না, ভাবছিলাম আর কী।
নতুন মা হয়েছে, এখন সুইসাইডের কথা ভাববে না। তবু নজরে রাখিস না হয়। তোর বাবাকে কিছু বলতে হবে এ বিষয়ে?
না, থাক। উনি খামোকা দুশ্চিন্তায় পড়ে যাবেন।
জানি বউমা-অন্ত প্রাণ।
ডাক্তার চলে গেলে ধ্রুব অফিসে বেরোল। একটা অন্যমনস্কতা আগাগোড়া রইল সঙ্গে। অফিসে এসেও সেটা ছাড়ল না। কাজে মন গেল না বলে একটা কাগজে ধ্রুব কয়েকটা পয়েন্ট লিখল। রেমির ওপর কতরকম মানসিক বাধা পড়েছে তার একটা হিসেব। স্বামীর উপেক্ষা, স্বামীর প্রণয়িনীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার, নিজস্ব প্রেমিকের সঙ্গে প্রেমে ব্যর্থতা, স্বামীর নীচতা ও হীনতা (কখনও কখনও) সত্ত্বেও তার প্রতি আনুগত্যবোধ এবং কিছু বস্তাপচা সংস্কার মানার অভ্যাস, স্বামীর মাতলামি, শ্বশুরের আধিপত্য, প্রথম সন্তান ধারণ করা সত্ত্বেও ভ্রুণহত্যা, যৌন মিলনের অভাব (?) ইত্যাদি।
অনেকক্ষণ হিসেবটা মনোেযোগ দিয়ে দেখল সে। আরও কিছু বোধহয় বাদ থেকে গেল। তবু এটুকু থেকেই বোঝা যায় রেমির পাগল হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
টেলিফোনটা এল তিনটে নাগাদ। যখন ধ্রুব কেটে পড়ার তাল করছে।
ধ্রুবদা! আমি নোটন।
কী খবর রে?
তোমার সঙ্গে ভীষণ দরকার।
কীসের দরকার?
আজ সন্ধেটা আমাকে দেবে?
না রে, আজ উপায় নেই। তোর বউদির শরীর খারাপ।
খুব সিরিয়াস কিছু?
ন্নাঃ, তবে বাড়ি ফেরা দরকার।
খুব স্ত্রৈণ হয়েছ তো!
স্ত্রৈণ কেন হব?
না কি ছেলের মুখ দেখে বিশ্ব ভুলেছ?
ওসব নয়। তোর দরকারটা কী?
সব কথা কি ফোনে বলা যায়?
তা হলে পরে কোনও সময়ে দেখা করিস।
শোনো, আমি তোমার অফিসবাড়িরই দোতলা থেকে ফোন করছি। পালাতে পারবে না। বোসো আসছি।
জ্বালালি, দোতলায় আবার কার কাছে?
কত পাটি থাকে আমাদের।
আয় তাড়াতাড়ি। সময় নেই আমার।
ধ্রুব ফোন রেখে দিয়েই বুঝল, তার বুকে হৃৎস্পন্দনের শব্দ বেড়ে যাচ্ছে। দ্রুত হচ্ছে। সে একটু জোর পড়ছে। লক্ষণগুলি ভাল নয়। নোটন সস্তা মেয়ে, ভাড়াটে মেয়ে। মল্লিকপুর এবং ফেরার পথে ট্রেনে যা ঘটেছিল তার জের টানার একটুও ইচ্ছে নেই ধ্রুবর। নোটনের কথা সে কদিন ভাবেওনি। কিন্তু এখন নোটন আসছে বলে তার এরকম সব হচ্ছে কেন?
ধ্রুব উঠে দাঁড়াল। ভাবল, নোটন আসার আগেই চলে যাই। তারপর মনে হল, সেটা দুর্বলতা। এত সহজে হার মানবে কেন সে? ভেবে আবার বসল। মনটাকে কঠিন ও নির্বিকার করার একটা অক্ষম চেষ্টা করল সে।
নোটন যখন তার সামনে এসে দাঁড়াল তখন হৃৎস্পন্দন একটু দামামার মতো বেজে গেল তার। চালাক, ভীষণ চালাক মেয়েটা। একটুও সাজেনি। জানে, না সাজলেই ধ্রুব পছন্দ করবে বেশি। চওড়া পাড়ের একটা সাদা খোলের শাড়ি পরেছে, ডান হাতে একটা রুপোর বালা, কানে দুটো লাল পাথরের টপ। মুখে রূপটান নেই, কাজল নেই। একটু স্মিত হাসি আর চোখে দিপদিপ আলো।
ধ্রুব গলাটা যথাসম্ভব ভারী করে বলল, কী বলবি?
বসি একটু?
বোস।
নোটন বসে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছল। বলল, ভাবছিলাম তোমাকে বুঝি ধরতেই পারব না। আমার সঙ্গে একটা জায়গায় কয়েক মিনিটের জন্য যাবে?
ধ্রুব সন্দিহান হয়ে বলে, কোথায়?
চলো না! বেশি দূর নয়। ফেরার পথেই পড়বে।
আমাকে কোথাও নিয়ে যাবি কেন তুই? আমাকে দিয়ে কী কাজ?
আমার কাজ আমি বুঝব। চলো।
ধ্রুব তীক্ষ্ণ চোখে নোটনকে দেখে বুঝবার চেষ্টা করছিল। কিছু বোঝা গেল না। মেয়েদের প্রকৃতিদত্ত ক্যামোফ্লেজ আছে। বলল, তোর কাজে আমাকে দরকার হচ্ছে কেন সেটিই জানতে চাই।
এত প্রশ্ন করলে বড্ড অপমান হয় জানো?
অপমান! —বলে ধ্রুব একটু ভাবে। সে বুঝতে পারছে, নোটন আজ আর-একটু এগোবে। কিন্তু কেন? ধ্রুবর কাছ থেকে ওর পাওয়ার তো আর কিছু নেই! প্রেম জিনিসটা ওর মতো মেয়ের হতে পারে না আর। সেই মন ওর মরে গেছে কবে। তবে কি ও প্রতিশোধ নিতে চায়? কৃষ্ণকান্ত ওর দাদাকে অপমান করেছিলেন। দাদা নিরুদ্দেশ। ধ্রুবর সঙ্গে ওর বিয়ের স্বপ্ন দেখেছিল ওর মা। সেই স্বপ্ন ওর চুরমার হয়ে গেছে। স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রায়-পতিতার এক জীবনযাপন করতে হচ্ছে ওকে। হ্যাঁ, প্রতিশোধস্পৃহা নোটনের থাকতেই পারে। হয়তো ধ্রুবকে নিজের কজায় নিয়ে সেই শোধটাই তুলতে চায় নোটন।
কয়েক মুহূর্তে এইসব কথা ভেবে নিয়ে ধ্রুব হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বলল, চল কোথায় যেতে চাস।
নোটন একমুখ হেসে উঠে দাঁড়াল। ভাবী সুন্দর দেখাল ওকে। ছিপছিপে শরীর, তারুণ্যে ঝলমল করছে চেহারা। চোখের দৃষ্টিতে একটু দুষ্টুমি আর বুদ্ধির ঝিকমিকি।
নীচে একটা লাল অ্যামবাসাডার দাঁড়িয়ে ছিল।
ধ্রুব অবাক হয়ে বলে, গাড়ি কিনলি নাকি?
না। গাড়ি আমার নয়। ধার নিয়েছি। ওঠো।
সামনে ড্রাইভার বসে। তার গায়ে সাদা ইউনিফর্ম। ধ্রুবর একটু ঘেন্না হল। বোঝাই যায়, গাড়ির মালিক নোটনের ক্লায়েন্ট।
নোটন পাশে বসেই ঘন হয়ে এল। ধ্রুবর একখানা হাত নিজের হাতে চেপে ধরে বলল, এরকম করো কেন বলো তো?
কী রকম?
এই সন্দেহ কেন? ঘেন্না কেন?
ধ্রুব চুপচাপ বসে রইল। জবাব দিল না।
তোমাকে একটা কথা আজ বলব, ধ্রুবদা।
বল।
আমি তোমাকে চাই। যেভাবেই হোক চাই। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।
ধ্রুব হাতটা টেনে নিয়ে বলে, পাগলামি করিস না।
রাগ করছ?
করছি। বাড়াবাড়ি করলে এর পর তোর মুখও দেখব না।
০৯৫. ইহা কী হইতে চলিয়াছে
“ইহা কী হইতে চলিয়াছে? কী ঘটিবে? জীবনের গতি বিচিত্র সন্দেহ নাই। ইহার বাঁকে বাঁকে অঘটন, বিপর্যয়, রঙ্গ, তামাশা। তবু বলি, আজ আমার জীবনে যাহা ঘটিতে চলিয়াছে তাহা অদৃষ্টপূর্ব বা অপ্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু আমি হইলাম ভাবনকাজি। ভাবিয়া ভাবিয়া মেঘের উপর প্রাসাদ তুলিয়া ফেলি, কিন্তু বাস্তবে কুটাগাছটিও নাড়িতে উদ্যোগী হই না। ঘটনা ঘটাইতে আমার কুণ্ঠা সীমাহীন। বাতায়নে বসিয়া পৃথিবীর রঙ্গতামাশা দেখিব, নিজে তাহাতে যোগ দিব না, ইহাই আমার চিরকালের মনোভাব।
