। গলায় বাঘা আওয়াজ খেলে।
সেই গলাতেই বললেন, আয়। বোস।
কৃষ্ণকান্ত বিছানার পাশেই একটা চেয়ারে বসলেন। বললেন, কেমন আছেন?
বয়স হলে মানুষ একটু রোগভোগের কথা বলতে ভালবাসে। জীমূতকান্তিরও তাই। বললেন, আছি তো কোনওরকম। প্রেশারটাই বড্ড গোলমাল করে। কিছুই তেমন খাই না, তবু পেটে মাঝে মাঝে এমন গ্যাস হয় যে দম নিতে কষ্ট হয়। তখনই বুকে ব্যথা, প্রেশার।
কৃষ্ণকান্ত মন দিয়ে শুনলেন সবটুকু। বাধা দিলেন না। তার এই দাদা ইতিপূর্বে দুদুবার যমের মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। এখনও যে বেঁচে আছেন সেটাই সৌভাগ্যের বিষয়। বরাবর পশ্চিমে ছিলেন। প্রথমদিকে তাঁর সন্তানাদি হয়নি। একটু বেশি বয়সে দুই ছেলে এবং এক মেয়ে পর পর জন্মায়। যখন তারা জন্মায় তখন কৃষ্ণকান্ত জেলে। জেল থেকে বেরিয়েই ফের স্বদেশি আন্দোলনে নামলেন। আবার জেলে গেলেন। সেই সময়েই খবর পেয়েছিলেন কাশীবাসী হওয়ার আগে হেমকান্ত তার অন্যান্য পুত্রদের বঞ্চিত করে নিরুদ্দেশ নাবালক কনিষ্ঠ পুত্রকেই যাবতীয় বিষয়সম্পত্তি উইল করে দিয়ে গেছেন। অছি হিসেবে নিযুক্ত হয় শচীন, রাজেন মোক্তার এবং স্থানীয় বিশিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।
কিন্তু স্বদেশি আন্দোলনের সেই যুগে কৃষ্ণকান্ত বিষয়সম্পত্তির চিন্তা আদপেই করতেন না। খবরটা পেয়েও তার কোনও ভাবান্তর হয়নি। তবে তার মনে হয়েছিল, হেমকান্ত তার জ্যেষ্ঠ দুই পুত্রকে বঞ্চিত করে অন্যায় করেছেন।
