ধ্রুব রেমির কাধটা আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, তোমার কী হয়েছে বলছিলে স্মৃতিভ্রংশের মতো?
রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার পরিষ্কার খাসের বাতাসটি লাগল ধ্ৰুবর গালে। কানের কাছে মুখ রেখে রেমি বলল, আমার কী মনে হয় জানো?
বলো শুনি।
মনে হয় তোমার অত অবহেলা সইতে সইতে আমার মাথাটা কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।
তোমাকে অবহেলা করলাম আর কই? প্রবলেমকে কি লোকে অবহেলা করে? বরং সেটার কথাই সব সময়ে ভাবে।
আমি কেন তোমার প্রবলেম বলো তো? খাওয়াতে হয় না, পরাতে হয় না। এমনকী একসঙ্গে না থাকলেও চলে। আমি তো ছায়ার মতো থাকি। কায়াহীন।
বাঃ বেশ বলেছ। পিয়োর কবিতা। তবে এ নিয়ে আমরা এত কথা বলে ফেলেছি অলরেডি যে আর আলোচনার মানেই হয় না।
নাইবা আলোচনা করলে। কিন্তু আমার মাথার অসুখটা কেন করল সেটা একটু ভাববে তো?
মাথার অসুখ নয়।
নয় বলছ? তুমি ভাল করে আমাকে একটু দেখো না গো!
কী দেখব? আমি কি ডাক্তার?
তুমি আমার সবচেয়ে বড় ডাক্তার। আমার চোখ দেখো, নাড়ি দেখো, ঠিক বুঝতে পারবে।
পাগল আর কাকে বলে!
কোনওদিন তো এমনভাবে বলিনি। দেখো না, বুঝতে পারে কি না!
ধ্রুব রেমির মুখখানা দুহাতে ধরে চোখের দিকে চাইল। অনেকক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইল। রেমিও পলক ফেলল না।
তোমার চোখের দৃষ্টি খুব স্বাভাবিক।
মোটেই না।
তুমি কী করে বুঝলে যে স্বাভাবিক নয়?
রেমি মৃদু হেসে বলে, তুমি আমাকে ছুঁয়ে আছ, চোখের দিকে চেয়ে আছ, তবু আমার চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক হবে কী করে? আমার চোখে এখন আনন্দের আলো জ্বলছে।
ধ্রুব হাসছিল। মৃদুস্বরে বলল, খুব সেয়ানা হয়েছ। এত বুদ্ধি করে কথা বলতে পারছ, তবু ভাবছ পাগল হয়ে যাবে কি না?
রেমি মাথাটা নেড়ে বলে, না গো, বিশ্বাস করো। সত্যিই হচ্ছে। যখন হয় তখন কিছু চিনতে পারি না। আর মনে হচ্ছে, দিন দিন ব্যাপারটা বাড়ছে।
ধ্রুবকে চিন্তিত দেখাল। জিজ্ঞেস করল, বাবাকে বলেছ?
বাবা? শ্বশুরমশাইকে বাবা বলছ তুমি?–বলে রেমি অবাক হয়ে তাকাল।
ধ্রুব বড় একটা কৃষ্ণকান্তকে বাবা বলে সম্বোধন বা উল্লেখ করে না। হঠাৎ মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে। সামলে নিয়ে বলে, বাবাই তো হয় লোটা সম্পর্কে, তাই না?
তোমার ফিলজফিতে তো তা নয়।
ঠুকছ ডিয়ার? এখন একটু ছেড়ে দাও। ডাক্তার এলে ডেকে পাঠিয়ে।
কোথায় যাবে?
আসছি একটু।
পালাবে না তো?
না, পালাব কেন? আর পালিয়ে যাবই বা কোথায়?
এসো তা হলে।
রেমি ছেড়ে দিল। ধ্রুব খুব ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে এল। রেমির চোখের দৃষ্টির মধ্যে একটা ঘোলাটে ভাব সে লক্ষ করেছে। অবহেলা করে বটে সে, কিন্তু রেমির সব কিছুই তার জানা। ওই চোখ তার গভীরভাবে চেনা। কী হয়েছে রেমির? একটা শক্ত অসুখের প্রতিক্রিয়া কি? মানসিক ভারসাম্যে গোলমাল নয় তো?
নীচে নেমে এসে সে বৈঠকখানার টেলিফোনটা একবার তুলে ডায়াল করতে গিয়েও রেখে দিল। একটা চেয়ারে বসে চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগল ডাক্তারের জন্য। ডাক্তার আসতেই পথ আটকাল ধ্রুব, আপনার সঙ্গে কথা আছে।
ডাক্তার বয়স্ক মানুষ, কৃষ্ণকান্তর প্রায় পারিবারিক বন্ধু। ধ্রুবকে এইটুকু বয়স থেকে চেনেন। হেসে বললেন, বল রে পাগলা।
রেমিকে ভাল করে দেখেছেন দু-এক দিনের মধ্যে?
ডাক্তার উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, কেন বল তো?
ওর চোখে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেননি?
ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন, না। তবে বউমা তো ভাল করে কিছু বলে না। চেক-আপ একটা নামমাত্র করতে হয় বলে করা। তোর বাবা আবার বাচ্চাটার জন্যই বেশি অস্থির, তাই ওটাকেই বেশি করে দেখে যাই। কেন? বউমার কোনও কমপ্লিকেশনস দেখা দিয়েছে নাকি? চোখে কী দেখেছিস?
ওর দৃষ্টিটা স্বাভাবিক নয়। কেমন ঘোলাটে। মাঝে মাঝে স্মৃতিভ্রংশের মতো হচ্ছে।
কই? আমাকে বলেনি তো?
লজ্জায় বলেনি।
আহা, এতে লজ্জার কী আছে? বাঙালি মেয়েরা এই করে করেই তো যত গণ্ডগোল পাকায়। চল তো গিয়ে দেখি।
একটু সাবধানে হ্যান্ডেল করবেন।
ডাক্তার একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, নে চল তো। তোর কাছে আর আমাকে ডাক্তারি শিখতে হবে না।
ডাক্তার রেমিকে দেখলেন অনেকক্ষণ ধরে। অনেকগুলো প্রশ্ন করলেন। তারপর ধ্রুবর সঙ্গে নীচে নেমে এসে একান্তে বললেন, মানুষের মন বড় বিচিত্র জিনিস। কখন কোন খোঁটায় বাঁধা পড়ে মাথা কুটে মরে তার তো ঠিক নেই। বউমাকে কয়েকদিন অবজার্ভেশনে রাখা দরকার। তারপর প্রয়োজনমতো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে হবে।
মনের কথা কী বলছিলেন? খোটা না কী যেন বললেন?
ডাক্তার একটু হাসলেন। বললেন, এ হচ্ছে অবসেসনের যুগ। মানুষ চট করে অবসেসড হয়ে যায়। বউমারও সেরকম একটা কিছু আছে মনে হয়। খুব দুশ্চিন্তা করে নাকি?
তা করে বোধহয়।
তার ওপর ডেলিভারির সময় ওরকম একটা ধকল গেল। শরীরটা ভীষণ দুর্বল তো। মাথাটা চিন্তার বোঝা বইতে পারছে না।
সাইকিয়াট্রিস্ট যদি এখনই দেখানো হয়?
দূর পাগল! খামোকা সাইকিয়াট্রিস্ট কতগুলো ওষুধ গেলাবে। তাতে ভালমন্দ কত কী হতে পারে। আমি পুরনো আমলের মানুষ রে বাপু, ন্যাচারাল কিয়োরের পক্ষপাতী বেশি। দেখ না দুদিন। চট করে কিছু হবে না, ভয় নেই।
আমি একটা জিনিসকেই ভয় পাই। সেটা কী?
মানুষ, বিশেষ করে মেয়েরা, একটু সেন্টিমেন্টাল হয়। আপনার বউমা খুব উইক নেচারের। তাই ভাবছিলাম মানসিক স্থিরতা হারিয়ে সুইসাইড-টাইড করে বসবে না তো!
আরে না! সেরকম কিছু দেখেছিস নাকি?
